প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা তাদের দাবি-দাওয়া নিয়ে জাতীয় বেতন কমিশনের (পে কমিশন) সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। বেতন বৃদ্ধি, টাইম স্কেল, বেতনের বেসিক নির্ধারণ, টিফিন, শিক্ষা ও চিকিৎসা ভাতাসহ অন্যান্য দাবির বিষয়ে সুপারিশ করার আশ্বাস দিয়েছে পে-কমিশন। তবে কমিশনের সরাসরি গ্রেড নির্ধারণের এখতিয়ার নেই। বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বজায় রেখে ১১তম গ্রেড নির্ধারণ সম্ভব নয়। আর সে কারণে ১১তম গ্রেড বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখছেন শিক্ষকরা।
তবে পে-কমিশন যদি ২০টি গ্রেডকে ভেঙে ১২টি করার সুপারিশ করে, তাহলে প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকরা ১১তম গ্রেড পাবেন। সেটি পে-কমিশন করবে কিনা তা এখনও ঠিক হয়নি। এসব কারণে অনিশ্চয়তা এখনও কাটেনি বলে জানিয়েছেন প্রাথমিকের শিক্ষকরা।
প্রসঙ্গত, সহকারী শিক্ষকরা দশম গ্রেড বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছিলেন। চলতি বছর প্রধান শিক্ষকদের জন্য দশম গ্রেড বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তের পর প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকরা ১১তম গ্রেড নির্ধারণের দাবি জানিয়ে আসছেন।
সোমবার (২০ অক্টোবর) সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এই সভায় পে-কমিশন প্রধান শিক্ষকদের সংগঠন এবং সহকারী শিক্ষকদের সংগঠনগুলোর সঙ্গে পৃথক আলোচনা করে।
বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ শামছুদ্দীন মাসুদ জানান, সহকারী শিক্ষকদের সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে ১১তম গ্রেডের যে প্রস্তাবনা পে-কমিশনে পাঠানো হয়েছে, বৈঠকে তা বাস্তবায়নের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। শিক্ষকরা তাদের উচ্চতর গ্রেড সমস্যার সমাধান ও আগের মতো তিনটি টাইমস্কেল চালু, বর্তমান বাজার খরচ অনুযায়ী বেতনের বেসিক নির্ধারণ, টিফিন ভাতা, শিক্ষাভাতা, চিকিৎসা ভাতা, ২০টি গ্রেড কমিয়ে ১২টি গ্রেড করা নিয়ে দাবি-দাওয়া তুলে ধরেছেন কমিশনের বৈঠকে।
বৈঠকের আলোচনা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ শামছুদ্দীন মাসুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘প্রধান শিক্ষকসহ বিভিন্ন সংগঠনের ২০ জন শিক্ষক আলাদাভাবে আলোচনা করেছি। বিদ্যমান ২০টি গ্রেডকে ১২টি গ্রেডে আনতে বলেছি। সেখানে ১৩, ১২ এবং ১১ নম্বর গ্রেড যদি একসঙ্গে করেন— তাহলে প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকরা ১১তম গ্রেড পাবেন। আর যদি বিদ্যমান ২০টি গ্রেড ঠিক রেখে পে-কশিন বেতন নির্ধারণ করে— তাহলে সহকারী শিক্ষাকরা ১১তম গ্রেড পাবেন না। গ্রেড কমিয়ে আনা ছাড়া ১১তম গ্রেড নির্ধারণের এখতিয়ার নেই পে-কশিনের। ফলে ২০টি গ্রেড ভেঙে যদি ১২টি গ্রেড না করা হয়— তাহলে আমাদের ১১তম গ্রেড নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।’’ তিনি বলেন, ‘‘অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ১১তম গ্রেডের সুাপারিশ করে পে-কমিশনে পাঠনো হয়েছে। সে বিষয়ে পে কমিশনের কাছে জানতে চেয়েছিলাম— ১১তম গ্রেড বাস্তবায়নের এখতিয়ার আছে কিনা? পে-কমিশন বেলেছে, প্রস্তাব তাদের কাছে পৌঁছেছে, তবে পে-কমিশন আর সার্ভিস কমিশন এক নয়, এটি বুঝতে হবে।’’
মোহাম্মদ শামছুদ্দীন মাসুদ বলেন, ‘১১তম গ্রেডে নির্ধারণের বিষয়টি সার্ভিস কমিশনের কাজ। ফলে ১১তম গ্রেড বাস্তবায়নের বিষয়টি নির্ভর করছে ২০টি গ্রেড ভেঙে ১২টি গ্রেড করে কিনা। আর যদি ১৩, ১২ ও ১১তম গ্রেড একসঙ্গে রাখে, তাহলে শিক্ষকরা ১১তম গ্রেড পাবেন, অন্যথায় পাবেন না।’’
এই পরিস্থিতিতে শিক্ষকদেরে অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে মোহাম্মদ শামছুদ্দীন মাসুদ বলেন, ‘‘আমরা সব শিক্ষক সংগঠন এ বিষয়ে আলোচনা করে পরবর্তী করণীয় ঠিক করবো।’’
বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির (শাহিন-লিপি) কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক খায়রুন নাহার লিপি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘পে-কমিশনের সদস্যদের সঙ্গে আমাদের আলোচনা হয়েছে। প্রধান শিক্ষকরা তাদের দাবি তুলে ধরেছেন, সহকারীরা শিক্ষকরা আলাদা করে তাদের দাবি তুলে ধরেছেন। প্রাথমিক শিক্ষকদের দশম ও ১১তম গ্রেড নির্ধারণের বিষয়টি যে পে-কমিশনের নয়, সেটি তারা স্পষ্ট করেছেন। পে-কমিশন মূলত ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর জীবনযাত্রার মানোয়ন্নন এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্য রেখে বেতন নির্ধারণ করা যায়, তা নিয়ে কাজ করছে।’’
অপর এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘আমরা ২০টি গ্রেড ভেঙে ১০ থেকে ১২টি গ্রেড করার প্রস্তাব করেছি। আমাদের প্রস্তাবে সহমত জানিয়েছেন কমিশন সদস্যরা। আমরা শতভাগ পেনশন, বাড়িভাড়া ও চিকিৎসাভাতা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছি। আমাদের টিফিন ভাতা ৬ টাকা ৬৬ পয়সা, এটি শুনে তারা লজ্জা পেয়েছেন। সেটি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছি। আগের মতো টাইম স্কেলের দাবি করেছি। তারা এসব সুপারিশ করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।’’
প্রধান শিক্ষকদের দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি মো. আবুল কাসেম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমরা ২০টা গ্রেডকে ১২টি গ্রেডে আনার প্রস্তাব করেছি। ১৩,১২ ও ১১তম গ্রেড যদি এক জায়গায় সমন্বয় করা হয়, তাহলে সহকারী প্রাথমিক শিক্ষকরা ১১তম গ্রেড পাবেন। গ্রেড ১২টি করার বিষয়ে পে-কমিশন বলেছে, এ ব্যাপারে সবার মতামত নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া টাইমস্কেল পুনর্বহালের প্রস্তাব করা হয়েছে। পেনশন শতভাগ, বর্তমানে টিফিন ভাতা আছে ৬ টাকা ৬৬ পয়সা, সেটাও বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে পেনশন ৯০ শতাংশ করা আছে। বর্তমান দ্রব্যমূলের ঊর্ধ্বগতির কারণে ৯০ শতাংশের হিসাবে ১ টাকায় ২৩০ টাকা হয়। আমরা বলেছি ১ টাকায় ৫০০ টাকা দিতে হবে।’’
সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেড নির্ধারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামানবলেন, ‘‘আমরা লিখিতভাবে পে-কমিশনকে অনুরোধ করেছি— ১১তম গ্রেডে উন্নীত করার জন্য।’’ ২০টি থেকে ১২টি গ্রেড করার কোনও সিদ্ধান্ত আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘যতটুকু শুনেছি, আমার মনে হয় গ্রেড কমাবে পে-কমিশন।’’
প্রসঙ্গত, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণ করতে গত ২৭ জুলাই ‘জাতীয় বেতন কমিশন, ২০২৫’ বা পে-কমিশন গঠন করে সরকার। পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানকে চেয়ারম্যান করে এই কমিশন গঠন করা হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সরকারের কাছে কমিশন সুপারিশ জমা দেবে। নতুন স্কেলে বেতন-ভাতা ২০২৬ সালের শুরু থেকে কার্যকর হতে পারে। সর্বশেষ ২০১৫ সালে পে-কমিশন করে নতুন বেতন স্কেল করা হয়েছিল। প্রায় ১০ বছর পর আবার এই পে-কমিশন গঠিত হয়েছে।