‘কোনো জালে একটি বা দুটি ইলিশ, আবার কোনো জাল খালি। এভাবে ১৮টি জাল মিলিয়ে ধরা পড়েছে মাত্র সাড়ে ৪ কেজি ইলিশ। অথচ ইলিশ ধরতে গিয়ে খরচ হচ্ছে দামের চেয়ে কয়েক গুণ।’ হতাশ হয়ে ঘাটে ফিরে কথাগুলো বলেন জেলে বিপ্লব জলদাস।
গতকাল শনিবার বেলা দুইটার দিকে কুমিরা ঘাটে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। তাঁর বাড়ি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের কুমিরা ইউনিয়নের উত্তর জেলেপাড়ায়। মৌসুম শুরু হওয়ায় গত জুনের মাঝামাঝি বঙ্গোপসাগরের মোহনায় জাল বসিয়েছিলেন তিনি। বিপ্লব জলদাস বলেন, ইলিশের মৌসুম শেষ পর্যায়ে। আর চার থেকে পাঁচ দিন ইলিশ পাওয়া যেতে পারে। এরপর সাগরের ইলিশ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা শুরু হবে। অন্য বছর এ সময়ে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়ত, তবে এ বছর ইলিশ নেই বললেই চলে।
নিজের হতাশার কথা উল্লেখ করে বিপ্লব জলদাস বলেন, বঙ্গোপসাগরের মোহনায় একবার যাওয়া–আসায় তাঁর জ্বালানি তেল খরচ হয় পাঁচ লিটার। দিনে চারবার জালের কাছে যেতে হয়। তাঁর সঙ্গে চারজন শ্রমিক থাকেন। প্রতি শ্রমিকের বেতন ও আনুষঙ্গিক খরচ মিলে দিতে হয় ১ হাজার ৩০০ টাকা। সব মিলিয়ে তাঁর দিনের খরচ ছয় হাজার টাকা। কিন্তু ইলিশ বিক্রি করে কখনো দুই হাজার, কখনো তিন হাজার পান। যে সাড়ে চার কেজি ইলিশ তিনি পেয়েছেন, তা আড়াই হাজার টাকা বিক্রি করেছেন।
অবশ্য শুধু বিপ্লব জলদাস নয়, সীতাকুণ্ডের সাগর উপকূলের অন্য জেলেদের অবস্থাও তাঁর মতো। গতকাল দুপুরে সরেজমিন কুমিরা ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, পাইকারেরা বড় ছাতার অস্থায়ী ছাউনি নিয়ে ঘাটে অবস্থান নিয়েছেন। জেলেরাও ছোট খাঁচায় ইলিশ নিয়ে পাইকারের কাছে ফিরছেন। তাঁদের একজন জেলে কালাবাশি জলদাস। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বঙ্গোপসাগরের মোহনায় ২১টি জাল বসাতে তিনি সাড়ে ৪ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন, তবে এক টাকাও শোধ করতে পারেননি। মাছ বিক্রির টাকা তেল আর শ্রমিকের খরচেই চলে যাচ্ছে।
পাইকারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁরা আকারভেদে ইলিশকে ছয়টি শ্রেণিতে ভাগ করেছেন। এগুলো হলো ক্যানা (প্রতিটি ইলিশের ওজন ১০০ থেকে ২০০ গ্রাম), মনা (২০০ থেকে ৩৫০ গ্রাম), চেলি (সাড়ে ৩৫০ গ্রাম থেকে ৫৫০ গ্রাম), মাঝারি (৫৫০ থেকে ৯০০ গ্রাম), বড় (৯০০ থেকে ১ হাজার ২০০ গ্রাম) ও গ্রেট (১ হাজার ২০০ গ্রামের বেশি)। এর মধ্যে মণপ্রতি ক্যানা ১৪ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর বড় ইলিশ কেজিপ্রতি ১ হাজার ২০০ থেকে দেড় হাজার ও গ্রেট ইলিশ এরও বেশি টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে ঘাটে বড় ও গ্রেট ইলিশ হাতে গোনা কয়েকটি আসছে।
জানতে চাইলে পাইকার নুরুল আমিন প্রথম আলোকে বলেন, তিনি ৩৫ বছর ধরে জেলেদের থেকে পাইকারি ইলিশ কিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করছেন। দীর্ঘ এ ব্যবসায়ী জীবনে এত কম ইলিশ দেখেননি। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।
সীতাকুণ্ড উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে সন্দ্বীপ চ্যানেলে ইলিশ ধরা পড়েছিল ২ হাজার ৫৪ মেট্রিক টন। পরের বছর তা কমে ৭৪৭ মেট্রিক টনে নেমে আসে। এরপর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আরও কমে ৪৩৮ মেট্রিক টনে নেমেছে। চলতি বছর এসে নেমেছে মাত্র ২০০ মেট্রিক টনে। অর্থাৎ ৩ বছরে জেলেদের জালে ইলিশ ধরা কমেছে ১ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন।
ইলিশ কমে যাওয়ার পেছনে ছয়টি কারণকে দায়ী করছে উপজেলা মৎস্য বিভাগ। এগুলো হলো জলবায়ু পরিবর্তন, কলকারখানার দূষণ, অতি আহরণ, নাব্যতাসংকট, জাহাজ ভাঙা কারখানার দূষিত কেমিক্যাল ও বালু উত্তোলনে ড্রেজিংয়ের শব্দ।
জানতে চাইলে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মোতাছিম বিল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, চলতি মৌসুমে জেলেরা হতাশ হয়েছেন। প্রতি মাসে যে পরিমাণ ইলিশ আহরিত হয়, তা প্রতিবেদন আকারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হচ্ছে। আগামী ৫ থেকে ১০ অক্টোবরের মধ্যে ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে।
ভাটিয়ারী ইউনিয়নের জেলে সর্দার বাদল জলদাস বলেন, সরকারি নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন কেউ এখন আর ইলিশ ধরে না। তবুও অবস্থার উন্নতি হচ্ছে না। এটা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের আরও ভাবা উচিত। না হলে সাগরে মাছ ধরার মতো জেলে আর থাকবে না।
সন্দ্বীপ চ্যানেলে ইলিশের আহরণ দ্রুত কমছে। একসময়ের ঝাঁকে ঝাঁকে ধরা পড়া ইলিশ এখন জেলেদের জালে হাতে গোনা। ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন জেলেরা। ৩ বছরে ১ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন কমেছে ইলিশ।