২৯ বছর আগে ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সকালে রাজধানীর নিউ ইস্কাটন গার্ডেনের ভাড়া বাসায় ঢাকাই সিনেমার দর্শকপ্রিয় চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার (ইমন) ওরফে সালমান শাহর মরদেহ পাওয়া যায়। এ ঘটনায় রমনা থানায় মামলা হয়। সেই মামলায় তিন ধরনের তদন্ত হয়। সব তদন্ত শেষে আত্মহত্যা হিসেবে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। সর্বশেষ ২০২১ সালের ডিসেম্বরে পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর নারাজি দিয়ে সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী মামলাটি রিভিশনের আবেদন করেন। দীর্ঘ প্রায় চার বছর পর সোমবার (২০ অক্টোবর) রিভিশন আবেদন মঞ্জুর হয়। অপমৃত্যুর মামলাটিকে হত্যা মামলা হিসেবে অভিযোগ গ্রহণের নির্দেশ দেন আদালত।
জানা গেছে, সালমান শাহর মৃত্যুতে ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর রমনা থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা করেন সালমান শাহের বাবা প্রয়াত কমর উদ্দিন আহমদ চৌধুরী। কিন্তু মৃত্যুর এক বছর না যেতেই ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে—এমন অভিযোগ এনে আদালতে মামলাটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তর করার আবেদন জানান তিনি। ফলে সালমান শাহর মৃত্যু নতুন রহস্য ধারণ করে। মামলাটি তদন্ত করে ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় সিআইডি। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করা হয়। ওই বছরের ২৫ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালতে ওই প্রতিবেদন গৃহীত হয়। কিন্তু সিআইডি’র প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে তার বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী দায়রা আদালতে রিভিশন মামলা দায়ের করেন। ২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি দ্বিতীয় দফায় বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠায় আদালত। প্রায় ১১ বছর মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে ছিল। ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট তৎকালীন ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বিকাশ কুমার সাহার কাছে বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইমদাদুল হক। এ প্রতিবেদনে সালমান শাহর মৃত্যুকে অপমৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এ রিপোর্টও প্রত্যাখ্যান করেন সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী। ওই বছরের ২১ ডিসেম্বর নীলা চৌধুরী ছেলের মৃত্যুতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেন।
২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি নীলা চৌধুরী তৎকালীন ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জাহাঙ্গীর হোসেনের আদালতে নারাজি দাখিল করেন। নীলা চৌধুরীর নারাজি আবেদনে উল্লেখ করা হয়, আজিজ মোহাম্মদ, রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদ, নজরুল শেখ, সামিরা হক, লতিফা হক লুসি, ডেভিড, আশরাফুল হক ডন, রাবেয়া সুলতানা রুবি, মোস্তাক ওয়াইদ, আবুল হোসেন খান ও মনোয়ারা বেগম—এই ১১ জন সালমান শাহর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। পরে মামলাটি র্যাবকে তদন্ত করার নির্দেশ দেন আদালত।
পরবর্তী সময়ে এতে বাধা দেন রাষ্ট্রপক্ষ। মামলাটি র্যাবকে তদন্তভার দেওয়া আদেশের বিরুদ্ধে মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন মামলা করেন মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর। ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট তৎকালীন ঢাকার বিশেষ জজ-৬-এর বিচারক ইমরুল কায়েস (বর্তমানে বিচারপতি) রাষ্ট্রপক্ষের রিভিশনটি মঞ্জুর করেন এবং র্যাব মামলাটি তদন্ত করতে পারবে না বলে আদেশ দেন। এরপর মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই)। দীর্ঘ চার বছর আলোচিত এই মামলা তদন্ত করতে গিয়ে পিবিআই ৪৪ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করেছে। ১০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিও নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট আলামতও জব্দ করা হয়। তবে এই মামলার একজন সাক্ষীকে খুঁজে পায়নি পিবিআই।
২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিবিআই'র পরিদর্শক সিরাজুল সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন মর্মে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে পিবিআই। সালমান শাহর মৃত্যুতে ৫টি কারণ খুঁজে পায় তদন্ত সংস্থাটি। কারণগুলো হলো, চিত্রনায়িকা শাবনূরের সঙ্গে সালমানের অতিরিক্ত অন্তরঙ্গতা, স্ত্রী সামিরার সঙ্গে দাম্পত্য কলহ, মাত্রাধিক আবেগপ্রবণতার কারণে একাধিকবার আত্মঘাতী হওয়ার বা আত্মহত্যার চেষ্টা, মায়ের প্রতি অসীম ভালোবাসায় জটিল সম্পর্কের বেড়াজালে পড়ে পুঞ্জীভূত অভিমানে রূপ নেওয়া এবং সন্তান না হওয়ায় দাম্পত্য জীবনে অপূর্ণতা।
পরে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মামুনুর রশীদের আদালত ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর আদালত পিবিআইর দেওয়া প্রতিবেদন আমলে নিয়ে আসামিদের অব্যাহতির আদেশ দেন। এরপর আবার সালমান শাহর পরিবারের পক্ষ থেকে রিভিশন দায়েরের আবেদন করা হয়। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের তৎকালীন বিচারক কেএম ইমরুল কায়েশ রিভিশন আবেদন গ্রহণ করেন। মামলাটি বর্তমানে রিভিশন শুনানির পর্যায়ে রয়েছে।
ছেলে আত্মহত্যা করেছিল নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছিল—তা না জেনেই ২০০২ সালে মারা যান সালমান শাহের বাবা কমর উদ্দিন আহমদ চৌধুরী। পরবর্তী সময়ে মামলার দায়িত্ব নেন সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী। বর্তমানে তিনি ইংল্যান্ডে রয়েছেন। শারীরিকভাবে অসুস্থ। পরে তার ভাই আলমগীর কুমকুমকে রিভিশনকারী হিসেবে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দেন। বোনের পক্ষে রিভিশন আবেদন করেন আলমগীর কুমকুম। পরে সোমবার (২০ অক্টোবর) ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলায় রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করেন আদালত। এ বিষয়ে সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিনের অভিযোগ এবং ঘটনায় জড়িত রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদের জবানবন্দি সংযুক্ত করে হত্যা মামলা দায়েরের নির্দেশ দিয়ে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে রমনা মডেল থানা পুলিশকে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয়। গতকাল মধ্যরাতে সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তার ভাই মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম মামলাটি দায়ের করেন। মঙ্গলবার (২১ অক্টোবর) মামলাটির এজাহার গ্রহণ করে রমনা মডেল থানার ইন্সপেক্টর আতিকুল ইসলাম খন্দকারকে ৭ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়।
মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সালমানের বাসায় ছেলের সঙ্গে দেখা করতে যান তার বাবা-মা। কিন্তু সালমানের ব্যক্তিগত সহকারী আবুল ও তার স্ত্রী সামিরা বলেন, ‘সালমান রাত জেগে কাজ করেছে। এখন তাকে ঘুম থেকে ডাকা যাবে না।’ তারা প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করে বাসায় ফিরে আসেন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সেলিম নামের একজন ফোন করে জানান, সালমানের কী যেন হয়েছে। সালমানের বাবা, মা ও ভাই তাৎক্ষণিক বাসায় ছুটে যান। সেখানে গিয়ে তারা সালমানের মরদেহ দেখতে পান।