১৯৪০-এর দশক। ভারত তখনো ব্রিটিশ শাসনের অধীনে। যুদ্ধ, দারিদ্র্য আর স্বপ্নভঙ্গের মাঝেও কিছু তরুণের চোখে ঝিলিক দিচ্ছিল নতুন আলো। তাঁরা চেয়েছিলেন খ্যাতি, গ্ল্যামার আর নতুন জীবনের হাতছানি। আর সেই স্বপ্নপথই তাঁদের নিয়ে যাচ্ছিল সিনেমার শহর বোম্বেতে (বর্তমান মুম্বাই)। তখনকার দিনে তারকা হওয়া মানে কেবল অভিনয় নয়, বরং সৌন্দর্য, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব আর কিছুটা ভাগ্য। কারণ, সিনেমা ছিল তখনো শুরুর পর্যায়ে, মানুষের বোঝাপড়া সীমিত। আর সেই সময়েই লাহোর থেকে মাত্র ৩০ রুপি হাতে নিয়ে মুম্বাই আসেন এক তরুণ। তাঁর নাম দেব আনন্দ।
চাকরি নয়, সিনেমার নেশাদেব আনন্দ চাইলে একেবারে ভিন্ন পথে হাঁটতে পারতেন। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে কর্মকর্তা হওয়ার সুযোগ ছিল তাঁর সামনে। চাইলে ব্যাংকে ভালো বেতনের চাকরিও জুটে যেত। কিন্তু তিনি সেই নিরাপদ ভবিষ্যৎকে অগ্রাহ্য করে বেছে নিলেন অজানা এক যাত্রা। সিনেমার টান তাঁকে টেনে আনল এক অচেনা শহরে, যেখানে শুরু হলো জীবনের কঠিনতম লড়াই।
মুম্বাই এসে আশ্রয় হয়েছিল এক বস্তিতে। সেখানে না খেয়ে, কষ্টে দিন কেটেছে অনেকটা সময়। কিন্তু সেই কষ্টকেই তিনি বানিয়েছিলেন শক্তি। মনে রেখেছিলেন, একদিন রুপালি পর্দায় জায়গা হবেই।
আট ভাইবোনের সংসার, স্বপ্নভঙ্গের গল্পআত্মজীবনী ‘রোম্যান্সিং উইথ লাইফ’-এ দেব আনন্দ লিখেছেন তাঁর শৈশব-কৈশোরের দিনগুলোর কথা। আট ভাইবোনের সংসার, বাবা চেয়েছিলেন সবারই ভালো শিক্ষা হোক। কিন্তু জীবনের টানাপোড়েনে তা আর পূর্ণতা পায়নি। ইংল্যান্ডে গিয়ে বিদ্বান হওয়ার ইচ্ছা ছিল তাঁর, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্ন পথ হারায়। কিন্তু সিনেমা তাঁকে ডেকে নেয় অন্য স্বপ্নে। সেই ডাক উপেক্ষা করতে পারেননি দেব আনন্দ। নিজের স্মৃতিকথায় দেব আনন্দ লিখেছেন, তাঁর আট ভাইবোন ছিল এবং তাঁর বাবা সবাইকে ভালো শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দেব বড় হওয়ার আগেই তাঁদের পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে।
দেব আনন্দ লিখলেন, ‘তাঁর (বাবার) পক্ষে আর্থিক দিক দিয়ে আমার মতো তৃতীয় ছেলের উচ্চশিক্ষার খরচ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। আর তাই তিনি আমাকে একটি ব্যাংকে কেরানির চাকরি করতে বলেন। এর আগে আমি ব্রিটিশ বাহিনীর রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভিতে কমিশনের জন্য আবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হই।’
দেব লাহোরের গভর্নমেন্ট কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করেছিলেন এবং নিজেকে এত নিচু পদের উপযুক্ত মনে করেননি। তাই তিনি বোম্বে চলে আসেন সিনেমায় নিজের ভাগ্য পরীক্ষা করতে। তিনি লিখেছেন, ‘সে সময় আমার সঙ্গে ছিল ৩০ টাকা আর এক ছোট ব্যাগভর্তি আমার প্রিয় কিছু জিনিসপত্র।’
বোম্বের দিনগুলোবোম্বে এসে দেব ছিলেন বেকার এবং অনেক সময় অনাহারেও দিন কাটাতে হয়েছে। তিনি এক স্টুডিও থেকে অন্য স্টুডিও ঘুরে বেড়াতেন যেন কারও নজরে পড়তে পারেন। সেখানে কাজ করা মানুষের মনোরঞ্জনের জন্য জনপ্রিয় গান গাইতেন। কিছু সময় তিনি খাজা আহমদ আব্বাসের সঙ্গে ছিলেন। কিন্তু চিত্রনাট্যকার, সাংবাদিক আব্বাসের দয়ায় বেশি দিন কাটাতে চাননি দেব। তাই তিনি একটি চওলে (খুপরি ঘরওয়ালা বস্তিমতো জায়গা) উঠে যান।
আর্থিক অবস্থা এতটা খারাপ হয়ে পড়ে যে নিজের ডাকটিকিটের সংগ্রহ বিক্রি করে দেন দেব আনন্দ। সে সময় তিনি ঘর নেন পারেলের কৃষ্ণ নিবাস নামের আরেকটি বস্তিতে। কিছুদিন পর বান্দ্রায় ঘর নেন। তার ভাই চেতন আনন্দ এমন সময় মুম্বাই এলে তিনিও দেবের ঘরে ওঠেন। পরবর্তী সময়ে বাধ্য হয়ে দেব ৮৫ রুপিতে একটি হিসাবরক্ষণ সংস্থায় কেরানির কাজ নেন। বিষয়টিকে তিনি ‘অপমানজনক’ মনে করলেও জীবনযাপনের জন্য চাকরিটি করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
পরবর্তী চাকরি ছিল ব্রিটিশ সরকারের সেন্সরশিপ বিভাগে। এতে সেনাবাহিনীর চিঠিপত্র স্ক্যান করার জন্য শিক্ষিত তরুণদের নিযুক্ত করা হতো। এ চাকরিতে তিনি কিছুদিন ছিলেন এবং পরে তাঁর মাসিক বেতন বেড়ে ১৬৫ টাকা হয়। কিন্তু এ চাকরিটাও বেশিদিন স্থায়ী হয়নি; কারণ, এটা তাঁর সিনেমার স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। নিজের স্মৃতিকথায় দেব লিখেছেন, একদিন একটি চিঠি পড়তে পড়তে তিনি দেখেন এক ভারতীয় সেনা তাঁর স্ত্রীকে লিখেছেন, ‘ইচ্ছা করে এই চাকরি ছেড়ে এখনই তোমার কোলে গিয়ে পড়ি।’ সেই মুহূর্তেই দেব চাকরি ছেড়ে দেন এবং অফিস থেকে বেরিয়ে যান।এ ঘটনার এক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি সিনেমায় প্রথম সুযোগ পান। তারপর আর কখনো ফিরে তাকাতে হয়নি। একে একে উপহার দিয়েছেন কালজয়ী অনেক সিনেমা। নায়ক থেকে হয়েছেন প্রযোজক, পরিচালক আর ভারতের সিনেমার অন্যতম কিংবদন্তি।
আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বই মূল সম্পদসেই সময়ে কেউ তারকা হওয়ার কথা বললেই ধরে নেওয়া হতো—অভিনয় জানার চেয়ে বেশি দরকার আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব আর সুদর্শন চেহারা। দেব আনন্দের ক্ষেত্রে সেটিই ছিল তাঁর মূল পুঁজি। মুগ্ধকর হাসি, ছিপছিপে গড়ন আর স্বতঃস্ফূর্ততার কারণে তিনি দ্রুত নজর কাড়েন। পরে অবশ্য প্রতিভার জোরেই নিজেকে প্রমাণ করেছিলেন শিল্পী হিসেবে।
তথ্যসূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস