২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর ঢাকার অদূরে আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে অবস্থিত তাজরীন ফ্যাশনস অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অন্তত ১১৯ জন শ্রমিক পুড়ে মারা যান। আহত হন আরও অর্ধশতাধিক শ্রমিক। এ ঘটনায় মালিকসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দুটি মামলা করা হয়। মামলা দায়েরের এক বছর পরে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল হয়। তারও দুই বছর পর ২০১৫ সালে শুরু হয় সাক্ষ্য। তাও ১০ বছর আগের কথা। সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর এত বছর পর এসেও মামলা নিষ্পত্তি হয়নি। আর এখন দায়িত্বপ্রাপ্ত নতুন আইনজীবীরা বলছেন, মাত্র এক বছর আগে দায়িত্ব পেয়েছেন। এখনও মামলার সব নথি বুঝে পাননি। আগামীতে খেয়াল করবেন।
এদিকে, হাজারো মানুষের সামনে ঘটে যাওয়া মর্মন্তুদ এই ঘটনার আসামি উপস্থিত থাকলেও—সব মিলিয়ে ১৩ বছর কেটে যাওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শ্রমিক অধিকারকর্মী, মামলার পর্যবেক্ষক অ্যাক্টিভিস্টরা। তারা বলছেন, এত বড় পটপরিবর্তনের পরে এই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও যদি এই মামলার সুরাহা না হয়, তাহলে আর কার কাছে বিচার চাইবো। দিনের পর দিন আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলে আসছেন সাক্ষী না পাওয়ার কথা। অধিকারকর্মীরা বিস্ময় প্রকাশ করে বলছেন, এ কেমন ব্যবস্থা? সবার সামনে আগুনে পুড়ে শতাধিক মানুষ কয়লা হয়ে গেলো। অথচ দিনের পর দিন সাক্ষী পাওয়া যায় না। আর ঠিক মামলার শুনানির দিনে জামিনের আসামি তাজরীনের মালিক দেলোয়ার অসুস্থ হয়ে যান।
jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw6923bd14d3c7b" ) );
১০ বছর ধরে চলছে সাক্ষ্যগ্রহণ
চারদিন আগের ঘটনা। ১৯ নভেম্বর তাজরীন অগ্নিকাণ্ড মামলার সাক্ষ্য শুনানির দিন ধার্য ছিল। সেদিন রাষ্ট্রপক্ষ কোনও সাক্ষী হাজির করতে পারেনি। এবং গত সেপ্টেম্বরের পরে দ্বিতীয় দিনের মতো এই মামলার মূল আসামি কারখানার মালিক দেলোয়ার হোসেন ‘গুরুতর অসুস্থতা’র অজুহাতে হাজিরা দেননি। আগামী সাক্ষ্য শুনানির জন্য ২০২৬ সালের ৯ মার্চ দিন ধার্য করা হয়। গত ১০ বছরে সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য ৬৮টি তারিখ ধার্য ছিল। এই ৬৮ দিনের মধ্যে মাত্র ১০ দিন রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করেছে এবং অভিযোগপত্রে উল্লিখিত ১০৪ জনের মধ্যে এ পর্যন্ত মাত্র ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে।
এখন পর্যন্ত ১০৪ জন সাক্ষীর মধ্যে এত কম সাক্ষী হাজির করতে পারার কারণ জানতে চাইলে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরে দায়িত্ব পাওয়া ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত জেলা জজ আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আবু সেলিম চৌধুরী বলেন, ‘‘নতুন করে সবকিছু শুরু করতে গিয়ে ঠিকমতো কোর্ট ডকুমেন্ট পাইনি। আমাদের এগুলো যেখানে থাকে, সেই রেবতি ম্যানসনে সংস্কার কাজ চলছে। ফলে সংশ্লিষ্টরা সঠিকভাবে তথ্য দিতে পারছেন না। আবার মামলার তারিখ পড়ে তিন-চার মাস পর পর। আমরা দায়িত্ব পেয়েছি মাত্র এক বছর আগে। ফলে মামলার তথ্য পেতে আমাকে সময় দিতে হবে।’’
সেপ্টেম্বর ও নভেম্বরে দুই ধার্য দিবসে আসামি দেলোয়ার হোসেন হাজির না হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আপনাদের পদক্ষেপ কী এবং তিনি দেশে আছেন কিনা জানতে চাইলে এই আইনজীবী বলেন, ‘‘জামিনে থাকা আসামি পরপর দুইবার হাজির না হলে তো অটোমেটিক ওয়ারেন্ট ইস্যু হওয়ার কথা।’’ ওয়ারেন্ট ইস্যু হলে তার জানার কথা কিনা, প্রশ্নে তিনি সোমবার (২৪ নভেম্বর) খোঁজ নেবেন বলে জানান।
jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw6923bd14d3cac" ) );
মালিকের ‘অবহেলা’ মালিকের ‘ক্ষমতা’
তাজরীনের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পরপরই ঘটনাকে মালিকের অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ড বলে চিহ্নিত করা হয়। গার্মেন্টস মালিককে বিচারের মুখোমুখি করা নিয়ে শ্রমিক স্বজনদের পোহাতে হয় নানা হয়রানি, তবে শেষমেশ সেটি সম্ভব হয়েছিল। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেলোয়ার হোসেনকে সস্ত্রীক কারাগারে পাঠান আদালত। এই ঘটনায় সরকারি বিভিন্ন সংস্থা থেকে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। প্রতিটি অনুসন্ধানেই মালিক-কর্তৃপক্ষের শ্রমিক নিরাপত্তা বিষয়ে সার্বিক ‘অবহেলার’ চিত্র তুলে ধরা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশমালায় বলা হয়—‘‘তাজরীন ফ্যাশন লিমিটেডে সংঘটিত এই মর্মান্তিক মৃত্যুর বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর। যা দেশে এবং বিদেশে ব্যাপকভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। আগুন লাগার বিষয়টি নাশকতা হতে পারে, তবে এত বিপুল মর্মান্তিক মৃত্যুর জন্য মালিকের অমার্জনীয় অবহেলাই দায়ী। এটি সুস্পষ্টভাবে অবহেলাজনিত মৃত্যু ঘটানোর অপরাধ। তাই তাজরীন ফ্যাশন লিমিটেডের মালিককে দণ্ডবিধির ৩০৪(ক) ধারায় আইনের আওতায় এনে বিচারে সোপর্দ করার সুপারিশ করা হলো।’’
jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw6923bd14d3cd3" ) );
২০১৫ সালে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন গবেষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, সংস্কৃতিকর্মী এবং গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরাম তাজরীন মামলাটির কার্যক্রমকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে আসছে। তারা সব সাক্ষ্য শুনানিতে উপস্থিত থাকেন। তাদের দাবি, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার পেছনে মামলাটি পরিচালনার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপক্ষের দায়সারাপনা দায়ী।
মানবাধিকারকর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমাদের বিচার বিভাগের এমন অনেক দুর্বলতা আছে—যা কোনও সরকারের আমলেই কেউ সুরাহা করেনি। বিচার বিভাগ একা এটা (দুর্বলতা) করতে পারবে না। সরকারের সহযোগিতা লাগবে। আমরা দেখি, কিছু রাজনৈতিক ইস্যুর মামলা খুব দ্রুত শুনানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়। কিন্তু এসব মামলার আর শুনানি হয় না।’’ এসব মামলা দীর্ঘদিন শুনানি না হওয়ার পেছনে দুটি কারণ থাকতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, হয় মামলা এগিয়ে নিতে বাদীপক্ষের দুর্বলতা কাজ করছে। নয়তো সরকার কর্তৃক বিচার বিভাগে মহাপরিকল্পনা দরকার। এসব ছাড়া এর সুরাহা হবে না বলেও মনে করেন তিনি।
jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw6923bd14d3cf5" ) ); ২০২৪ সালের আগস্টের পর এখন যদি এসব মামলার বিচার নিশ্চিত না করা যায়, তবে আর কবে করা যাবে উল্লেখ করে বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভা-প্রধান তাসলিমা আখতার বলেন, ‘‘গত ১৩ বছর ধরে এই মামলার কার্যক্রম চলছে। এই ঘটনা ঘটায় মালিককে আটক করার পরে তার জামিন হলো। জামিন অবস্থায় তিনি মৎসজীবী লীগের নেতা হলেন। আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদে চূড়ান্ত না হওয়া মামলাগুলোর সুরাহা চাই। তারা দৃষ্টান্ত তৈরি করুক। আমরা তাজরীনের মামলার মধ্য দিয়েই এই দৃষ্টান্ত শুরু হোক, সেটা চাই।’’
ঘটনাটিকে মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড উল্লেখ করে রাষ্ট্রপক্ষের আরেক আইনজীবী ফরিদুর রহমান বলেন, ‘‘কেন ১৩ বছর ধরে এত কম অগ্রগতি হয়েছে, প্রশ্ন তোলাই যায়। এখন পর্যন্ত মাত্র ১৬ জনের সাক্ষ্য হয়েছে। সেটা আশানুরূপ নয়। আমরা অতি সম্প্রতি দায়িত্ব পেয়েছি। আগামীতে আমরা চেষ্টা করবো—যেন এগিয়ে নেওয়া যায়।’’ একইসঙ্গে সুশীল সমাজসহ গণমাধ্যম যেন আরও সচেতনতার সঙ্গে বিষয়টি সামনে তুলে ধরে, সেটাও উল্লেখ করেন তিনি।