‘আমার রাইফেলের একটি গুলিতে একটি জীবন যায়, এ জন্য নির্দেশ মানিনি’

‘আমার রাইফেলের একটি গুলিতে একটি জীবন যায়, এ জন্য নির্দেশ মানিনি’

বৈষম‍্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘিরে রাজধানীর চাঁনখারপুলে ছয় জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষী হিসেবে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) সদস্য অজয় ঘোষের জবানবন্দি ও জেরা সম্পন্ন করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। স্টেট ডিফেন্সের জেরার সময় অজয় ঘোষ বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশ মানা কর্তব্য, তবে সবক্ষেত্রে নয়। ছাত্ররা নিরস্ত্র ছিলেন। আমি জানতাম– আমার রাইফেলের একটি গুলিতে একটি জীবন যায়। এ জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশ সত্ত্বেও গুলি করিনি।

রবিবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ জেরাকালে তিনি এ মন্তব্য করেন।

ট্রাইব্যুনালে এ মামলায় পলাতক চার আসামির পক্ষে সাক্ষী অজয় কুমারকে জেরা করেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী কুতুবউদ্দিন আহমেদ। প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। তার সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, প্রসিকিউটর আবদুস সাত্তার পালোয়ান, তারেক আবদুল্লাহ প্রমুখ।

সাক্ষী তার জবানবন্দিতে বলেন, আমি অজয় ঘোষ। ২০২৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর কনস্টেবল পদে পুলিশে যোগদান করি। ১৩ এপিবিএন উত্তরা ঢাকায় কর্মরত আছি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ভোর আনুমানিক ৪টায় পিওএম মিরপুর পুলিশ লাইন থেকে আমিসহ ২০ জন নায়েক আব্দুর রহমানের নেতৃত্বে যার যার নামে ইস্যু করা অস্ত্র, গুলি, হেলমেট ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি নিয়ে রওনা হয়ে ভোর আনুমানিক ৫টায় শাহবাগ থানায় এসে রিপোর্ট করি। সকাল আনুমানিক ৯টায় অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) শাহ আলম মো. আক্তারুল ইসলাম আমাদের ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে জানান, ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান এবং যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী থানায় এসে আন্দোলনকারীদের সরাসরি গুলি করার নির্দেশনা দিয়েছেন। তখন সেখানে এসি ইমরুল, ইন্সপেক্টর আরশাদও উপস্থিত ছিলেন।

আনুমানিক ৯টা ৩০ মিনিটের দিকে আমরা এডিসি আক্তারের নেতৃত্বে শহীদ মিনার এলাকায় যাই। সেখানে তার নির্দেশে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও ফাঁকা ফায়ার করে ছত্রভঙ্গ করা হয়। আনুমানিক ১০টা ৩০ মিনিটে শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটের পাশে চাঁনখারপুল চৌরাস্তার মোড়ে আমরা অবস্থান নেই। অলি-গলিতে হাজার হাজার ছাত্র-জনতার ভিড় ছিল। তারা শহীদ মিনারের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। ওই দিন ছাত্র-জনতার ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি এবং সরকার ঘোষিত কারফিউ ছিল। আমার নামে একটি চাইনিজ রাইফেল ও ৪০ রাউন্ড গুলি ইস্যু করা ছিল; যা আমার সঙ্গে ছিল।

তিনি আরও বলেন, এডিসি আক্তার আমাদের সবাইকে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি বর্ষণের নির্দেশ দেন। আমি গুলি করতে চাইনি। তিনি আমাকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করেন। বলেন, সরকারি বেতন-রেশন খাস না, গুলি করবি না কেন? তিনি আমার হাতে থাকা চাইনিজ রাইফেল ও ৪০ রাউন্ড গুলি কেড়ে নিয়ে কনস্টেবল সুজনের হাতে দেন। সুজনের হাতে থাকা ঢাল-লাঠি দেন আমার হাতে। কনস্টেবল সুজন, ইমাজ, নাসিরুল মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার, নাজিমউদ্দিন রোড, নবাবকাটারা, বকশি বাজার মোড়ে অবস্থানরত ছাত্র-জনতাকে লক্ষ্য করে গুলি বর্ষণ করতে থাকেন। আমি পাশে দাঁড়িয়ে তাদের গুলি করতে দেখি। পরে জানতে পারি সেখানে ছয়-সাত জন আন্দোলনকারী গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। আনুমানিক ২টা ৩০ মিনিটে জানতে পারি, শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছেন। তখন আমরা চাঁনখারপুল থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতর দিয়ে শাহবাগ থানার পেছন দিয়ে থানায় প্রবেশ করি। কনস্টেবল সুজনকে খুঁজে বের করে তার কাছে থাকা আমার নামে ইস্যু করা অস্ত্র ও গুলি নিয়ে শাহবাগ থানায় জমা দেই। ১৮ রাউন্ড গুলি জমা দেই। কনস্টেবল সুজন জানায়, বাকি ২২ রাউন্ড গুলি সে এডিসি আক্তারের নির্দেশে ফায়ার করেছে। সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার দিকে সিভিল পোশাক পরে থানার পেছন দিয়ে বের হয়ে ছাত্র-জনতার সঙ্গে মিশে আমার গ্রামের বাড়ি ধামরাই চলে যাই। আসামি সুজন, ইমাজ ও নাসিরুল ডকে উপস্থিত আছেন। এছাড়াও ইন্সপেক্টর আরশাদও ডকে উপস্থিত আছেন।

সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ ও জেরা শেষে এ বিষয়ে প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম সাংবাদিকদের বলেন, ট্রাইব্যুনালে চাঁনখারপুল এলাকায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন একজন পুলিশ সদস্য। তিনি গত বছরের ৫ আগস্ট ওই এলাকায় উপস্থিত ছিলেন। তার সামনেই ছাত্র-জনতার ওপর নির্মম হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে পুলিশ। আজ সাক্ষ্য দেওয়া পুলিশ সদস্যের নামেও একটি চাইনিজ রাইফেল ও ৪০ রাউন্ড গুলি ইস্যু করা হয়। কিন্তু তিনি ছাত্র-জনতার ওপর গুলি করতে চাননি। এ কারণে তাকে গালাগালিসহ চাকরির ভয় দেখান ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এরপরও তিনি গুলি করেননি।

তিনি আরও বলেন, এই সাক্ষীর কাছ থেকে চাইনিজ রাইফেল কেড়ে নিয়ে সুজন নামে একজন কনস্টেবলের হাতে দেন ওই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। আর সুজনের হাতে থাকা লাঠি ও ঢাল এনে এই সাক্ষীর হাতে দেওয়া হয়। পরে সুজন-নাসিরুলরা ছাত্র-জনতার ওপর চায়নিজ রাইফেলে নির্বিচারে গুলি করেন। সেখানে ছয় ছাত্র নিহত হন। ওই ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন এই সাক্ষী। এছাড়া গুলি করার আদেশ দেওয়ার পরও গুলি করেননি বলে জানিয়েছেন তিনি।

এদিন সকালে কারাগার থেকে এ মামলার চার আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করে পুলিশ। তারা হলেন– শাহবাগ থানার সাবেক ওসি (অপারেশন) মো. আরশেদ হোসেন, কনস্টেবল মো. সুজন মিয়া, মো. ইমাজ হোসেন ইমন ও মো. নাসিরুল ইসলাম।

পলাতক আসামিরা হলেন– সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলাম ও রমনা অঞ্চলের সাবেক সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইমরুল।

এর আগে গত ২০ এপ্রিল এ মামলায় আট জনকে অভিযুক্ত করে একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। সেই প্রতিবেদন ২৫ মে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিকভাবে দাখিল করা হয়। এরপর আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ আমলে নিয়ে ও প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে দিয়েই এ মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়।

মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন– ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শাহ আলম ও মো. আখতারুল ইসলাম, রমনা অঞ্চলের সাবেক সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইমরুল, শাহবাগ থানার সাবেক পরিদর্শক মো. আরশাদ হোসেন, কনস্টেবল মো. সুজন হোসেন, ইমাজ হোসেন ও মো. নাসিরুল ইসলাম। তাদের মধ্যে কয়েকজন পলাতক রয়েছেন।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চাঁনখারপুল এলাকায় শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে পুলিশ প্রাণঘাতী আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে গুলি চালায়। এতে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সদস্যরা এই অভিযানে সরাসরি অংশ নেন।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, হাবিবুর রহমানসহ অন্য অভিযুক্তরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং অধীনস্তদের গুলি চালানোর নির্দেশ দেন। তাদের সহযোগিতা ও নির্দেশেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আন্দোলন দমন করতে ব্যবহার করা হয় আগ্নেয়াস্ত্র, এপিসি কার, হেলিকপ্টার, ড্রোন ও বিপুল পরিমাণ বুলেট। পুলিশের এই অভিযানে নিহত হন শাহরিয়ার খান আনাস, শেখ মাহদী হাসান জুনায়েদ, মো. ইয়াকুব, মো. রাকিব হাওলাদার, মো. ইসমামুল হক ও মানিক মিয়া শাহরিক।

Comments

0 total

Be the first to comment.

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে BanglaTribune | অন্যান্য

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে

জুলাই আন্দোলনের মামলা থেকে অব্যাহতির ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং সাড়ে পাঁ...

Sep 12, 2025

More from this User

View all posts by admin