আরব সম্মেলন বাতিলে বিব্রত পুতিন, মধ্যপ্রাচ্যে কমছে রুশ প্রভাব

আরব সম্মেলন বাতিলে বিব্রত পুতিন, মধ্যপ্রাচ্যে কমছে রুশ প্রভাব

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘোষিত ‘রাশিয়া-আরব বিশ্ব সম্মেলন’ শেষ মুহূর্তে বাতিল হয়ে গেছে। মাসের পর মাস প্রস্তুতির পর এই সম্মেলন ছিল মধ্যপ্রাচ্যে মস্কোর প্রভাব প্রদর্শনের সুযোগ। কিন্তু অধিকাংশ আরব নেতা অংশ নিতে রাজি না হওয়ায় পুতিন বাধ্য হন আয়োজনটি স্থগিত করতে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এ খবর জানিয়েছে।

এপ্রিল মাসে ঘোষিত এই সম্মেলন বুধবার মস্কোতে হওয়ার কথা ছিল। লক্ষ্য ছিল রাশিয়ার সঙ্গে আরব দেশগুলোর জ্বালানি, নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমদ আল-শারা এবং আরব লিগের মহাসচিব আহমেদ আবুল গেইত ছাড়া কেউ নিশ্চিত করেননি। ফলে সম্মেলনটি বাতিল করা হয়।

এর বিপরীতে সোমবার বিশ্বের দৃষ্টি পড়ে মিসরের শারম আল শেখে অনুষ্ঠিত গাজা শান্তি সম্মেলনের দিকে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, মিসরের আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনেতারা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে রাশিয়ার কোনও প্রতিনিধি ছিল না।

বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার কূটনৈতিক ভূমিকা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। জার্মানির রুশ পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক হান্না নটে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোতে এখন কেউ মস্কোর দিকে তাকায় না।

রাশিয়া ২০১৫ সালে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে বাশার আল-আসাদের সরকারকে পতনের হাত থেকে বাঁচায়। তখন থেকেই পুতিন মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পান। কিন্তু ইউক্রেনে সর্বাত্মক আগ্রাসনের পর সেই সামরিক ও কূটনৈতিক শক্তি ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়েছে। সিরিয়ার প্রভাব কমেছে, ইরানও বারবার ইসরায়েলের হামলার মুখে দুর্বল হয়ে পড়েছে।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ও হামাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখলেও গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে কোনও ভূমিকাই রাখতে পারেনি রাশিয়া। বরং ফিলিস্তিনের পক্ষ নেওয়া ও ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর কারণে পুতিনের সঙ্গে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সম্পর্ক শীতল হয়ে গেছে। গত মাসে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, ইসরায়েল কিয়েভকে একটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহ করেছে।

পুতিন দাবি করেছেন, তিনি নিজেই সম্মেলন স্থগিত করেছেন যাতে গাজা শান্তি প্রক্রিয়ায় ‘বাধা না পড়ে’। শুক্রবার তাজিকিস্তান সফরে তিনি বলেন, ‘যদি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেন, তবে এটি একটি ঐতিহাসিক সাফল্য হবে।’

তবে রুশ কূটনীতিকদের মধ্যে হতাশা স্পষ্ট। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ বলেন, আমাদের আমন্ত্রণ জানালে রাশিয়া অবশ্যই অংশ নেবে, তবে চাপিয়ে দেবে না।

অন্যদিকে রুশ নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান দিমিত্রি মেদভেদেভ ট্রাম্পের শান্তিচুক্তিকে ‘অর্থহীন’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, ইসরায়েলি জিম্মি ও ফিলিস্তিনি বন্দি মুক্তি ভালো পদক্ষেপ, কিন্তু ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না হলে যুদ্ধ শেষ হবে না। সবাই তা জানে।

রাশিয়ার প্রভাব হ্রাস শুধু মধ্যপ্রাচ্যে নয়, মধ্য এশিয়া ও ককেশাস অঞ্চলেও কমছে। একসময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র কাজাখস্তান, আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান এখন ধীরে ধীরে মস্কোর কক্ষপথ থেকে সরে যাচ্ছে।

আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের নেতাদের হোয়াইট হাউজে আমন্ত্রণ জানান এবং তাদের মধ্যে শান্তিচুক্তির মধ্যস্থতা করেন। সেই চুক্তির অংশ হিসেবে ‘ট্রাম্প রুট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস অ্যান্ড প্রসপারিটি’ নামে নতুন করিডর প্রকল্প চালু হয়, যা আর্মেনিয়া হয়ে আজারবাইজানকে তুর্কি সীমান্তের নাখিচেভান অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করবে।

উল্লেখ্য, এই দুই দেশের নেতাই সোমবার গাজা শান্তি সম্মেলনে অংশ নিতে মিসরে যান। যেখানে পুতিন ছিলেন অনুপস্থিত।

ক্রেমলিন জানিয়েছে, রাশিয়া-আরব সম্মেলন নভেম্বরে পুনরায় আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সম্মেলন কেবল প্রতীকীভাবে রাশিয়ার বিচ্ছিন্ন না হওয়ার বার্তা দিতে পারে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার বাস্তব প্রভাব আর আগের মতো ফেরানো সম্ভব নয়।

হান্না নটে বলেন, এই সম্মেলন রাশিয়ার কূটনৈতিক মর্যাদা রক্ষার একটি প্রচেষ্টা মাত্র। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মধ্যপ্রাচ্যে এখন মস্কো নয়, ওয়াশিংটনকেই কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

 

Comments

0 total

Be the first to comment.

যেভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দাফন করছে ইসরায়েল? BanglaTribune | মধ্যপ্রাচ্য

যেভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দাফন করছে ইসরায়েল?

ইসরায়েলি দখলকৃত পশ্চিম তীরে এখন বসবাস করছেন প্রায় ২৭ লাখ ফিলিস্তিনি। দীর্ঘদিন ধরে এ ভূখণ্ডকে ভবিষ্...

Sep 22, 2025

More from this User

View all posts by admin