আওয়ামী লীগের শাসনামলে গুমের দুই মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৩০ জনের গ্রেফতারি পরোয়ানা আইজিপির কাছে পাঠিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একইসঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত বাহিনীর ১২ দফতরে পাঠানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৯ অক্টোবর) সকালে এ তথ্য জানিয়েছে ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার কার্যালয়।
এ প্রসঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, গতকাল বিকালেই দুই মামলায় ৩০ আসামির বিরুদ্ধে জারি হওয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা আইজিপি ও ১২টি দফতরে পাঠিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
১২ দফতর হলো– চিফ অব আর্মি স্টাফ, চিফ অব জেনারেল স্টাফ, অ্যাডজুটেন্ট জেনারেল (আর্মি হেডকোয়ার্টার), ডিজি ডিজিএফআই, ডিজি এনএসআই, প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (আর্মড ফোর্সেস ডিভিশন) সচিব প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়, ডিরেক্টর মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স, ডিরেক্টর পার্সোনেল সার্ভিস ডিরেক্টরেট (বাংলাদেশ সেনাবাহিনী), কমান্ডেন্ট আর্মি সিকিউরিটি ইউনিট, প্রভোস্ট মার্শাল, সিইও (আর্মি এমপি ইউনিট ফর ইনফরমেশন)।
গত ৮ অক্টোবর আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে বিরোধী লোকদের গুম করে র্যাবের টাস্কফোর্স ইন্টারোগেশন (টিএফআই) ও জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টারে (জেআইসি) সেলে বন্দি রেখে নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের দুই মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এ দুই মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রধান করে ৩০ জনকে আসামি করা হয়।
চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এসব অভিযোগ আমলে নেন। একইসঙ্গে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। তিনি ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভিন্ন মতাদর্শের লোক কিংবা রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক, লেখক-সাংবাদিকদের তুলে নিয়ে গোপন বন্দিশালায় রেখে নির্যাতনের বীভৎস বর্ণনা তুলে ধরেন। শুনানি শেষে গুম সংক্রান্ত দুটি অভিযোগ আমলে নেওয়ার আবেদন জানানো হয়। পরে অভিযোগ আমলে নিয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল।
গুম সংক্রান্ত মানবতাবিরোধী অপরাধের দুই অভিযোগের একটিতে শেখ হাসিনা ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন– শেখ হাসিনার সাবেক প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইজিপি বেনজির আহমেদ, র্যাবের সাবেক ডিজি এম খুরশিদ হোসেন, র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক ব্যারিস্টার হারুন অর রশিদ, কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম, তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, র্যাব কর্মকর্তা কেএম আজাদ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কামরুল হাসান, মাহবুব আলম, আবদুল্লাহ আল মোমেন, সারোয়ার বিন কাশেম, খায়রুল ইসলাম, মশিউর রহমান জুয়েল ও সাইফুল ইসলাম সুমন।
র্যাবের টাস্কফোর্স ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে অপহরণ-গুম, নির্যাতনসহ বিভিন্ন অপরাধে এ ১৭ জনের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছে।
এছাড়া জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টারে (জেআইসি) গুমের অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের আরেক মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৩ জনকে আসামি করা হয়।
তারা হলেন– শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষা বিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) লে. জেনারেল (অব) মোহাম্মদ আকবর হোসেন, সাবেক ডিজি মেজর জেনারেল (অব) সাইফুল আবেদিন, লে. জেনারেল (অব) মো. সাইফুল আলম, সাবেক ডিজি লে. জেনারেল তাবরেজ শামস চৌধুরী, সাবেক ডিজি মেজর জেনারেল (অব.) হামিদুল হক, মেজর জেনারেল তৌহিদুল ইসলাম, মেজর জেনারেল সরওয়ার হোসেন, মেজর জেনারেল কবির আহাম্মদ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভীর মাজহার সিদ্দিকী ও লে. কর্নেল (অব.) মখসুরুল হক।
এর মধ্যে চার জন সেনা কর্মকর্তা এখনও কর্মরত রয়েছেন। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সংশোধিত আইন অনুযায়ী তারা কোনও পদে থাকতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।
প্রসঙ্গত, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শাসনামলে বহু মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে শতাধিক মানুষের এখনও খোঁজ মেলেনি। কাউকে হত্যার পর মরদেহও গুম করে ফেলা হয়েছে। গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর বন্দিশালা থেকে মুক্তি পেয়েছেন গুমের শিকার ব্যক্তিরা। তাদের মধ্যে অন্যতম ব্যারিস্টার মীর আহমদ বীন কাশেম, আবদুল্লাহিল আমান আযমীসহ আরও অনেকে। এসব ভুক্তভোগীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গুমের এ দুই মামলা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। এরই ধারাবাহিকতায় আজ সকালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন।