প্রশ্ন
আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করি। ভালো ছাত্রী। বাবা মায়ের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো। আমাকে কখনোই কিছুর জন্য আবদার করতে হয়নি। চাওয়ার আগেই সব প্রয়োজনীয় জিনিস আমি পেয়েছি। আমার সহপাঠীরা আমাকে সবসময় সমালোচনা করে। কেন ক্যাম্পাসে পৌঁছে মাকে জানাই, ক্লাস শেষে বন্ধুরা ঘুরতে গেলে কেন ড্রাইভার ছেড়ে দেই না, এসব নিয়ে খোঁচা দেয়। একসময় আমার ওদের সাথে সময় কাটানো কমিয়ে দিতে বাধ্য হই আমি। এখন খুবই একাকীত্বে ভুগি, আমার কী করা উচিত?
উত্তর
প্রথমে ভাবুন কেন এমনটা হচ্ছে? আপনার সহপাঠীদের সমালোচনার কারণ সম্ভবত আপনার প্রতি তাদের ব্যক্তিগত আক্রোশ নয়, বরং তাদের নিজেদের বেড়ে ওঠা এবং জীবনযাত্রা আপনার থেকে ভিন্ন (কগনিটিভ ডিসোনেন্স)। ভিন্ন প্রেক্ষাপট ভাবতে চেষ্টা করুন। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে শিক্ষার্থীরা আসে। আপনার জন্য যা স্বাভাবিক (যেমন ড্রাইভার থাকা বা বাবা-মায়ের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ), তা হয়তো অনেকের কাছেই বিলাসিতা বা অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। তারা হয়তো নিজেরা অনেক সংগ্রাম করে বা স্বাধীনভাবে চলে অভ্যস্ত, তাই আপনার জীবনযাত্রাকে তারা সহজে মেলাতে পারে না।
তারা হয়তো ভাবছে আপনি ‘অতি-আদুরে’ বা বাস্তবতার সাথে সংযোগহীন। ক্যাম্পাসে পৌঁছে মাকে ফোন দেওয়াকে তারা অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা হিসেবে দেখছে, যদিও আপনার কাছে এটা ভালোবাসা ও সুরক্ষার প্রকাশ।
ফলে আপনি কী করবেন? নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া বা একা করে ফেলা কোনও সমাধান নয়। এতে আপনার আত্মবিশ্বাস কমে যাবে এবং পড়াশোনায় প্রভাব পড়তে পারে। এর পরিবর্তে আপনি অন্তত ৬টি পদক্ষেপ নিতে পারেন।
আত্মবিশ্বাস ধরে রাখুন
সবার আগে মনে রাখুন, আপনি যা করছেন তাতে কোনও ভুল নেই। বাবা-মায়ের যত্ন পাওয়াটা সৌভাগ্যের ব্যাপার, লজ্জার নয়। আপনার পারিবারিক মূল্যবোধ এবং জীবনযাত্রার জন্য লজ্জিত বা সংকুচিত হওয়ার কারণ নেই। আত্মবিশ্বাসের সাথে নিজের স্বাভাবিক জীবনযাপন চালিয়ে যান। মনে রাখবেন, যারা আপনাকে আপনার পারিবারিক অবস্থার জন্য বিচার করে, তারা হয়তো আপনার বন্ধু হওয়ার যোগ্যই নয়। নিজের ওপর বিশ্বাস রাখুন।
সরাসরি কিন্তু নম্রভাবে উত্তর দিন
যদি কেউ আপনাকে সরাসরি খোঁচা দিয়ে কথা বলে, তাহলে এড়িয়ে না গিয়ে শান্তভাবে কিন্তু দৃঢ়তার সাথে উত্তর দিতে পারেন।
নতুন বন্ধু খুঁজুন
আপনার বর্তমান সহপাঠীদের বৃত্তের বাইরেও বিশাল জগত রয়েছে। সত্যিকারের বন্ধু খুঁজে পেতে চেষ্টা করুন। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ক্লাব থাকে (যেমন: ডিবেটিং ক্লাব, কালচারাল ক্লাব, সায়েন্স ক্লাব, ফটোগ্রাফি ক্লাব)। আপনার পছন্দের কোনও ক্লাবে যোগ দিন। পড়াশোনায় ভালো এমন শিক্ষার্থীদের সাথে লাইব্রেরিতে বা গ্রুপ স্টাডিতে যোগ দিতে পারেন। সেখানে আলোচনার মূল বিষয়ই থাকবে পড়াশোনা, ব্যক্তিগত জীবন নয়।
নিজের জগত তৈরি করুন
একাকীত্ব দূর করার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো নিজেকে ব্যস্ত রাখা এবং নিজের একটি জগত তৈরি করা। আপনার যা করতে ভালো লাগে (যেমন: বই পড়া, সিনেমা দেখা, ছবি আঁকা, লেখালেখি করা), সেগুলোর জন্য সময় দিন।
পরিবারের সাথে কথা বলুন
আপনার বাবা-মায়ের সাথে এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলুন। তারা আপনার সবচেয়ে বড় সাপোর্টার। তাদের সাথে আপনার অনুভূতিগুলো শেয়ার করলে মন হালকা হবে এবং তারা হয়তো আপনাকে ভালো কোনও পরামর্শও দিতে পারবেন।
পেশাদার সাহায্য নিতে দ্বিধা করবেন না
যদি আপনার একাকীত্ব এবং মানসিক চাপ খুব বেশি বেড়ে যায় এবং আপনি কোনোভাবেই এর থেকে বের হতে না পারেন, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাউন্সিলর বা কোনও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিতে পারেন। এটি খুবই স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া এবং এতে আপনার উপকারই হবে।
প্রশ্ন
আমার মেয়ের বয়স ১০। সে যখন ২ বছরের তখন আমরা বুঝতে পারি, আমাদের সব নির্দেশনা সে ফলো করতে পারছে না। সে দিন দিন বড় হয়, নরমাল স্কুলে ভর্তি করি। কিন্তু সে সিলেবাস পুরোটা আয়ত্ত করতে পারছে না। আমার মেয়ে অটিস্টিক এটা আমাকে এক দুজন বুঝানোর চেষ্টা করেছে কিন্তু আমার স্বামী কোনোভাবেই এটা মানতে চাননা বলে মেয়েটার চিকিৎসা সম্ভব হচ্ছে না। আর মেয়ের এই অবস্থা লুকাতে আমি কাছের আত্মীয়দের সঙ্গে মেলামেশা বন্ধ করে দিয়েছি। আমি মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন।
উত্তর
সন্তানের বিষয়ে আপনার স্বামীর এমনটা মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। অনেক অভিভাবকই প্রথমে এই বিষয়টা মেনে নিতে পারেন না। আপনার উচিত হবে তাকে ধীরে ধীরে বোঝানো, তবে জোর করে নয়।
আপনার স্বামীর কাছে অটিজম সম্পর্কে সঠিক তথ্য তুলে ধরুন। তাকে বোঝান যে এটি কোনও রোগ নয়, বরং মস্তিষ্কের বিকাশের একটি ভিন্ন রূপ। আপনার মেয়ের যে লক্ষণগুলো দেখা যাচ্ছে, সেগুলো অটিজমের সাধারণ বৈশিষ্ট্য—এই বিষয়টি তাকে উদাহরণ দিয়ে বোঝাতে পারেন। একজন বিশেষজ্ঞ, যেমন একজন ডেভেলপমেন্টাল পেডিয়াট্রিশিয়ান বা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট-এর কাছে যান। তাদের পরামর্শ সরাসরি আপনার স্বামীকে শোনানোর ব্যবস্থা করুন। পেশাদারদের কথা তিনি হয়তো বেশি গুরুত্ব দেবেন। যদি এমন কোনও পরিবারের সঙ্গে আপনার যোগাযোগ থাকে, যাদের সন্তান অটিস্টিক এবং তারা সফলভাবে সন্তানের যত্ন নিচ্ছেন, তাহলে তাদের সঙ্গে আপনার স্বামীকে কথা বলতে উৎসাহিত করুন। এটি তাকে মানসিকভাবে সাহায্য করতে পারে।
কেন দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা জরুরি?
মনে রাখবেন, অটিজম কোনও রোগ না হলেও, এর সঙ্গে কিছু আচরণগত ও শিক্ষাগত চ্যালেঞ্জ থাকে। সঠিক চিকিৎসা বা থেরাপি এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় সাহায্য করে। আপনার মেয়ের বয়স ১০ বছর, এবং এই সময়ে তার জন্য সঠিক সাপোর্ট দরকার। থেরাপি তাকে অন্য সবার সঙ্গে মিশতে এবং স্বাভাবিক সামাজিক আচরণ শিখতে সাহায্য করবে। অনেক সময় অটিস্টিক শিশুরা কিছু বিশেষ আচরণ করে, যা থেরাপির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
সামাজিক মেলামেশা বন্ধ করা কি সমাধান?
আপনি আত্মীয়-স্বজনদের থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন, কারণ আপনি আপনার মেয়ের অবস্থা লুকাতে চেয়েছেন। কিন্তু এটি আপনার এবং আপনার মেয়ের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে। বরং, এই সময়ে আপনাদের সকলেরই সামাজিক সমর্থন খুব প্রয়োজন। আপনি চাইলে আপনার বিশ্বস্ত এবং ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের এই বিষয়টি খুলে বলতে পারেন। যদি তারা সচেতন হন, তাহলে তারা আপনার মেয়েকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করবে এবং তার প্রতি সংবেদনশীল হবে। আপনার মেয়েকে লুকিয়ে রাখার বদলে অন্যদের সচেতন করতে পারেন। এতে করে আপনার মেয়ের জন্য একটি সুন্দর সামাজিক পরিবেশ তৈরি হবে যেখানে সে সবার মাঝে স্বাভাবিকভাবে থাকতে পারবে।