দেশে ক্রমান্বয়ে বাড়ছে নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতন। বাসা থেকে শুরু করে কর্মস্থল- সবখানেই নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন নারীরা। এর মধ্যে পারিবারিক নির্যাতনের শিকার বেশি হচ্ছেন নারীরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে পারিবারিক সহিংসতা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি প্রকট সামাজিক বাস্তবতা। স্ত্রীকে শাসন করার মাধ্যম হিসেবে এই সহিংসতার এক ধরনের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাও রয়েছে। যা সমাজে বিদ্যমান পুরুষতান্ত্রিকতারই বহিঃপ্রকাশ।
এদিকে, এসব সহিংসতা থেকে নারীদের নিরাপত্তা দেওয়া ও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিষয়ে তথ্য পেতে এবং যথাযথ ব্যবস্থা নিতে কুইক রেসপন্স স্ট্র্যাটেজি (কিউআরএস) নামে ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়।
এমন প্রেক্ষাপটে আজ ২৫ নভেম্বর “ইন্টারন্যাশনাল ডে ফর দ্য এলিমিনেশন অব ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন’ বা আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস পালিত হচ্ছে। এদিন থেকেই শুরু হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ। ১০ ডিসেম্বর বিশ্ব মানবাধিকার দিবস পর্যন্ত পৃথিবীর দেশে দেশে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে এ পক্ষ পালিত হবে। বাংলাদেশের নারী এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোও এ উপলক্ষে বিস্তারিত কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
নারীর ওপর সহিংসতার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী প্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষ্যেই এ দিবসের সূচনা। তবে এমন এক সময়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে যখন বাংলাদেশে পরিবারের মাঝেও নারী নিরাপদ নয়।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্যে জানা গেছে, যৌন নিপীড়ন, ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণসহ নানাভাবে গত অক্টোবর মাসে ১০১জন কন্যা এবং ১৩০জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর আগের মাস সেপ্টেম্বরে ৯২জন কন্যা এবং ১৩২জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তার আগের মাস আগস্টে ৭৯জন কন্যা এবং ১৪৪জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই তিন মাসে মোট নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৬৭৮ জন নারী ও শিশু। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে নারী নির্যাতন।
জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯ চলতি বছরের শুরু থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা ও ইভটিজিংসহ নানা কারণে নারীরা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, এমন ফোন পেয়েছে ২৬ হাজার ৩১৭টি। এর মধ্যে স্বামীর মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার হওয়ার বিষয়ে ৯৯৯ এ ফোন এসেছে ১৪ হাজার ৯২৮টি। যেখানে গতবছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে ৯৯৯ মোট ফোন কল পেয়েছিল ২৩ হাজার ৩৩টি। এর মধ্যে স্বামীর দ্বারা নির্যাতনের বিষয়ে ফোন ছিল ১১ হাজার ৪১৮টি। এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নারীরা প্রিয় মানুষের কাছেও যে অনিরাপদ, সেই তথ্যই উঠে এসেছে!
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, গতবছরের প্রথম ১০ মাসে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৪২৭টি, চলতি বছরের একই সময়ে তা বেড়ে হয়েছে ৫০৩টি। বেড়েছে ৭৬টিঁ। স্বামীর হাতে হত্যার সংখ্যা ২০২৪ সালে ছিল ১৫৫টি। তা বেড়ে ২০২৫ সালে ১৯৮ জনে দাঁড়িয়েছে।
তবে শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বজুড়ে নারীর প্রতি সহিংসতা এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে, যাকে এখন আর কেবল ‘সামাজিক সমস্যা’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি মানবাধিকারের এক গুরুতর লঙ্ঘন ও বৈশ্বিক জরুরি অবস্থা দেখা দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং জাতিসংঘের সহযোগী সংস্থাগুলোর সদ্য প্রকাশিত একটি যুগান্তকারী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভয়াবহ চিত্র। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রতি তিনজন নারীর একজন তার জীবদ্দশায় সঙ্গী বা স্বামীর দ্বারা শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সংখ্যার হিসাবে এই ভুক্তভোগী নারী প্রায় ৮৪ কোটি। পরিসংখ্যানের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ১২ মাসে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩১ কোটি ৬০ লাখ নারী সঙ্গী বা স্বামীর মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
নারীর প্রতি সহিংসতা কমেনি, বরং বেড়েই চলেছে
মহিলা ও শিশুবিষয়ক উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ বলেছেন, দেশে নারীর প্রতি সহিংসতা কমেনি, বরং বেড়েই চলেছে। সোমবার (২৪ নভেম্বর) আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে সচিবালয়ে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে তিনি এই মন্তব্য করেন।
নারী নির্যাতনের তথ্য পেতে আসছে কিউআরএস ব্যবস্থা
নারী ও শিশু নির্যাতনের বিষয়ে তথ্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পেয়ে এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে কুইক রেসপন্স স্ট্র্যাটেজি (কিউআরএস) নামে ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়। সোমবার সচিবালয়ে তথ্য অধিদফতরে সম্মেলন কক্ষে ১৬ দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনে মহিলা ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজ কল্যাণ উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, “মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একটিমাত্র গুরুত্বপূর্ণ কাজ- সেটি হচ্ছে সব শ্রেণি ও ধর্মের নারী ও শিশুকে সুরক্ষিত রাখা। আমি মনে করি না এর বাইরে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আর কোনও কাজ আছে। অভিভাবক হিসেবেই এই মন্ত্রণালয়কে দাঁড়ানো উচিত। এই উপলব্ধিটাও এ মন্ত্রণালয়ের জন্য একেবারে নতুন।”
তিনি আরও বলেন, “আমি যা ভেবেছি আমাদের করা উচিত, সেভাবে আমি গত এক বছর ধরে আমাদের মহিলা শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে সাজাবার চেষ্টা করছি। বাংলাদেশে কোনও নারীর ওপর সহিংসতা, কোনও শিশুর ওপর নির্যাতনের খবর পাওয়া গেলে সেই তথ্য মন্ত্রণালয় পৌঁছাতে হবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মন্ত্রণালয়কে সক্রিয় হতে হবে, এটাই হবে এই মন্ত্রণালয়ের ভিশন ও লক্ষ্য।”
২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভুক্তভোগীর কাছে পৌঁছাতে হবে উল্লেখ করে শারমীন এস মুরশিদ বলেন, “এজন্য আমরা কুইক রেসপন্স স্ট্র্যাটেজির (কিউআরএস) বিষয়টি উত্থাপন করেছি। কৌশলটা হবে কুইক রেসপন্স (দ্রুত সাড়া দেওয়া)। এটা আমাদের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা গত ৮-৯ মাস ধরে এই কনসেপ্টটা ডেভেলপ করেছি। কিউআরটি মাত্র প্রাথমিক প্রয়োগের জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে।”
নারীর প্রতি নির্যাতন বেড়েছে বলে মনে করছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগও। সেখানকার একজন কর্মকর্তা বলেন, “প্রতিদিনই ভুক্তভোগী আসছেন, আমরা তাদের প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দিচ্ছি।”
বেসরকারি সংস্থা নিজেরা করি’র সমন্বয়ক খুশী কবির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমাদের দেশে পরিবারসহ স্কুল-কলেজ ও কর্মস্থলেও নারীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। দেখা যাচ্ছে যে, ঘরের ভেতরেই নারীরা বেশি নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। অনেক মানুষ ও সমাজ এটাকে কোনও অন্যায় মনে করে না। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে সচেতনতা বাড়াতে হবে। এই প্রতিরোধ দিবসে ১৬ দিনব্যাপী এই বিষয়ে জানাতে প্রচারণা চালানো হবে।”
তিনি বলেন, “সমাজ ও মানুষকে নারীকে দুর্বল না ভেবে মনে করতে হবে, নারী সমাজের বাইরের কেউ নয়। নারী-পুরুষ উভয়ই সমান। তাহলে নারীর প্রতি সহিংসতা কমতে পারে। পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে সামাজিক স্তরে পিতৃতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণার বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।”