পাসপোর্ট ও ভিসা ছাড়া বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের অভিযোগে রাজধানী ঢাকায় গ্রেফতার হন ভারতীয় নাগরিক সখিনা বেগম। ৬৮ বছর বয়সি সখিনা বেগম দুই মাস পর গত রবিবার জামিন পেয়েছেন। সখিনাকে বাংলাদেশি আশ্রয়দাতাদের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৫ নভেম্বর) দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, রাজধানীর ভাষানটেকের টেকপাড়ার টিনশেড একটি ঝুপড়ি ঘরে আশ্রয়দাতাদের সঙ্গে থাকছেন তিনি। শরীর প্রচণ্ড খারাপ, শোয়া থেকে উঠে বসতে পারছেন না। অনবরত দু’চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছে। বার্ধক্যের ব্যথায় কাতর সখিনা নিজে চলাফেরা করতে পারেন না।
সরেজমিনে দেখা যায়, সখিনা শুয়ে আছেন, পাশে বসে আছেন তাকে আশ্রয় দেওয়া জাকিয়া আক্তার ও তার মেয়ে ক্লান্তি আক্তার। সখিনা এই প্রতিবেদককে জানান, তিনি এখন ভারতের আসামে নিজ বাড়িতে ফিরতে চান। ছেলে-মেয়েদের মুখটা সবসময় চোখে ভাসে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “তাদের না দেখে খুব কষ্টে দিন কাটছে।” মৃত্যুর আগে তিনি নিজ ভিটেবাড়িতে ফিরতে চান, দেখতে চান সন্তানদের।
তিনি জানান, বাংলাদেশে প্রবেশের পর ৮ দিনের মতো তিনি পথে পথে ঘুরেছেন। খেয়ে না খেয়ে দিন-রাত কেটেছে তার। বলতে বলতে আঁচল দিয়ে চোখ মোছেন সখিনা।
আসাম থেকে ঢাকায় কীভাবে এলেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, নিজ বাড়ি থেকে বিএসএফের ক্যাম্পে নিয়ে তাকে একদিন রাখা হয়। পরে গাড়িতে করে বাংলাদেশের কোনও একটি জায়গায় রাখা হয়। সেখান থেকে তিনি ৮ দিনের মতো বিভিন্ন জায়গা ঘুরে ঢাকার ভাষানটেকে আসেন। টেকপাড়ায় রাস্তায় বসে কান্না করতে দেখে ক্লান্তি তাকে আশ্রয় দেন।
সখিনার খোঁজ পাওয়ার বিষয়ে ক্লান্তি আক্তার বলেন, সখিনার কাছ থেকেই জানতে পেরেছেন ভারতের আসামের বাসিন্দা তিনি। আসামের বাসা থেকে সেখানকার পুলিশ সই করার কথা বলে তাকে থানায় নেয়। সখিনার পরিবারের সদস্যরা তাকে আনতে গেলেও তাদের জিম্মায় দেওয়া হয়নি। ওই দিন রাতেই ২৫ থেকে ৩০ জনের সঙ্গে ওনাকে বাংলাদেশে পুশইন করা হয়। সেখান থেকে কয়েক সপ্তাহ এদিক–সেদিক ঘুরতে ঘুরতে ঢাকার ভাষানটেকে আসেন।
ক্লান্তি বলেন, “মে মাসের ৪ তারিখে একটা দোকানের সামনে বসে কান্না করছিলেন। তখন ওনার শরীর খুব খারাপ ছিল। পরে বাসায় নিয়ে আসি ও বিবিসির সাংবাদিককে জানাই। রিপোর্ট করার পর পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।”
তিনি বলেন, “কয়েকমাস আমাদের পরিবারের সঙ্গে থাকায় অনেক মায়া জম্মেছে। তিনি নিজ বাড়িতে ফিরতে চান। সব সময় ছেলে মেয়েদের কথা বলে কান্নাকাটি করেন।”
ক্লান্তির মা জাকিয়া বলেন, “মানবতার চেয়ে বড় ধর্ম কিছু নেই। ওনাকে আশ্রয় দেওয়ার কারণে অনেকে আমাদের ভয়ভীতি দেখিয়েছেন। ওনাকে দেখভাল করা ঠিক নয়, আমরা বিপদে পড়বো। তবে আমরা দমে যায়নি, আল্লাহ ওপর বিশ্বাস রেখেছি।”
গত ২৫ সেপ্টেম্বর ক্লান্তিদের বাসা থেকে সখিনা বেগমকে আটক করে পুলিশ। পরে তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। দুই মাস পর গত ২৩ নভেম্বর আদালত জামিন মঞ্জুর করে সখিনাকে মা–মেয়ে জাকিয়া ও ক্লান্তি আক্তারের জিম্মায় দেন। আদালত বলেছেন, যদি কখনও সখিনাকে রাখতে তাদের সমস্যা হয়, তাহলে আদালতকে জানাতে। আদালত অন্য কোথাও রাখার ব্যবস্থা করবেন। এ ছাড়া এক সপ্তাহ পরপর ভাষানটেক থানার পরিদর্শককে সখিনার বিষয়ে আদালতকে জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আসামিপক্ষের আইনজীবীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জাকির হোসাইন জামিন মঞ্জুর করে এ আদেশ দেন।
জামিনের বিষয়ে সখিনার আইনজীবী রহমাতুল্যাহ সিদ্দিক বলেন, “শুনানিতে আমরা বলেছি, এটা একটা জামিনযোগ্য ধারা। জামিন পেলে আসামি পালাবেন না। বিচারক জানতে চেয়েছেন, কার জিম্মায় জামিন দেবেন। আমরা বলেছি, ওনাকে গত চার–পাঁচ মাস যারা রেখেছেন, ওনাদের অধীনে দেন।”
সখিনা বেগমকে আটকের পর ‘দ্য কন্ট্রোল অব এন্ট্রি অ্যাক্ট, ১৯৫২’ আইনে মামলা করে তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। পরেরদিন তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত।
উল্লেখ্য, এই আইন অনুযায়ী কোনও ভারতীয় নাগরিক পাসপোর্ট ও ভিসা ছাড়া বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারবে না। এর ব্যত্যয় হলে ১ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অথবা ১ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।
মামলার অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ২৫ সেপ্টেম্বর বিকালে ভাষানটেক থানার টিনশেড টেকপাড়া গলির মাথায় সখিনা বেগমকে পাওয়া যায়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত লোকজনের জিজ্ঞাসাবাদে ওই নারী তার বাড়ি আসামে বলে জানান। তিনি কিছুটা বাংলায় আর কিছুটা অসমিয়া ভাষায় কথা বলতে পারেন। তার কাছে পাসপোর্ট ও ভিসা চাইলে দেখাতে পারেননি। কীভাবে ভাষানটেক এসেছেন, সে–সংক্রান্ত কোনও তথ্য দিতে পারেননি। আসামের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও পাসপোর্ট ও ভিসা ছাড়া বাংলাদেশে প্রবেশের অপরাধে তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
সখিনার গ্রামের বাড়ি আসামের বরপুড়ার গ্রামের নলবাড়ি থানায়। তিনি ৫ সন্তানের জননী। সখিনার মেয়ে রাশিয়া মাকে ফেরাতে ভারতের ভারতের আদালতে সম্প্রতি একটি আবেদন করেছেন। তিনি মোবাইল ফোনে এই প্রতিবেদককে বলেন, “১০ বছর আগে আমার মাকে আসামের নলবাড়ি থানার পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। অভিযোগ ছিল, তিনি বাংলাদেশি নাগরিক। মায়ের ভোটার আইডি হারিয়ে যাওয়ায় আমার তাকে এখানকার নাগরিক হিসেবে প্রমাণ করতে পারিনি। তবে পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে ৫ বছর তাদের হেফাজতে রেখে দেয়। পরে করোনা মহামারির সময় মাকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। এরপর থেকে প্রতি বৃহস্পতিবার তার মাকে থানায় হাজিরা দিতে হয়।”