বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কারিগরি সীমাবদ্ধতা, জনবল সংকট এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী তাসলিমা ইসলাম।
মঙ্গলবার (৩০ সেপ্টেম্বর) পর্যটন ভবনের শৈলপ্রপাত মিলনায়তনে বায়ুদূষণের ফলে সৃষ্ট জনদুর্ভোগের চিত্র এবং সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নির্ধারণে ‘বায়ু দূষণ প্রতিরোধে করণীয়’ বিষয়ে গণশুনানি আয়োজন করে বেলা। শুনানিতে এসব এসব কথা বলেন তিনি।
বেলার প্রধান নির্বাহী বলেন, ওভারল্যাপিং জুরিসডিকশনও বায়ুদূষণ রোধের পথে অন্তরায়। আমাদের প্রয়োজন সমন্বিত ও সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি (হলিস্টিক অ্যাপ্রোচ) থেকে কাজ করা। বায়ুদূষণের ফলে স্বাস্থ্য খাতে মানুষের ব্যয় ক্রমশ বাড়ছে।
গণশুনানিতে ভুক্তভোগী নাগরিক, চিকিৎসক, শিক্ষাবিদ, পরিবেশবিদ, নগর পরিকল্পনাবিদ, পুলিশ, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেয়।
প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক (ঢাকা অঞ্চল) মো. জিয়াউর রাহমান।
শুনানিতে জানানো হয়, বায়ুদূষণের শীর্ষে থাকা দেশগুলোর মধ্যে ২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম। বায়ুদূষণের প্রধান উৎসগুলো হলো—যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়া ২৮ ভাগ, কারখানা ১৩ ভাগ, ইটভাটা ১১ ভাগ, নির্মাণ প্রকল্পের ধুলাবালি ৮ ভাগ, আবর্জনা পোড়ানো, গৃহস্থালির ধোঁয়া ও অনিয়ন্ত্রিত জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ইত্যাদি।
তাসলিমা ইসলাম আরও জানান, পরিবেশের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আমাদের ২০০টির বেশি আইন আছে। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ অনুযায়ী দূষণ নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ২০২৩ অনুযায়ী আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলার নির্দেশনা রয়েছে, রয়েছে বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণের আধুনিক বিধান। রয়েছে বায়ু দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০২২। তাহলে প্রশ্ন আসে বায়ুদূষণে আমাদের এই করুণ অবস্থা কেন?
শুনানিতে বলা হয়, বায়ুদূষণের স্বল্পমেয়াদি প্রভাবের মধ্যে রয়েছে—কাশি, শ্বাসকষ্ট, শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহ, কনজাংটিভাইটিস, অ্যালার্জি, হাঁপানি, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ, ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজ, হার্ট ফেইলর, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দনের তারতম্য। দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের মধ্যে রয়েছে শ্বাসতন্ত্রের রোগ, ফুসফুসের ক্যানসার, আলঝেইমার, পারকিনসন্স, স্ট্রোক, মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস (এমএস), বিষণ্নতা, ক্রনিক কিডনি রোগ, গ্লোমেরুলোনেফ্রাইটিস, বন্ধ্যাত্ব, ত্বকের ক্যানসার, ডায়াবেটিস, ইনফ্লেমেটরি ও ইরিটেবল বাওয়েল ডিজিজ।
এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্সের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তীব্র বায়ুদূষণের কারণে ঢাকায় বসবাসকারী নাগরিকদের গড় আয়ু কমেছে ৬ দশমিক ৯ বছর অর্থাৎ প্রায় ৭ বছর। ঢাকার আশেপাশের মানুষের গড় আয়ু কমেছে ৬ দশমিক ২ বছর এবং সারা দেশে গড় আয়ু কমেছে ২ দশমিক ৪ বছর।
গ্রীন ভয়েসের ফাহমিদা নাজনিন বলেন, রাস্তা থেকে ফিটনেসবিহীন যানবাহন সরানো, নির্ধারিত এলাকায় শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, অবৈধ ইটভাটা ভেঙে ফেলা এবং পরিবেশবান্ধব বিকল্প ব্যবহারে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পারভিন ইসলাম বলেন, নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বিশেষভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মাহবুবুর আলম তালুকদার বলেন, আমাদের জনবল সীমিত। প্রতি কিলোমিটারে যদি একজন প্রয়োজন হয়, তবে আমার ৮ হাজার কর্মীর প্রয়োজন, কিন্তু আছে মাত্র ৪ হাজার। নতুন ১৮টি ওয়ার্ড যুক্ত হলেও সেখানে নতুন কর্মী নিয়োগ হয়নি। আমরা বিদ্যমান জনবল দিয়েই কাজ করছি। বর্জ্য এনার্জিতে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক জিয়াউল হক বলেন, সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হচ্ছে সমন্বয়ের অভাব। অন্তত ১৫টি মন্ত্রণালয় সরাসরি বায়ুদূষণ সৃষ্টি ও নিয়ন্ত্রণে জড়িত। এজন্য উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন কমিটি গঠন করা হলেও কার্যকর সমন্বয় সম্ভব হচ্ছে না। বিষয়টি সহজ নয়। বায়ুদূষণ নিয়ে জনসচেতনতার অভাব বড় চ্যালেঞ্জ। তাই জনগণকেও সতর্ক ও সচেতন হতে হবে।