হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আমদানি কার্গো ভিলেজে লাগা আগুনে বিদেশ থেকে আমদানি করা সব ধরনের মালামালই পুড়ে ছাই হয়েছে। কার্গোর আগুন শুরুতে নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও কেমিক্যাল আতঙ্কে তা সম্ভব হয়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সূত্র বলছে, আমদানি কার্গো ভিলেজে অগ্নিকাণ্ডের প্রথম দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত আগুন একাংশে ছিল। তথ্য স্বল্পতা ও কেমিক্যাল থাকার আতঙ্কেই শুরুতে আগুন নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস। ফলে ধীরে ধীরে আগুন পুরো কার্গো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের ভয়াল থাবায় সেখানকার কোনও কিছুই অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
শনিবার (১৮ অক্টোবর) দুপুর আড়াইটার দিকে ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত। ফায়ার সার্ভিসের ৩৭টি ইউনিট প্রায় সাত ঘণ্টার চেষ্টায় রাত ৯টা ১৮ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। ততক্ষণে কার্গোতে বিদেশ থেকে আমদানি করা নানা পণ্য ও এক যুগের আমদানির কাগজপত্র পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ক্ষতির পরিমাণ এখনও নির্ধারণ করা না গেলেও কর্মরতদের ধারণা কয়েক হাজার কোটি টাকার বেশি সম্পত্তি পুড়েছে। ঘটনার একদিন পর রবিবার বিকালে (১৯ অক্টোবর) আগুন সম্পূর্ণ নির্বাপণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
আগুন নিয়ন্ত্রণে এত সময় লাগলো কেন?
আমদানি কার্গো ভিলেজে লাগা আগুন প্রায় ৭ ঘণ্টা ধরে জ্বলে। এত বেশি সময় ধরে থাকা আগুনের ভয়াল থাবায় কার্গোর ডিপোর সব কিছুই পুড়ে ছাই হয়ে যায়। আগুন নিয়ন্ত্রণে এত সময় লাগলো কেন? শুরুতেই কেন নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি? এমন প্রশ্নে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল বলেছেন, ‘আমরা যখন আসছি, তখন আগুন ডেভেলপমেন্ট পর্যায় ছিল। কিন্তু এই জায়গাটা পুরোটা খোলা, ভেতরে কার্গো ছিল। কার্গোর ভেতরে খোপ খোপ কম্পার্টমেন্ট করা এবং কংক্রিটের দেয়াল। ফলে এগুলো প্রত্যেকটাকে ফাইট করে আমাদের এগোতে হয়েছে। এটার সামনের অংশটা যেহেতু খোলা জায়গা, বাতাস ছিল বেশি। ফলে অক্সিজেনের প্রবাহে শুকনো মালামালে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এই দাহ্য পদার্থের মধ্য দিয়ে আমাদের ফায়ার ফাইটিং করতে হয়েছে।‘
শনিবার রাত ১০টার দিকে ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ফায়ার সার্ভিসের ডিজি বলেন, ‘আমাদের কাছে কিছু তথ্য ছিল, কোথাও কোথাও কেমিক্যাল জাতীয় পণ্য আমদানি করা থাকতে পারে। ফলে আমাদের সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হয়েছে। কারণ কেমিক্যাল থাকলে মানুষের জীবনহানির বিষয় থাকতে পারে।’
কেমিক্যাল ছিল কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কেমিক্যাল ছিল কিনা তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে আমরা কিছু নীল ফ্রেম দেখতে পেরেছি। সেটা কেমিক্যাল কিনা, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।’
কার্গো ভিলেজে আগুন নেভাতে অংশ নেওয়া ফায়ার সার্ভিসের একাধিক কর্মকর্তা ও ফায়ার ফাইটারের সঙ্গে একই প্রশ্নে কথা হয় বাংলা ট্রিবিউনের।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে তারা যেসব অগ্নিকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন, তার মধ্যে কয়েকটি ঘটনায় কেমিক্যাল থাকা জায়গায় আগুন নেভাতে গিয়ে প্রাণঘাতী ঝুঁকির সম্মুখীন হয়েছেন। বিশেষ করে গাজীপুর ও চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভয়াবহ আগুনের ঘটনাগুলোর মতোই এবারও তারা আগুনের উৎস ও সংরক্ষিত দ্রব্য সম্পর্কে আগাম কোনও তথ্য পাননি। তাদের ভাষায়—‘অনেক সময় অগ্নিকাণ্ডস্থলগুলোতে কেমিক্যাল থাকে, কিন্তু তা আমাদের জানানো হয় না। আমরা পানি ব্যবহার শুরু করার পর বিস্ফোরণ ঘটে।’
jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68f50c0e49b6e" ) );
গাজীপুরে কেমিক্যাল বিস্ফোরণে তিন জন এবং সীতাকুণ্ডে ১৩ জন ফায়ার ফাইটার মারা গেছেন, যাদের তিন জনের মরদেহও খুঁজে পাওয়া যায়নি। এসব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবারও ফায়ার ফাইটাররা সতর্কভাবে কাজ শুরু করেন, যাতে অনাকাঙ্ক্ষিত বিস্ফোরণ এড়ানো যায়।
তবে বিমানবন্দরের কার্গোতে আগুন লাগার সময়ও কেমিক্যাল থাকার আশঙ্কা ছিল বলে জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। আগুনের সময় কয়েক দফা ছোট ছোট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়, যা তাদের আরও সতর্ক করে তোলে। কার্গো কর্তৃপক্ষও প্রথমদিকে আগুনের উৎস বা ভেতরে থাকা দাহ্য পদার্থ সম্পর্কে স্পষ্ট কোনও তথ্য দিতে পারেনি। ফলে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের নিরাপত্তা বিবেচনা করে পরিস্থিতি মূল্যায়নে সময় নিতে হয়েছে।
কর্মকর্তারা বলেন, ‘যদি আগে থেকে জানা যেত ভেতরে কী ধরনের দ্রব্য রয়েছে, আমরা কৌশল বদলে আগুন নেভাতে পারতাম।’ অন্যদিকে কার্গোর সামনের অংশ পুরোটাই ছিল ফাঁকা। আর ভেতরে খোপ খোপ করে মালামাল ছিল। এই বিলম্বের মধ্যেই বাতাসে অক্সিজেনের প্রবাহে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পুরো কার্গো এলাকায়, পুড়িয়ে দেয় কোটি কোটি টাকার পণ্য—যার অধিকাংশই ছিল ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের আমদানি করা মালামাল।
বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে কর্মরত এক প্রত্যক্ষদর্শী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, শনিবার দুপুর আড়াইটার দিকে কুরিয়ার সার্ভিসের পাশে ‘স্কাই ভিউ’ নামে একটি এয়ারলাইন্স অফিস থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। প্রথম এক ঘণ্টা আগুনটি ওই জায়গাতেই সীমিত ছিল এবং নিয়ন্ত্রণের সুযোগও ছিল। তিনি বলেন, “ফায়ার সার্ভিস আসার পর আমরা কুরিয়ার সার্ভিসে ঢুকে আগুন নেভানোর চেষ্টা করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ফায়ার সদস্যরা বললেন এখানে প্রবেশ করা যাবে না, তারা ‘সিভিল এভিয়েশন’ থেকে অনুমতি পাচ্ছেন না।”
সেই সময় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়ায় আগুন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে পাশের স্কাই ভিউ, ডিএইচএল টার্মিনাল, ফ্যাব্রিক ওয়্যারহাউজসহ আশপাশের বিভিন্ন ইউনিটে। পরবর্তীতে আগুন ডেঞ্জারাস গুডস (ডিজি) ওয়্যারহাউজেও পৌঁছে যায়, যেখানে দাহ্য ও রাসায়নিক পণ্য মজুত ছিল। তিনি দাবি করেন, ‘যদি শুরুতেই ভেতরে ঢুকে পানি মারা যেত, আগুন তখনই নিয়ন্ত্রণে আসতো। কিন্তু দেরি করায় হাজার কোটি টাকার মালামাল ধ্বংস হয়ে গেছে।’
প্রত্যক্ষদর্শীর এই বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকেই ভিডিওটি শেয়ার করে দাবি করেছেন—ঘটনাটি পরিকল্পিত হতে পারে। কেউ কেউ বলছেন, কার্গোর গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র বা মালামাল ধ্বংস করতেই এই আগুন লাগানো হয়ে থাকতে পারে। তবে এসব দাবির সত্যতা এখনও যাচাই করা যায়নি। ফায়ার সার্ভিস ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আগুনের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।
আমদানি কার্গোর আগুনের ঘটনায় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এখনও ক্ষতির নির্দিষ্ট পরিমাণ জানায়নি। সূত্রে বলা হয়েছে, কার্গোতে থাকা কাগজপত্র পুড়ে যাওয়ায় মালিকরা প্রমাণ-দলিল হারানোর আশঙ্কা করছেন, ফলে ক্ষতিপূরণ ও দাবি-প্রক্রিয়া জটিল হবে। ঘটনা তদন্তে ইতোমধ্যে পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে কার্গো আইটেম লেবেলিং, ডেঞ্জারাস গুডস রেকর্ড, কন্ট্রোল রুম-ফায়ার সার্ভিসের তথ্য আদান-প্রদানের তৎপরতা এবং প্রথমদিকে আগুন নেভানোর কৌশলগুলো খতিয়ে দেখা হবে।
ফায়ার সার্ভিসের একাধিক কর্মকর্তা জানান, অগ্নিকাণ্ডস্থলে কোনও ধরনের কেমিক্যাল থাকলে পানি সরাসরি প্রয়োগ বিপজ্জনক হতে পারে। তাই আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দফতরের কাছে মালামালের ‘ডেঞ্জারাস গুডস’ তালিকা, ম্যানিফেস্ট ও সেফটি ডেটা শিট (এসডিএস) থাকতে হবে এবং তাৎক্ষণিকভাবে ফায়ার ব্রিগেডকে জানাতে হবে। অভিযানের সময় তারা যে বিস্ফোরণ-আতঙ্ক ও ‘অজ্ঞাত রাসায়নিক’ সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন, তা আগামীতে পুনরাবৃত্তি রোধে নজিরবিহীন সতর্কতা ও সাংগঠনিক রদবদলের দাবি বাড়িয়ে দিয়েছে।
কার্গো ভিলেজের আগুন পরিকল্পিত, তদন্ত দাবি কাস্টমস অ্যাসোসিয়েশনের
ঢাকা কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডকে পরিকল্পিত ঘটনা বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছে। সংগঠনটির দাবি, এই অগ্নিকাণ্ড দেশের শিল্পকারখানা, আমদানি-রফতানি কার্যক্রম এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছে, যা জাতীয় অর্থনীতিকে অচল করার একটি নীলনকশার অংশ হতে পারে।
রবিবার সংগঠনের সভাপতি মিজানুর রহমানের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা জরুরি। পাশাপাশি দায়ীদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, আমদানি পণ্যের গুদামে সংরক্ষিত সব মালামাল আগুনে পুড়ে গেছে, কিছু পণ্য অবিকৃত দেখা গেলেও তাপ ও ধোঁয়ার কারণে তা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। কাস্টমস অ্যাসোসিয়েশনের অভিযোগ, সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ ও ফায়ার সার্ভিস যথাসময়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে। সংগঠনটি বিমানবন্দর এলাকার নিরাপত্তা ও অগ্নিনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়ন এবং আধুনিকায়নের দাবি জানায়। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণ ও আমদানি পণ্যের অস্থায়ী গুদাম দ্রুত চালুর আহ্বান জানায় তারা।