বিনা অপরাধে ৪৩ বছর জেল খেটে এখন বিতাড়নের ঝুঁকিতে মার্কিন ব্যক্তি

বিনা অপরাধে ৪৩ বছর জেল খেটে এখন বিতাড়নের ঝুঁকিতে মার্কিন ব্যক্তি

বিনা অপরাধে প্রায় ৪৩ বছর মার্কিন কারাগারে সাজা খেটেছেন সুব্রামানিয়াম ‘সুবু’ ভেদম। নতুন প্রমাণের ভিত্তিতে চলতি মাসের শুরুর দিকে তার সাবেক রুমমেটকে হত্যার অপরাধে আদালত তাকে নির্দোষ ঘোষণা করে মুক্তি দেয়। এক ফাড়া কাটার আগেই তিনি পড়েছেন অভিবাসন কর্মকর্তাদের খপ্পরে, যারা তাকে ধরে বেঁধে হলেও ভারতে ফেরত পাঠানোর তোড়জোড় করছে।

এখন ভেদমের আইনজীবীরা বিতাড়নের নির্দেশ স্থগিতের জন্য লড়ছেন, আর পরিবার চেষ্টা করছে তাকে স্থায়ীভাবে মুক্ত করতে।

ভারতীয় বংশোদ্ভূত হলেও ভেদম শৈশব থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে আছেন। তিনি স্থায়ী বৈধ মার্কিন বাসিন্দা এবং গ্রেফতারের আগে নাগরিকত্বের আবেদনও করেছিলেন। তার বাবা-মা দুজনেই মার্কিন নাগরিক ছিলেন।

ভেদমের বোন সরস্বতী বলেন, এখন আমরা সম্পূর্ণ নতুন ও ভিন্ন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি। কারাগারে ভেদম একজন সম্মানিত ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন। তিনি অন্য বন্দিদের পরামর্শ দিতেন। তিনি কর্তৃপক্ষের এতটাই আস্থা অর্জন করেছিলেন যে আলাদা সেলে থাকতেন। কিন্তু আইসিই (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট) এর জন্য এখন তাকে ৬০ জনের সঙ্গে এক কক্ষে থাকতে হচ্ছে, যেখানে কেউ তার অতীত জানে না।

তবু ভেদম বারবার বোনকে এককথাই বলছেন, আমাদের জয়টাই কেবল মনে রাখবে। আমি এখন আর অপরাধী নই। আর আমি এখন কেবল আটক অবস্থায় রয়েছি, সাজা খাটছি না।

প্রায় ৪০ বছর আগে ১৯ বছর বয়সি কলেজছাত্র টম কিনসারকে হত্যার দায়ে ভেদমকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। নিখোঁজ হওয়ার নয় মাস পর কিনসারের মরদেহ এক বনাঞ্চলে পাওয়া যায়। তার মাথায় গুলির চিহ্ন ছিল।

ঘটনার দিন ভেদম তার গাড়িতে লিফট চেয়েছিলেন। পরে গাড়িটি স্বাভাবিক স্থানে ফেরত পাওয়া গেলেও, কে ফিরিয়েছে তা কেউ দেখেনি। পালানোর আশঙ্কায় ভেদমকে জামিন না দিয়ে গ্রেফতার করা হয়, পাসপোর্ট ও গ্রিনকার্ডও বাজেয়াপ্ত করা হয়।

কিনসার হত্যা মামলায় দুই বছর পর ভেদমকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ১৯৮৪ সালে মাদক-সম্পর্কিত আরেক মামলায় সাড়ে পাঁচ বছরের দুটি পৃথক দণ্ড যোগ হয়, যা আগের সাজার সঙ্গে একত্রে কার্যকর হবে বলে আদালত আদেশ দেয়।

তবে হত্যার অভিযোগ সবসময়ই অস্বীকার করে গেছেন ভেদম। তার বিরুদ্ধে কোনও অকাট্য প্রমাণ ছিল না বলে দাবি করে এসেছে তার পরিবার ও সমর্থকরা।

বহুবার আপিলের পর নতুন প্রমাণ সামনে আসে, যা তার দাবিকে সত্য প্রমাণ করে। চলতি মাসে সেন্টার কাউন্টির জেলা অ্যাটর্নি বার্নি ক্যান্টর্না ঘোষণা দেন, নতুন করে ভেদমের বিরুদ্ধে মামলা চালানো হবে না।

তবে পরিবার জানত, আরেকটি বাধা রয়ে গেছে— ১৯৮৮ সালের পুরনো নির্বাসন আদেশ, যা তার হত্যাকাণ্ড ও মাদক মামলার ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছিল। তারা আশা করেছিলেন, এখন মামলা পুনরায় খোলার আবেদন করতে হবে। কিন্তু ভেদমকে হঠাৎই আইসিই আবার আটক করে, জানায় এই পুরনো আদেশের ভিত্তিতেই তাকে আটক রাখা হয়েছে।

যদিও হত্যার অভিযোগ থেকে মুক্তি মিলেছে, মাদক মামলার দণ্ড এখনো বহাল। আইসিই বলেছে, তারা আইনসম্মত আদেশ কার্যকর করছে।

বিবিসির সব প্রশ্নের উত্তর দেয়নি আইসিই। তবে নির্বাসনের আগ পর্যন্ত ভেদম হেফাজতে থাকবেন বলে জানিয়েছে তারা।

ভেদমের পরিবার বলেছে, জেলে কাটানো চার দশকে তার শৃঙ্খলাবোধ, তিনটি ডিগ্রি অর্জন ও সমাজসেবার নজির আদালতের বিবেচনায় রাখা উচিত।

তার বোন বলেন, সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, আমরা এক মুহূর্তের জন্যও তাকে জড়িয়ে ধরতে পারিনি। সে বিনা অপরাধে সাজা খেটেছে। এরপর মর্যাদা ও সততার সঙ্গে কারাজীবন কাটালো। এর কি কোনও মূল্য নেই!

আইসিই ভেদমকে যে ভারতে পাঠাতে চায়, সেই দেশের সঙ্গে তার সম্পর্ক এখন কেবল নামে। জন্মের নয় মাস পরই তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। ভারতে এখনও যে আত্মীয়রা জীবিত আছেন, তারা সবাই দূরসম্পর্কীয়।

সরস্বতী বলেন, আমি, আমার চার মেয়ে আর আমাদের সব নিকটাত্মীয় যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় থাকি। তাকে যদি ভারতে পাঠানো হয়, তবে সে আবারও আমাদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হবে। এটা হলে দ্বিতীয়বারের মতো তার জীবনটা ছিনিয়ে নেওয়া হবে।

তার আইনজীবী এভা বেনাচ বিবিসিকে বলেন, যে মানুষ ইতোমধ্যেই ইতিহাসের দীর্ঘতম অন্যায় সাজার শিকার, তাকে এখন এমন এক দেশে পাঠানো হবে যেখানে আর কোনও শিকড় নেই— এটি হবে আরেকটি ভয়াবহ অপরাধ।

তথ্যসূত্র: বিবিসি

Comments

0 total

Be the first to comment.

নেপালের পার্লামেন্ট ভাঙার প্রশ্নে থমকে আছে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের আলোচনা BanglaTribune | আন্তর্জাতিক

নেপালের পার্লামেন্ট ভাঙার প্রশ্নে থমকে আছে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের আলোচনা

নেপালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনে প্রেসিডেন্ট রাম চন্দ্র পাউদেল এবং সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কা...

Sep 12, 2025

More from this User

View all posts by admin