বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম বুধবার আউন্সপ্রতি ৪ হাজার ডলার ছুঁয়েছে। যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ। অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে বিনিয়োগকারীদের ঝোঁক, সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের সম্ভাব্য সুদহার হ্রাসের প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে স্বর্ণের বাজারে লেগেছে নতুন জোয়ার।
এই বছর এখন পর্যন্ত সোনার দাম বেড়েছে ৫২ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ক্রয়, শিথিল মুদ্রানীতি ও দুর্বল মার্কিন ডলারের কারণে এই উত্থান আরও ত্বরান্বিত হয়েছে।
কীভাবে সোনায় বিনিয়োগ করা হয়
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক সংঘাত, মুদ্রার ওঠানামা—সব মিলিয়ে স্বর্ণ এখন আবারও বিনিয়োগকারীদের চোখে ‘নিরাপদ আশ্রয়’। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যতদিন বিশ্ব অর্থনীতি অস্থির থাকবে, ততদিন স্বর্ণের ঝলক কমার সম্ভাবনা নেই।
স্পট মার্কেট
বড় বিনিয়োগকারী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে সরাসরি সোনা কেনে। এখানে দামের ওঠানামা নির্ধারিত হয় তাৎক্ষণিক সরবরাহ ও চাহিদার ওপর।
লন্ডন স্পট মার্কেটের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র। সেখানে লন্ডন বুলিয়ন মার্কেট অ্যাসোসিয়েশন (এলবিএমএ) মান নির্ধারণ ও লেনদেন কাঠামো তৈরি করে। পাশাপাশি চীন, ভারত, মধ্যপ্রাচ্য ও যুক্তরাষ্ট্রও স্বর্ণ কেনাবেচার বড় কেন্দ্র।
ফিউচার্স মার্কেট
এ বাজারে বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যতের নির্দিষ্ট সময় ও দামে স্বর্ণের কেনাবেচার চুক্তি করেন।
নিউইয়র্কের কমেক্স বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্বর্ণের ফিউচার্স বাজার। এছাড়া চীনের সাংহাই ফিউচার্স এক্সচেঞ্জ ও জাপানের টোকিও কমোডিটি এক্সচেঞ্জও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ড (ইটিএফ)
যারা হাতে স্বর্ণ রাখতে চান না, তাদের জন্য এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ড (ইটিএফ) জনপ্রিয় বিকল্প। এটি বিনিয়োগকারীদের স্বর্ণের দামের সঙ্গে সংযুক্ত রাখে। কিন্তু শারীরিকভাবে স্বর্ণ সংরক্ষণের প্রয়োজন হয় না।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে স্বর্ণভিত্তিক ইটিএফ-এ প্রায় ৬৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে। এর মধ্যে শুধু সেপ্টেম্বরেই রেকর্ড ১৭ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার যোগ হয়েছে।
বার ও কয়েন
খুচরা বিনিয়োগকারীরা দোকান বা অনলাইনে স্বর্ণের বার ও কয়েন কিনে থাকেন। এগুলো বস্তুগত স্বর্ণে বিনিয়োগের অন্যতম সহজ ও জনপ্রিয় উপায়।
দাম বৃদ্ধির মূল কারণ
বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ও বাজার মনোভাব
বিনিয়োগ তহবিলগুলোর আগ্রহ স্বর্ণের দামে বড় ভূমিকা রাখে। বৈশ্বিক খবর, অর্থনৈতিক প্রবণতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বাজারের মনোভাব পরিবর্তন করে। যা কখনও স্বর্ণের দাম হঠাৎ বাড়িয়ে দেয়, কখনও কমিয়ে আনে।
বিদেশি মুদ্রাবাজার ও ডলার দুর্বলতা
ডলার দুর্বল হলে সাধারণত স্বর্ণের দাম বাড়ে। কারণ, অন্যান্য মুদ্রার ধারকদের জন্য তখন স্বর্ণ তুলনামূলকভাবে সস্তা হয়। তাই স্বর্ণকে অনেকেই মুদ্রার অস্থিরতার বিরুদ্ধে ‘নিরাপদ আশ্রয়’ হিসেবে ব্যবহার করেন।
মুদ্রানীতি ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা
যখন বৈশ্বিক রাজনৈতিক টানাপোড়েন বা যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়ে, বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে সরে গিয়ে স্বর্ণে বিনিয়োগ করেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি ও চীনা পণ্যে শুল্ক বৃদ্ধির ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধের আশঙ্কা বেড়েছে। এতে মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে এবং স্বর্ণকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
এছাড়া সুদহার কমে গেলে স্বর্ণ ধরে রাখার ‘অবকাশমূল্য’ (অপরচুনিটি কস্ট) হ্রাস পায়, ফলে চাহিদা বাড়ে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ বৃদ্ধি
বিশ্বব্যাপী কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও স্বর্ণের রিজার্ভ বাড়াচ্ছে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বৈশ্বিক স্বর্ণের চাহিদা ১ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।
চীন একাই সেপ্টেম্বর শেষে ৭৪ দশমিক ০৬ মিলিয়ন ফাইন ট্রয় আউন্স স্বর্ণ মজুত রাখে, যা আগের মাসের তুলনায় সামান্য বেশি।
সূত্র: রয়টার্স