বিরল খনিজ রফতানিতে চীনের নতুন নিয়ন্ত্রণ আরোপের হুমকির পর যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশ নিজেদের সরবরাহ ব্যবস্থা বহুমুখী করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও বিপুল বিনিয়োগ সত্ত্বেও আগামী এক দশকের মধ্যে চীনের এই আধিপত্য ভাঙা সম্ভব নয়। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এ খবর জানিয়েছে।
বিরল খনিজ বা ‘রেয়ার আর্থ’ পেতে হলে দেশগুলোর শুধু খনি নয়, প্রক্রিয়াকরণ, ধাতু উৎপাদন ও চুম্বক তৈরির মতো জটিল সরবরাহ শৃঙ্খলও গড়ে তুলতে হবে। এই প্রক্রিয়া ব্যয়বহুল, পরিবেশ ঝুঁকিপূর্ণ এবং প্রযুক্তিগতভাবে জটিল।
অ্যাডামাস ইন্টেলিজেন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রায়ান কাস্তিলু বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের এই খাতে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলতে অন্তত ১০ থেকে ১৫ বছর সময় লাগবে। যুক্তরাষ্ট্র বছরে প্রায় ১০ হাজার টন এবং ইউরোপ ২৫ হাজার টন বিরল খনিজ চুম্বক চীন থেকে আমদানি করে। এ চাহিদা আগামী দশকে আরও বহুগুণে বাড়বে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রে নতুন খনি প্রকল্প দ্রুত অনুমোদন, কৌশলগত মজুদ বৃদ্ধি এবং কানাডার দুটি খনি কোম্পানিতে বিনিয়োগসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে।
গত মাসে মিসৌরি-ভিত্তিক ইউএস স্ট্র্যাটেজিক মেটালস পাকিস্তানের সামরিক সংস্থা ফ্রন্টিয়ার ওয়ার্কস অর্গানাইজেশন-এর সঙ্গে দক্ষিণ এশীয় খনিজ রফতানির বিষয়ে একটি চুক্তি করেছে। এপ্রিল মাসে ওয়াশিংটন ও কিয়েভের মধ্যে হওয়া আরেক চুক্তিতে ইউক্রেন ভবিষ্যৎ খনিজ বিক্রির লাভ ভাগাভাগিতে রাজি হয়।
jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68f7b291c9194" ) );
সর্বশেষ সোমবার অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজের সঙ্গে ৮.৫ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন ট্রাম্প। এর মাধ্যমে দুই দেশ অস্ট্রেলিয়ায় বিরল খনিজ প্রকল্পে যৌথভাবে বিনিয়োগ করবে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার তথ্যমতে, অস্ট্রেলিয়ার মজুদ চীনের তুলনায় প্রায় সাত ভাগের এক ভাগ। ফলে দেশটি এককভাবে চীনের প্রভাব কমাতে পারবে না।
চুক্তির পর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইউএসএ রেয়ার আর্থ কোম্পানির শেয়ার ১৪ শতাংশ বেড়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন গত বছর ক্রিটিক্যাল র’ ম্যাটেরিয়ালস অ্যাক্ট পাস করে ২০৩০ সালের মধ্যে নিজস্বভাবে ৪০ শতাংশ খনিজ প্রক্রিয়াকরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এরই অংশ হিসেবে এস্তোনিয়ার নারভা শহরে ইউরোপের প্রথম বিরল খনিজ চুম্বক কারখানা এবং ফ্রান্সের লা রোশেল শহরে সলভে প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র চালু হয়েছে।
ভারত, জাপানসহ এশিয়ার আরও কিছু দেশও চীনের বাইরে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির গবেষক রস চ্যান্ডলার বলেন, চীনের বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা একটি বহু দশকের প্রক্রিয়া। প্রযুক্তি, অনুমোদন ও অর্থায়ন—সব দিক থেকেই এটি সময়সাপেক্ষ।
তিনি বলেছেন, চীন শুধু খনন নয়, মধ্যবর্তী পর্যায়ের পরিশোধন ও ধাতু উৎপাদনেও কর্তৃত্ব রাখে। অন্যত্র এ সক্ষমতা তৈরি করা জটিল ও ব্যয়বহুল।
নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রহমান দায়ান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের হাতে বিশ্বের ৩৫-৪০ শতাংশ খনিজ মজুদ থাকলেও, প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতা মাত্র ১০-১৫ শতাংশ।
তিনি বলেন, যদি সব প্রকল্প, পুনর্ব্যবহার কর্মসূচি ও মজুদ পরিকল্পনা সফল হয়, তবে ২০৩০-এর পর পশ্চিমা দেশগুলো চাহিদার বড় অংশ পূরণ করতে পারবে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর তথ্যমতে, বর্তমানে বৈশ্বিক খনির ৭০ শতাংশ ও প্রক্রিয়াকরণের ৯০ শতাংশই চীনের নিয়ন্ত্রণে।
বিশ্লেষক হেইলি চ্যানার বলেন, চীন কয়েক দশক ধরে এই খাতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়িয়ে কাঁচা খনিজ থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াকরণ ও উৎপাদন পর্যন্ত সম্পূর্ণ সরবরাহ শৃঙ্খল তৈরি করেছে।
এই অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে এ মাসে বেইজিং ঘোষিত নতুন রফতানি নিয়ন্ত্রণ নীতির ফলে। ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই নিয়ম অনুযায়ী, যেসব কোম্পানি চীনা প্রযুক্তি বা খনিজের উপাদান ব্যবহার করবে, তাদের রফতানির জন্য বিশেষ অনুমতি নিতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আসন্ন বৈঠকের আগে এটি বেইজিংয়ের কৌশলগত চাপ প্রয়োগের অংশ।
অ্যাডামাস ইন্টেলিজেন্সের কাস্তিলু বলেন, নতুন নীতিমালা কার্যকর হলে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের জটিলতা বহুগুণে বাড়বে।
মালয়েশিয়ার ইনস্টিটিউট অব স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর বিশ্লেষক করিম কাসিমের মতে, চীনের প্রভাব অন্তত আরও এক দশক থাকবে। তিনি বলেন, এখানে সবচেয়ে বড় বাধা অর্থ নয়, সময় ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।
তার মতে, যদিও পশ্চিমা দেশগুলো চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে। তবুও দুই পক্ষের কৌশলগত প্রতিযোগিতা কমবে না। বরং তা নতুন খাতে ছড়িয়ে পড়বে।