২০১৯ সালের পর প্রথমবারের মতো চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করতে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর বেইজিংয়ের সঙ্গে বাণিজ্য বিষয়ক একাধিক খাতে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। বৃহস্পতিবার (৩০ অক্টোবর) অনুষ্ঠেয় বৈঠক নিয়ে এজন্য অনেকেরই রয়েছে ব্যাপক আগ্রহ।
দুই পরাশক্তির রাষ্ট্রপ্রধানের বৈঠকের সম্ভাব্য আলোচ্যসূচি নিয়েই এই প্রতিবেদন।
গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজ
প্রতিরক্ষা, অটোমোবাইল এবং ইলেকট্রনিকস শিল্পের অন্যতম উপাদান হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজ। এই খাতের বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে (সাপ্লাই চেইন) রয়েছে চীনের প্রায় একচ্ছত্র আধিপত্য। আবার এই খাতে যুক্তরাষ্ট্রেরও রয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। ফলে, স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেওয়া হচ্ছে, ট্রাম্প-শি আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে বিরল খনিজের বিষয়টি।
চলতি মাসে বিরল খনিজ ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি রফতানিতে কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করে বেইজিং। প্রতিক্রিয়ায় সব চীনা পণ্যের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দেন ট্রাম্প, যা শনিবার কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
আরেকটি বাণিজ্যযুদ্ধ বাঁধিয়ে দেওয়ার মতো হুমকি দিলেও পরে ভিন্ন এক বক্তব্যে কিছুটা সুর নরম করে ট্রাম্প বলেন, এমন উচ্চ শুল্ক টেকসই কোনও সমাধান নয়। শিগগিরই হয়তো বিরল খনিজ নিয়ে যথাযথ একটা চুক্তি সম্ভব।
ফেন্টানিলের ওপর শুল্ক
ফেন্টানিল ইস্যুতে চীনা পণ্যের ওপর মার্চ থেকে ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে রেখেছে হোয়াইট হাউজ। ট্রাম্পের অভিযোগ, ফেন্টানিলসহ অন্যান্য উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মাদক যুক্তরাষ্ট্রে পাচাররোধে যথেষ্ট পদক্ষেপ নেয়নি বেইজিং। তবে তার দাবির বিপরীতে চীন বলেছে, তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে পর্যাপ্ত সহযোগিতা করেছে এবং শুল্ক আরোপ করে মাদক সমস্যার সমাধান হবে না।
শি'র সঙ্গে সাক্ষাতের আগের দিন অবশ্য ট্রাম্প বলেছেন, ফেন্টানিলের শুল্ক তিনি কমানোর কথা ভাবছেন।
সয়াবিন
ট্রাম্পের ফেন্টানিল শুল্কের সিদ্ধান্তে হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি চীন। তারা সয়াবিনসহ মার্কিন কৃষিপণ্য আমদানিতে পালটা শুল্ক আরোপ করে।
গত বছর মার্কিন সয়াবিন রফতানির অর্ধেকের গন্তব্য ছিল চীন। অথচ চলতি বছর সয়াবিনের সব ক্রয়াদেশ বাতিল করে বেইজিং। প্রতিশোধমূলক এই শুল্কে চাপে পড়েছেন মার্কিন কৃষকরা, যারা ট্রাম্পের অন্যতম রাজনৈতিক সমর্থক গোষ্ঠী।
ট্রাম্প-শি বৈঠকের প্রস্তুতি হিসেবে মালয়েশিয়ায় দুদেশের বাণিজ্য প্রতিনিধিরা আলোচনায় বসেন। বৈঠকের পর মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, উল্লেখযোগ্য পরিমাণে সয়াবিন ক্রয়ে সম্মত হয়েছে বেইজিং।
ইউক্রেন যুদ্ধ
ইউক্রেন যুদ্ধে চীনের অবস্থান নিয়ে শি'র সঙ্গে আলাপ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। রাশিয়ার অন্যতম বাণিজ্যিক অংশীদার চীনের দাবি, ইউক্রেন যুদ্ধে তাদের অবস্থান নিরপেক্ষ। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, রুশ জ্বালানি তেল আমদানিকারকরা পরোক্ষভাবে যুদ্ধে অর্থায়নে দায়ী।
চীনসহ সব আমদানিকারককে রুশ তেল ক্রয় হ্রাস করতে চাপ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এরমধ্যে মঙ্গলবার, রাশিয়ার ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহারে শি'কে চাপ প্রয়োগে ট্রাম্পের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।
তাইওয়ান
চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে তাইওয়ান সবসময় একটা উত্তপ্ত ইস্যু। গণতান্ত্রিকভাবে শাসিত দেশটিকে নিজেদের সার্বভৌমত্বের আওতাধীন দাবি করে বেইজিং। সাংবিধানিকভাবে, ওয়াশিংটন 'এক চীন নীতি' মেনে চললেও, আত্মরক্ষার্থে তাইওয়ানকে প্রয়োজনে সামরিক সহায়াত দেওয়ার বিধি তৈরি করে রেখেছে ওয়াশিংটন।
তাইওয়ানের স্বাধীনতার দাবির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে বারংবার চাপ প্রয়োগ করে আসছে চীন। তবে শনিবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সে দাবি মেনে নেওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে বলেন, সুবিধাজনক বাণিজ্য চুক্তির বিনিময়েও তাইওয়ান ইস্যুতে পিছু হটবে না যুক্তরাষ্ট্র।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিও শি-ট্রাম্প বৈঠকে অগ্রাধিকার পেতে পারে। মার্কিন রফতানি বিধিনিষেধের প্রতিক্রিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য প্রয়োজনীয় চিপ শিল্পে মনোযোগ বৃদ্ধি করেছে চীন।
এদিকে মার্কিন চিপ প্রস্তুতকারী কোম্পানি এনভিডিআ'র প্রধান জেনসেন হুয়াং সতর্ক করেছেন, চীনে মার্কিন এআই চিপ বিক্রির অনুমতি না দিলে সিলিকন ভ্যালি তার বৈশ্বিক দাপট হারাতে পারে।
বর্তমানে জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগ, চীনের নিষেধাজ্ঞা এবং বাণিজ্য উত্তেজনার কারণে এনভিডিআ'র চিপ চীনে রফতানি বন্ধ রয়েছে।
টিকটক
দু রাষ্ট্রপ্রধানের আলোচনার টেবিলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকের মালিকানাসংক্রান্ত জটিলতার বিষয়টিও উত্থাপিত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকির অভিযোগে টিকটকের মালিকানাধীন চীনা প্রতিষ্ঠান বাইটড্যান্সের কাছ থেকে মার্কিন অংশের মালিকানা দখলে নেওয়ার চেষ্টা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। গত মাসে, টিকটকের যুক্তরাষ্ট্র অংশের মালিকানা একদল মার্কিন বিনিয়োগকারীর কাছে হস্তান্তরে নির্বাহী আদেশ জারি করেন প্রেসিডেন্ট। বৃহস্পতিবারের বৈঠকে এ সংক্রান্ত চূড়ান্ত চুক্তি হতে পারে বলে আভাস দিয়েছেন স্কট বেসেন্ট।
তথ্যসূত্র: এএফপি