গাজা অভিমুখী ত্রাণবাহী গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা থেকে গ্রেফতার হওয়া আরও মানবাধিকার কর্মীরা ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছে। এসব অভিযোগ রবিবার (৫ অক্টোবর) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কর্মীদের প্রতি আচরণের বিষয়ে বাড়তে থাকা নজরদারিকে আরও তীব্র করেছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এ খবর জানিয়েছে।
রবিবার ইতালির রোমের ফিউমিচিনো বিমানবন্দরে ফিরে এসে ইতালীয় কর্মী চেসারে তোফানি বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে ভয়ংকরভাবে আচরণ করা হয়েছে... সেনাবাহিনীর পর আমাদের পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেখানে হয়রানি করা হয়েছে।’ ইতালীয় সংবাদ সংস্থা আএনএসএ এই তথ্য জানিয়েছে।
ফ্লোটিলায় থাকা অন্যান্য কর্মীদের সঙ্গে মিলানের মালপেনসা বিমানবন্দরে পৌঁছেছিলেন ইতালির ইসলামিক কমিউনিটিস ইউনিয়নের সভাপতি ইয়াসিন লাফরাম। তিনি ইতালির সংবাদপত্র কোরিয়েরে দেলা সেরা-কে বলেন, ‘তারা আমাদের সঙ্গে সহিংস আচরণ করেছে। আমাদের দিকে অস্ত্র তাক করেছে।’
শনিবার রাতে ফিউমিচিনো বিমানবন্দরে পৌঁছেছিলেন ইতালীয় সাংবাদিক সাভেরিও টোম্মাসি। তিনি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) বলেন, ইসরায়েলি সেনারা তাদেরকে কাছ থেকে ওষুধ কেড়ে নিয়েছে। তাছাড়া মানবাধিকার কর্মীদের নিয়ে অপমান, ঠাট্টা ও হাসাহাসি করেছে।
তিনি উল্লেখ করেন, গ্রেফতার কর্মীদের মধ্যে ছিলেন সুইডিশ জলবায়ু কর্মী গ্রেটা থুনবার্গ, নেলসন ম্যান্ডেলার নাতি ম্যান্ডলা ম্যান্ডেলা এবং ইউরোপীয় কয়েকজন সংসদ সদস্য। তাদের নিয়েই বেশি উপহাস করেছে ইসরায়েলি প্রহরীরা।
ইতালীয় সাংবাদিক লরেঞ্জো ডি’আগোস্তিনো বলেন, তার ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ও অর্থ ইসরায়েলিরা চুরি করেছে।
শনিবার ইসরায়েল থেকে তুরস্কের ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরে পৌঁছে এপিকে তিনি জানান, গ্রেফতার কর্মীদের কুকুর দিয়ে ভয় দেখানো হয়েছে এবং সৈন্যরা বন্দিদের দিকে তাদের অস্ত্রের লেজার নিশানা তাক করে ভয় দেখিয়েছে।
আরেক কর্মী পাওলো দে মন্টিস জানান, তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্লাস্টিকের হাতকড়া পরিয়ে একটি ভ্যানের ভেতরে আটকে রাখা হয়েছিল, এবং তিনি অবিরাম মানসিক চাপ ও অপমান সহ্য করেছেন।
তিনি এপিকে বলেন, আমাদের তাদের মুখের দিকে তাকাতে দেওয়া হয়নি, মাথা নিচু রাখতে হতো। একবার আমি তাকালে একজন এসে আমাকে ঝাঁকুনি দেয় ও মাথার পেছনে চড় মারে। তারা আমাদের চার ঘণ্টা হাঁটু গেড়ে থাকতে বাধ্য করে।
এদিকে মালয়েশিয়ার দুই বোন ও গায়িকা-অভিনেত্রী হেলিজা হেলমি এবং হাজওয়ানি হেলমিও ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে গ্রেফতার অবস্থায় “নৃশংস” ও “নির্মম” আচরণের শিকার হওয়ার বর্ণনা দিয়েছেন।
হাজওয়ানি আনাদোলু সংবাদ সংস্থাকে বলেন, “ভাবুন তো, আমরা টয়লেটের পানি খেয়েছি! অনেকেই ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছিল, কিন্তু তারা (ইসরায়েলিরা) বলেছিল: ‘মরে গেছে নাকি? যদি না মরে থাকে, তাহলে সেটা আমার সমস্যা নয়।’ তারা অত্যন্ত নির্মম মানুষ।”
হেলিজা জানান, তিনি কয়েক দিন খাবার না খেয়ে ছিলেন। “আমি ১ অক্টোবর খেয়েছিলাম। আজ আমার প্রথম খাবার,” শনিবার তিনি বলেন, তিন দিন আমি কিছু খাইনি—শুধু টয়লেটের পানি পান করেছি।
এর আগে ফ্লোটিলার সবচেয়ে পরিচিত সদস্য গ্রেটা থুনবার্গের প্রতি নির্যাতনের বিষয়ে মুখ খুলেছিলেন কর্মীরা। তাদের দাবি, থুনবার্গকে মাটিতে টেনেহিঁচড়ে নেওয়া হয়েছিল এবং ইসরায়েলি পতাকা চুম্বন করতে বাধ্য করা হয়েছিল।
কর্মীদের এসব অভিযোগের পর ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও চরম-ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির পরস্পরবিরোধী প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, থুনবার্গ ও অন্যান্য কর্মীদের নির্যাতনের এসব বর্ণনা মিথ্যা। এদিকে বেন-গভির বলেছেন, তিনি কেতজিওত কারাগারে বন্দি অবস্থায় কর্মীদের প্রতি কঠোর আচরণে গর্বিত।
তিনি বলেন, আমি গর্বিত যে আমরা ‘ফ্লোটিলা কর্মীদের’ সন্ত্রাসবাদের সমর্থক হিসেবে দেখি। যারা সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করে, তারা নিজেরাও সন্ত্রাসী এবং সন্ত্রাসীদের মতোই আচরণের যোগ্য।
বেন-গভির আরও বলেন, যদি কেউ ভেবে থাকে তারা এখানে এসে লাল কার্পেট আর তূর্যধ্বনি দিয়ে অভ্যর্থনা পাবে, তবে তারা ভুল করেছে। তাদের উচিত কেতজিওত কারাগারের অবস্থা অনুভব করা এবং ইসরায়েলের দিকে ফেরার আগে দু’বার ভাবা।
ইসরায়েলের এই গ্রেফতার ও কর্মীদের প্রতি আচরণের বিরুদ্ধে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ হয়েছে। গ্রীস লিখিত প্রতিবাদ জানিয়েছে। ইসরায়েলের সমালোচনা করেছে পাকিস্তান, তুরস্ক ও কলম্বিয়াসহ একাধিক দেশ।