ব্রিটেনের বামপন্থি নতুন রাজনৈতিক দল ইয়োর পার্টি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠার আগেই অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে। সাবেক লেবার নেতা জেরেমি করবিন এবং তার সহ-প্রতিষ্ঠাতা, কভেন্ট্রি সাউথের এমপি জারা সুলতানার দলের তহবিল সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তীব্র অভ্যন্তরীণ সংঘাতের জের ধরেই এই সংকটের সৃষ্টি। ফলে দলটি পদত্যাগের প্রথম বড় আকারের ঘটনা ঘটেছে, যেমন ব্ল্যাকবার্নের এমপি আদনান হুসেইনের পদত্যাগ।
ফিলিস্তিনপন্থী মঞ্চে জয়ী স্বতন্ত্র এমপিদের জোট 'ইন্ডিপেন্ডেন্ট অ্যালায়েন্স' এর সদস্য আদনান দলটির ষ্টিয়ারিং কমিটি থেকে পদত্যাগ করেছেন। তিনি এই দলের অভ্যন্তরে "বিষাক্ত, বর্জনমূলক এবং গভীরভাবে হতাশাজনক" সংস্কৃতির অভিযোগ এনেছেন।
তার প্রস্থানে ইন্ডিপেন্ডেন্ট অ্যালায়েন্সের জনসমক্ষে করা অভিযোগের ঠিক পরেই ঘটেছে। আইএ দাবি করেছে, সুলতানা ইচ্ছাকৃতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দলীয় অনুদান এবং সদস্যপদ বাবদ সংগৃহীত প্রায় আট থেকে সাড়ে আট লাখ পাউন্ড স্থানান্তরে দেরি করছেন।
বিবিসি কোয়েশ্চন টাইমে সুলতানার হাই-প্রোফাইল উপস্থিতির মাত্র কয়েক মিনিট আগে এই তহবিল বিতর্ক প্রকাশ্যে আসে। আইএ এটিকে সম্ভাব্য নেতৃত্ব নিয়ে ভীত প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর দ্বারা সুলতানাকে "ইচ্ছাকৃতভাবে হেনস্থা করার চেষ্টা" হিসাবে দেখছে। তবে মূল সমস্যাটি আরও গভীর আদর্শিক বিভেদকে কেন্দ্র করে।
কিছু সংবাদমাধ্যমে ট্রান্সজেন্ডার অধিকার সংক্রান্ত নীতি নিয়ে সংঘাতের খবর এলেও, চলমান এই বিরোধটি কেবল নীতির প্রশ্ন নয়, বরং দলটির নৈতিক পরিচয়ের একটি মৌলিক মতানৈক্য।
দলটির সঙ্গে সম্পৃক্ত আছেন ব্রিটিশ বাংলাদেশীদের মুলধারার রাজনীতিতে সক্রিয় তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। তাদের সঙ্গে কথা বলে বাংলা ট্রিবিউন জানতে পেরেছে, করবিনের ভাবনা ছিল ধীরগতিতে, একেবারে তৃণমূল পর্যায় থেকে একটি দল গড়ে তোলা, যা পুরোনো লেবার পার্টির কেন্দ্রীকরণের ত্রুটিগুলিকে পুনরাবৃত্তি করবে না। অন্যদিকে, জুলাই ২০২৫-এ লেবার পার্টি থেকে নাটকীয়ভাবে পদত্যাগের পর জারা সুলতানা ও তার সমর্থকরা দ্রুত একটি ওয়েস্টমিনিস্টার-কেন্দ্রিক দল গড়ার পদ্ধতির পক্ষে জোর দেন।
আদনান হুসেইন এবং ইন্ডিপেন্ডেন্ট অ্যালায়েন্স, যারা মূলত গাজা নিয়ে লেবার পার্টির অবস্থানের কারণে ক্ষুব্ধ শ্রমিক-শ্রেণির মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করেন, তারা বৈচিত্র্যময় সামাজিক মতামতকে ধারণ করতে পারে এমন একটি সত্যিকারের "প্রশস্ত চারণভূমি" তৈরি করছেন বলে বিশ্বাস করতেন। হুসেইন দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, বিশেষ করে মুসলিম পুরুষরা যখন তাদের নির্বাচনী এলাকার জটিল সামাজিক অবস্থানগুলি তুলে ধরতে চেয়েছেন, তখন তারা "উপেক্ষা করার মনোভাব" এবং "অস্পষ্ট কুসংস্কার"-এর শিকার হয়েছেন।
জেরেমি করবিনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এই নতুন দলের সাফল্যের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। এই ধরনের ভাঙন তার দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত একট গণ-আন্দোলনকে মূলধারার বাইরে বড় দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার আকাংখায় চূড়ান্ত ব্যর্থতার ইঙ্গিত এখন স্পষ্ট। জারা সুলতানার সঙ্গে নতুন দলের সহ-নেতৃত্বে থাকার করবিনের সিদ্ধান্ত ছিল একটি কৌশলগত পদক্ষেপ, যা তার প্রজন্মের আবেদনকে তরুণ, প্রচারমাধ্যম-সচেতন মুখের সঙ্গে একত্রিত করার চেষ্টা। যদিও এই সিদ্ধান্তে বিতর্কও কম ছিল না; সমালোচকরা প্রশ্ন তুলেছিলেন যে তিনি সম্মুখ-নেতৃত্বের জন্য সুলতানার ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করেছিলেন কিনা।
বামপন্থী মহলে বিকল্প হিসেবে প্রায়শই পপলার এবং লাইমহাউসের বাংলাদেশী বংশোব্দুত এমপি আপসানা বেগমের নাম তখন আলোচিত হচ্ছিল। করবিন,আপসানা ও সুলতানা তিনজনেই ব্যক্তিগতভাবে ঘনিষ্ট। আপসানা ও সুলতানা দুজনের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে করবিনের অবদান সমাদিত। আপসানা বেগমের সঙ্গে সুলতানার পটভূমিগত মিল রয়েছে—উভয়েই নীতিগত সমাজতান্ত্রিক, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নারী—তবু শেষ পর্যন্ত লেবার পার্টিতে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দুই-সন্তান বেনিফিট ক্যাপের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার জন্য জুলাই ২০২৪-এ সুলতানাসহ ছয়জন 'বিদ্রোহী' এমপির সঙ্গে আপসানা বেগমকেও লেবার পার্টি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। যদিও লেবার পার্টি পরে তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে এই ক্যাপ তুলে নেয়, তারপরও ব্রিটিশ বাংলাদেশী আপসানা বেগমকে সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত, তার সহকর্মীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে দীর্ঘ সময়ের জন্য, বরখাস্ত থাকতে হয়েছিল।
'ইয়োর পার্টি'র এই সংকটের প্রভাব কেবল লন্ডনের ইজলিংটন বা কভেন্ট্রির সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়। এই দলটির আনুষ্টানিক শুরুর আগেই এমন ব্যর্থতা যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপের বাম মহলে নিঃসন্দেহে একটি হতাশাজনক বার্তা দেবে।