নিজেদের বৈশ্বিক ব্র্যান্ড না থাকায় রপ্তানি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উন্নীত হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। তারা বলেন, বৈশ্বিক বাজারে পণ্য প্রসারের জন্য দেশের ইতিবাচক ব্র্যান্ডিং তৈরির পাশাপাশি দেশের জনগণের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। পণ্যের ব্রান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে ভোক্তার অভিরুচি, ইচ্ছা ও আগ্রহের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি খাতের মধ্যকার সমন্বয়ও জরুরি।
সোমবার (২৯ সেপ্টেম্বর) ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘সিএমএসএমই খাতের ব্র্যান্ডিং ও বিপণন চ্যালেঞ্জ: রপ্তানি সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তারা। ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ।
আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন শিল্পসচিব ওবায়দুর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে যোগ দেন রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলাম। সেমিনারে কুটির ও ক্ষুদ্র শিল্পের ব্র্যান্ডিংয়ে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেন অংশগ্রহণকারী উদ্যোক্তারা। তাদের মতে, এসব সীমাবদ্ধতা ক্ষুদ্র শিল্পের পণ্য রপ্তানিতে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করছে।
শিল্পসচিব মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, ব্র্যান্ডিং ও মার্কেটিং আমাদের সিএমএসএমইদের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ। সেই সঙ্গে চ্যালেঞ্জিংও। তবে নিজেদের বৈশ্বিক ব্র্যান্ড না থাকায় রপ্তানি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উন্নীত হচ্ছে না। উদ্যেক্তাদের প্রণোদনা সহায়তা প্রাপ্তিতে আস্থার অভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এছাড়াও আন্তর্জাতিক বাজারের বাণিজ্য সম্প্রসারণে বিদ্যমান সমস্যা ও সম্ভাবনা চিহ্নিত করার পাশাপাশি কর্মকৌশল নির্ধারণে বর্হিবিশ্বে বাংলাদেশের দূতাবাসের কর্মকর্তাদের কার্যক্রম আরও গতিশীল হওয়া প্রয়োজন।
তিনি জানান, ২০১৯ সালের তৈরিকৃত এসএমই নীতিমালাকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে এবং সেখানে নতুন নতুন ব্যবসায়িক খাতগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অনলাইনে ব্যবসা পরিচালনায় সহায়তা করতে ট্রেড লাইসেন্স প্রদানে উদ্যোক্তাদের বসবাসের ঠিকানাকে ব্যবসায়িক ঠিকানা ব্যবহারের বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করে যেতে পারে। ব্র্যান্ডিংয়ের সঙ্গে পণ্যের মান ও মেধাসত্ত্বের বিষয়টি নিশ্চিত করা গেলে আমাদের রপ্তানি বেশ বাড়বে। এসএমই খাতের উন্নয়নে সরকারি সব সংস্থার একটি সম্মিলিত উদ্যোগ একান্ত অপরিহার্য।
তার প্রতিষ্ঠানের নানাবিধ সীমাবদ্ধতা থাকা সত্বেও উদ্যোক্তাদের জন্য শিল্প পার্ক স্থাপন, স্বল্প হারে আর্থিক সহায়তা ও প্রশিক্ষণ প্রদান করে আসছে উল্লেখ করে বিসিক চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, বিসিক শিল্প পার্কে শিল্প স্থাপনে হোল্ডিং ট্যাক্স অব্যাহিত দেওয়ার লক্ষ্যে তারা কাজ করে যাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশি পণ্যের অন্তর্ভুক্তি আরও বাড়নো জরুরি বলে তিনি মতপ্রকাশ করেন।
তিনি উল্লেখ করেন, আমাদের পণ্যের প্যাকেজিং তেমন আকর্ষনীয় নয়, যেখানে উদ্যোক্তাদের আরও মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। এসএমই খাতের বিভিন্ন ক্যাটাগরির উদ্যোক্তাদের তথ্য সম্বলিত একটি ডাটাবেজ তৈরিতে তার প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ বলেন, বৈশ্বিক বাজারে পণ্য প্রসারের জন্য দেশের ইতিবাচক ব্র্যান্ডিং তৈরির পাশাপাশি দেশের জনগনের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। পণ্যের ব্র্যান্ডিংয়েরর ক্ষেত্রে ভোক্তার অভিরুচি, ইচ্ছা ও আগ্রহের বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
সরকারি-বেসরকারি খাতের মধ্যকার সমন্বয় বাড়ানোর ওপর জোরারোপ করে তিনি বলেন, ইপিবিতে শিগগির রপ্তানি ইকো-সিস্টেম এবং সিএমএসএমই হেল্প ডেস্ক স্থাপন করা হবে, যেখানে সরকারি সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধরা ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। এর মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের সহায়তা নিশ্চিত হবে। এছাড়া, আগামী বছরে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিতব্য বাণিজ্যমেলায় বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণের লক্ষ্যে ইপিবি কাজ করছে। দেশীয় উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়নে দেশি-বিদেশি প্রশিক্ষকদের সহায়তায় প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করা হবে।
ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, জিডিপিতে আমাদের এসএমইদের অবদান ২৮ শতাংশ হলেও, শ্রীংলকা, ভিয়েনাম এবং কম্বোডিয়ার মত দেশে এই খাতের অবদান প্রায় ৫০ শতাংশ। প্রয়োজনীয় ঋণ সহায়তা না পাওয়া, সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা, অপ্রতুল অবকাঠামো, দক্ষতার স্বল্পতা, নীতি সহায়তা না পাওয়ার পাশাপাশি কঠিন শর্তাবলী, স্থানীয় ও বৈশ্বিক বাজারে অভিগম্যতার সীমাবদ্ধতা এবং নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে পিছিয়ে থাকার কারণে আমাদের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পখাতের উদ্যোক্তাদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
অনুষ্ঠনের নির্ধারিত আলেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমইএসপিডির অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান, বাংলাদেশ প্লাস্টিক গুডস ম্যানুফেকচারার অ্যান্ড এক্সপোটার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিজিএমইএ) সভাপতি শামীম আহমেদ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিজনেস প্রমোশন কাউন্সিলের উপ-সচিব ড. মো. রাজ্জাকুল ইসলাম, ঢাকা চেম্বারের প্রাক্তন পরিচালক ও ক্রিয়েশন (প্রাইভেট) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রাশেদুল করিম মুন্না, বাংলাদেশ জুট গুডস্ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম পিন্টু এবং হাত বাক্স-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাফাত কাদের অংশ নেন।
ইএআর/এএমএ/এএসএম