প্রশ্ন: আমার মেয়ে ক্লাস এইটে উঠেছে। বয়ঃসন্ধিকাল পার করছে। আমরা অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল। মেয়ের বাবা যখন মারা যায় তখন তার বয়স ৪। আমি দুই বছর আগে পারিবারিক সম্মতিতে বিয়ে করেছি। বিয়ের পর থেকে আমার মেয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্কের অবনতি ঘটতে থাকে। আমার বর্তমান জীবনসঙ্গীর সঙ্গে আমার মেয়ের সম্পর্ক ভালো। কিন্তু মেয়েকে আমি যাই বলি না কেন সে শুনতে আগ্রহী নয়। আমরা সম্মিলিতভাবে কাউন্সিলিংয়ে বসার চেষ্টা করেছি। কিন্তু সম্ভব হয়নি। এখন আমার করণীয় কী?
উত্তর: আপনার আগে বুঝতে হবে কেন এমন হচ্ছে? আপনার মেয়ের এই আচরণের পেছনে একটি নির্দিষ্ট কারণ নেই, বরং কয়েকটি জটিল বিষয় একসঙ্গে কাজ করছে।তার মধ্যে প্রধান কারণ হলো বয়ঃসন্ধিকাল। ক্লাস এইট (১৩-১৪ বছর) মানে সে বয়ঃসন্ধিকালের ঠিক মাঝখানে আছে। এই সময় হরমোনের পরিবর্তনের কারণে তাদের মেজাজ খুব দ্রুত ওঠানামা করে, তারা নিজেদের স্বতন্ত্র সত্তা খুঁজে পেতে চায় ও বাবা-মায়ের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে। এটা খুবই স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া।
আপনি উল্লেখ করেছেন, তার ৪ বছর বয়সে বাবা মারা গেছেন। সেই শোক হয়তো সে পুরোপুরি প্রক্রিয়াই করতে পারেনি। শিশুরা অনেক সময় তাদের শোক প্রকাশ না করে চেপে রাখে, যা পরে অন্যভাবে প্রকাশ পায়। যদিও আপনার বর্তমান সঙ্গীর সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো (যা একটি চমৎকার বিষয়), কিন্তু আপনার বিয়ে তার জীবনে একটি বিশাল পরিবর্তন এনেছে। সে হয়তো অবচেতন মনে একটি দ্বন্দ্বে ভুগছে।
আপনি বলছেন, আপনার বিয়ের পর থেকে সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। এর কারণ হতে পারে, সে আপনাকে তার নতুন সঙ্গীর সঙ্গে ‘ভাগ’ করতে পারছে না। সে আপনাকে দূরে ঠেলে দিয়ে হয়তো তার অভিমান বা কষ্টটাই প্রকাশের চেষ্টা করছে। সেক্ষেত্রে যৌথ কাউন্সিলিং সম্ভব না হলে, দয়া করে আপনি একা কাউন্সিলিং শুরু করুন। এটা এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি। একজন পেশাদার থেরাপিস্ট আপনাকে মানসিক চাপ সামলাতে সাহায্য করতে পারেন। তিনি আপনাকে শেখাবেন, কীভাবে আপনার মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে হবে, কোন কথাগুলো এড়িয়ে চলতে হবে ও কীভাবে তার এই বিদ্রোহকে ব্যক্তিগতভাবে না নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। আপনি মেয়ের জন্য আলাদা কাউন্সিলিংয়ের (বাধ্য না করে)এর ব্যবস্থা করেন।
মনে রাখবেন বয়ঃসন্ধিকালে "আদেশ" বা "উপদেশ" একদম কাজ করে না। তারা এটাকে তাদের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ মনে করে। সেহেতু উপদেশ দেওয়া বন্ধ করুন। তাকে গুরুত্ব দিন, এবং ছোট ছোট বিষয়ে ছাড় দিন: তার জামাকাপড়, চুলের স্টাইল বা ঘর গোছানোর মতো ছোটখাটো বিষয় নিয়ে প্রতিদিন যুদ্ধ করবেন না। বয়ঃসন্ধিকাল একটি ঝড়ের মতো। এই ঝড় একদিনে থামবে না। আপনার মেয়ে আপনাকে হয়তো পরীক্ষা করছে যে আপনি তাকে এখনো আগের মতোই ভালোবাসেন কি না। আপনার কাজ হলো সেই পরীক্ষায় পাস করা।
আমরা নিজেদের দৈনন্দিন কাজকে খাটো করে দেখি
প্রশ্ন: আমার বয়স ৫৬। আমার স্ত্রী ও আমি অনেক টানাপোড়েনের মধ্যে আমাদের সংসার চালিয়ে দুই ছেলেমেয়ে বড় করেছি। এখন তারা দুই জনই দেশের বাইরে থাকে। এখন আমাদের ভালো থাকার সময়, কিন্তু আমরা সবকিছু ছেলেমেয়ের পেছনে ব্যয় করার কারণে কোনও সঞ্চয় রাখিনি। ছেলেমেয়েদের বলবো সেই ইচ্ছে হয় না, তারাও নিজে থেকে কিছু করার মতো অবস্থায় হয়তো এখনও আসেনি। এই বয়সে আমরা নতুন করে কী কাজ করতে পারি যদি কোনও বিশেষজ্ঞ পরামর্শ পাওয়া যায়।
উত্তর: এই বয়সটি নতুন করে কিছু শুরু করার জন্য অত্যন্ত উপযুক্ত, কারণ এই বয়সে আপনার কাছে এমন কিছু সম্পদ আছে যা তরুণদের কাছে নেই: অভিজ্ঞতা, ধৈর্য ও বিশ্বাসযোগ্যতা।
আপনি ভেবে দেখতে পারেন। আপনি যদি কোনও নির্দিষ্ট পেশায় (যেমন অ্যাকাউন্টিং, অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, শিক্ষকতা, টেকনিক্যাল কাজ) যুক্ত থাকেন, তাহলে সেই বিষয়ে ফ্রিল্যান্স বা খণ্ডকালীন পরামর্শক হিসেবে কাজ করতে পারেন। অনেক ছোট বা মাঝারি প্রতিষ্ঠান অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ চায়।
আপনার বা আপনার স্ত্রীর যদি কোনও বিষয়ে (যেমন ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, বাংলা) ভালো দখল থাকে, তাহলে বাসাতেই ছাত্র-ছাত্রী পড়াতে পারেন। এই বয়সের শিক্ষকদের প্রতি অভিভাবকদের আলাদা বিশ্বাস ও সম্মান থাকে। আপনি চাইলে শখ বা গৃহস্থালি দক্ষতাকে কাজে লাগাতে পারেন। অনেক সময় আমরা নিজেদের দৈনন্দিন কাজকে খাটো করে দেখি, কিন্তু এগুলোই আয়ের দারুণ উৎস হতে পারে। ঘরে তৈরি খাবার বা টিফিন সার্ভিস একটি অত্যন্ত লাভজনক ও কম পুঁজির ব্যবসা। আপনার স্ত্রী যদি ভালো রান্না করেন, তাহলে আপনারা আশেপাশের অফিস, হাসপাতাল কিংবা ব্যাচেলরদের জন্য দুপুরের খাবার বা টিফিনের সার্ভিস শুরু করতে পারেন। আপনারা দুই জন মিলেই এই কাজ সামলাতে পারেন (একজন রান্না ও প্যাকেজিং, অন্যজন ডেলিভারি বা হিসাব)। আপনি কী করার ইচ্ছে সেটি ভেবে শুরু করুন, দেখবেন ঠিকই দাঁড়িয়ে যাচ্ছে।
সন্তানদের বিষয়ে পরামর্শআপনারা সন্তানদের কিছু বলতে চান না, এটা স্বাভাবিক। আপনারা যখন নতুন কোনও কাজ শুরু করবেন তখন তাদের বলুন: ‘দেখো, আমরা অবসরে বসে না থেকে একটা নতুন কাজ শুরু করেছি। তোমাদের আশীর্বাদ/দোয়া চাই।’ এতে তারা সরাসরি টাকা দেওয়ার চাপ অনুভব করবে না, কিন্তু তারা মানসিকভাবে আপনাদের পাশে থাকবে। এমন একটি কাজ বেছে নিন, যা আপনারা দুই জনই উপভোগ করেন এবং যা আপনাদের স্বাস্থ্যের ওপর চাপ ফেলবে না। ছোট করে শুরু করুন ও লজ্জা বা সংকোচ ঝেড়ে ফেলুন। আপনাদের জীবনের অভিজ্ঞতাই আপনাদের সবচেয়ে বড় পুঁজি।