দীর্ঘ তিন যুগ পর হচ্ছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন। সোমবার (১৩ অক্টোবর) এই নির্বাচনের প্রচারণার শেষ দিন। তাই শেষ মুহূর্তে ভোটারদের মন জয় করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন প্রার্থীরা। ক্যাম্পাসের প্রতিটি ঝুপড়ি থেকে শুরু করে লাইব্রেরি, হল এলাকা, শাটল ট্রেনের বগি— সবখানেই বিরাজ করছে নির্বাচনি আমেজ। লিফলেট আর ফটোকার্ডের ছড়াছড়িতে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় যেন পরিণত হয়েছে এক বিশাল নির্বাচনি জনপদে।
শেষ মুহূর্তের দৌড়ে প্রার্থীরা
প্রচারণার শেষ দিনে প্রার্থীরা বেছে নিয়েছেন ভিন্ন কৌশল। ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং ছোট ছোট গ্রুপ আলোচনার ওপর জোর দিয়েছেন তারা। ভিপি ও জিএস পদপ্রার্থীরা ক্যাম্পাসের বিভিন্ন পয়েন্টে দাঁড়িয়ে সরাসরি ভোটারদের সঙ্গে কথা বলছেন, নিজেদের ইশতেহার তুলে ধরছেন এবং প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
দেখা গেছে, সকাল থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ, কলা ও মানববিদ্যা অনুষদ এবং সমাজবিজ্ঞান অনুষদ এলাকায় ছিল প্রার্থীদের সরব উপস্থিতি। ছাত্রদলের একটি প্যানেলকে দেখা গেছে শিক্ষার্থীদের আবাসন সমস্যা এবং গণরুম বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট চাইতে।
অন্যদিকে, ‘সাধারণ ছাত্রসমাজ ঐক্যজোটের’ প্রার্থীরা জোর দিয়েছেন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিকাশ ও শিক্ষার মানোন্নয়নের ওপর। স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও নিজ নিজ অবস্থান থেকে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবি তুলে ধরছেন।
প্রচারে সরগরম শাটলের বগিগুলো
এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এখন উৎসবের আবহ পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে। এদিকে উৎসবের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম শাটল ট্রেন। দৈনিক প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী শহর থেকে ক্যাম্পাসে যাতায়াতের জন্য এই শাটল ট্রেনের ওপর নির্ভরশীল। তাই ভোটারদের একটা বিরাট অংশের কাছে পৌঁছানোর জন্য, ছাত্র সংগঠন সমর্থিত প্যানেলগুলোর পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও শাটলকে তাদের প্রচারণার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
সরজমিনে দেখা গেছে, প্রতিদিনের মতো শেষ দিনেও প্রার্থীরা শাটলের প্রতিটা বগিতে বগিতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন আর করমর্দন করছেন, ভোট চাইছেন, আর দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। শিক্ষার্থীদের ভিড় ঠেলে এগিয়ে যাওয়া প্রার্থীরা তুলে ধরছেন তাদের প্যানেলের নির্বাচনি ইশতেহার। কেউ গান গেয়ে, কেউ বা ব্যতিক্রমী সাজে প্রচারণায় আনছেন নতুনত্ব। এ ছাড়া শাটল ট্রেনে শুধু প্রচারণাই নয়, শিক্ষার্থীদের মধ্যে চলছে নির্বাচনি আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক। কোন প্রার্থীর প্রতি কার সমর্থন, কেন সমর্থন, এসব নিয়েই মুখর হয়ে উঠছে প্রতিটি কামরা।
কেমন প্রতিনিধি চান ভোটাররা
দীর্ঘদিন পর ভোট হওয়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীরাও বেশ উচ্ছ্বসিত। অনেক ভোটারের মতে, এবার তারা এমন নেতৃত্ব চান, যারা দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে শিক্ষার্থীদের স্বার্থে কাজ করবেন।
ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী সুমাইয়া জানান, আমরা এমন একটি চাকসু চাই যা আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং পড়াশোনার পরিবেশ উন্নত করবে। প্রার্থীরা অনেক প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, এখন দেখার পালা কে কতটা রক্ষা করতে পারে।
রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সাদিকুল ইসলাম বলেন, আমরা এমন প্রার্থীই আশা করি যারা হবে সৎ, কর্মঠ, শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানে নিবেদিতপ্রাণ এবং ছাত্র সংসদের মাধ্যমে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে প্রস্তুত- আমরা এমন একজনকে আশা করি যিনি কেবল প্রতিশ্রুতি দিতেই পটু নন, বরং যিনি সেই প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা তৈরি ও কার্যকর করতে সক্ষম।
একই বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী বাঁধন মহন্ত বলেন, আমি এমন একজন প্রার্থী চাই, যিনি আমাদের লাইব্রেরি বা ল্যাবগুলোতে অনেক সময় প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বা আধুনিক বইয়ের অভাব দেখা যায়। আমরা চাই, চাকসু নেতারা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাতে বাজেট বাড়াতে এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা পদ্ধতি প্রচলনে সহায়তা করবে। এ ছাড়া একজন ছাত্রনেতা শুধুমাত্র মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নেবেন না, বরং একাডেমিক উন্নতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবেন।
jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68ece76c2ff3a" ) );
নির্বাচন বিষয়ে যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী জনি হোসাইন বলেন, আবাসন সংকট আমাদের সবচেয়ে বড় ভোগান্তির জায়গা। মেধা তালিকায় চান্স পাওয়ার পরও অনেক ছাত্রকে হলে থাকতে না পেরে বাইরে থাকতে হয়। এতে খরচ বাড়ে, পড়াশোনায় মন দেওয়া কঠিন হয়। আমাদের প্রত্যাশা, চাকসু নেতারা নতুন ছাত্র হল নির্মাণের এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আসন বণ্টনের জন্য কাজ করবেন। আমরা চাই, হলগুলো যেন সব শিক্ষার্থীর জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়। এ ছাড়া ডাইনিংয়ের খাবারের মান বাড়ানোর বিষয়েও তারা কঠোর পদক্ষেপ নেবেন—এই আশা রাখি।
চাকসু নির্বাচনে নারী ভোটারদের প্রত্যাশা
এদিকে, নারী শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস ও শাটল ট্রেনের নিরাপত্তাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন। তারা চান, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যেন নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ক্যাম্পাস এবং শাটল ট্রেনের নিরাপত্তা জোরদার করতে জরুরি ব্যবস্থা নেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের অহনা হালদার বলেন, আমি চাচ্ছি যে নেতৃত্বে এমন প্রতিনিধি আসুক, যিনি ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করতে পারে। ক্যাম্পাসে যে মারামারি, সহিংসতা যেসব সমস্যা রয়েছে তা বন্ধ করতে পারে এবং ক্যাম্পাসকে নিরাপদ করতে পারবে। এ ছাড়া নারীদের সুরক্ষা বা নিরাপত্তা দিতে পারবে এবং শাটল ট্রেনের নিরাপত্তা জোরদার করতে পারবে এমন প্রার্থীই আমরা চাই। আর যেটা করা সম্ভব নয় এমন ইশতেহার না দিয়ে, যেটা করা সম্ভব বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নতি হয় এমন ইশতেহার চাই।
যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী কাজী ফারজিদা ইসলাম বলেন, মেয়েদের আবাসন সমস্যা ও যাতায়াত সমস্যা এমন অনেক ধরনের সমস্যার মোকাবিলা করতে হয়- আমি একজন ভোটার হিসেবে প্রত্যাশা থাকবে যে, নারী শিক্ষার্থীদের প্রতিটি আবাসিক হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তুকিতে স্যানিটারি প্যাড, ভেন্ডিং মেশিন স্থাপন করতে পারবে। এ ছাড়া ফ্যাকাল্টি ও লাইব্রেরিসহ গুরুত্বপূর্ণ সব স্থানে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য চাইল্ডকেয়ার সুবিধা ও ব্রেস্টফিডিং কর্নার সংবলিত কমনরুম নিশ্চিত করতে পারবে। মসজিদগুলোতে নারী শিক্ষার্থীদের নামাজ আদায়ের জন্য আলাদা জায়গার ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
দর্শন বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী হালিমা আক্তার মিরা বলেন, যে প্রার্থী যোগ্য ও শিক্ষার্থীবান্ধব- এমন নেতৃত্বে চাই। এ ছাড়া আমরা কোনও প্যানেল না, যে যোগ্য তাকেই ভোট দেবো। আশা করছি, যে প্রার্থী শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কথা বলবে, যেমন- মেয়েদের নিরাপত্তা, আবাসন সংকট নিরসন, পরিবহন সংকট নিরসন ও খাবারের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ- অর্থাৎ যে সমস্যাগুলো নিয়ে আমরা ভুগছি সেগুলো সমাধান করবে- এমন প্রতিনিধি চাই।
প্রশাসনের প্রস্তুতি
নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। নির্বাচনের সহকারী প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক ড. মনোয়ারা বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, প্রচারণার সময়সীমা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যাতে সব ধরনের মাইকিং, পোস্টার লাগানো বা অন্যকোনও প্রচার বন্ধ হয়ে যায়, সেদিকে প্রশাসন কঠোর নজর রাখবে। বুধবার অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচন নির্বিঘ্ন করতে সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, আগামী ১৫ অক্টোবর চাকসু, হল সংসদ ও হোস্টেল সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হবে। গত ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে ভোটের প্রচারণা শুরু হয়েছিল।
নির্বাচনে প্রার্থী রয়েছেন ৯০৮ জন। এর মধ্যে চাকসুর ২৬টি পদের বিপরীতে ৪১৫ জন, হল সংসদে ৪৭৩ জন এবং হোস্টেল সংসদে ২০ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নির্বাচনে ভোটার রয়েছেন ২৭ হাজার ৫২১ জন। এর মধ্যে ছাত্র ১৬ হাজার ৮৪ ও ছাত্রী ১১ হাজার ৩২৯ জন। সবশেষ ১৯৯০ সালে নির্বাচন হয়েছিল।