চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনের জন্য ইশতেহার ঘোষণা করেছে ‘অহিংস শিক্ষার্থী ঐক্য’ প্যানেল। এ সময় তারা ১৭ দফা ইশতেহার দেয়। বৃহস্পতিবার (৯ অক্টোবর) বিকাল সাড়ে ৩টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিজীবী চত্বরে সংবাদ সম্মেলনে ইশতেহার ঘোষণা করেন প্যানেলের জিএস পদপ্রার্থী মুহাম্মদ ইয়াছিন উদ্দীন সাকিব। সম্মেলনে ভিপি প্রার্থীসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন। চাকসু নির্বাচনে জিতলে শিক্ষার্থীদের কাছে প্রত্যেক প্রতিনিধির জবাবদিহি নিশ্চিত করবে বলে জানিয়েছে প্যানেলটি।
ইশতেহারগুলো হলো- ১) চাকসু নির্বাচন আমাদের অধিকার। দীর্ঘ আন্দোলনের পর পাওয়া এই নির্বাচনকে নিয়মিত করতে কার্যকরে একাডেমিক ক্যালেন্ডারে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। যে জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকার পেয়েছি, সে আন্দোলনে চবির শিক্ষার্থী ও আমাদেরই সহপাঠী হৃদয় চন্দ্র তরুয়া ও ফরহাদ হোসেনসহ প্রতিটি নির্মম হত্যাকাণ্ড ও অপরাধের বিচার আদায়সহ ফ্যাসিবাদবিরোধী জুলাই-চেতনা সর্বদা সমুন্নত রাখা হবে। ২) কোনও শিক্ষার্থীকে পাহাড়-সমতল, দলমত, নারী-পুরুষ, ধর্মবর্ণ শ্রেণিতে বিভক্ত না করে বরং শিক্ষার্থী পরিচয়ে সবার সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করা হবে।
৩) ক্যাম্পাসে দলীয় আধিপত্য বিস্তার, দখলদারত্ব, সংঘাতমূলক কর্মকাণ্ড, অস্ত্র ও মাদক নিষিদ্ধকরণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সব প্রকার যৌক্তিক দাবি আদায়ে শিক্ষার্থী ও প্রশাসনসহ সব পক্ষের সমন্বয়ে ইনসাফপূর্ণ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষাবান্ধব অহিংস ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কোনও বিশেষ গোষ্ঠীর প্রতি পক্ষপাতমূলক দৃষ্টি না রেখে প্রশাসন যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কল্যাণে কাজ করে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
8) মানসম্মত শিক্ষা ও ইনসাফপূর্ণ ফলাফল নিশ্চিত করতে শিক্ষক মূল্যায়ন, কোর্স কারিকুলাম নিয়মিত পর্যালোচনা, কার্যকর উপায়ে সহজে ফলাফল চ্যালেঞ্জের ব্যবস্থাসহ প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা। ৫. শাটলের শিডিউল বৃদ্ধি ও ডেমো ট্রেন পুনঃচালুকরণ, পর্যাপ্ত লাইট ও ফ্যানের ব্যবস্থা, ওয়াইফাই চালু, শাটলযোগে যাতায়াতকারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, চবি রেলওয়ে স্টেশনে কন্ট্রোল রুম স্থাপন, শহর ও পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহে বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ন্ত্রিত শিক্ষার্থী বাস চালু, ক্যাম্পাসের ভেতর চক্রাকার বাস বৃদ্ধি, রাত ১০টা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য বাস সার্ভিস নিশ্চিত করতে কাজ করা হবে। বিআরটিসি ও রেলওয়েতে অর্ধেক ভাড়ায় যাতায়াত ও সকল ট্যুর স্পটে অর্ধেক ছাড়ে প্রবেশের ব্যবস্থা করা হবে।
৬) বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেক শিক্ষার্থীর আবাসন নিশ্চিত করতে নতুন হল নির্মাণ এবং এর পূর্ব পর্যন্ত আবাসন ভাতা প্রদান করতে প্রশাসনকে বাধ্য করা হবে। ৭) খাবারের মানে রেটিং সিস্টেম চালু, প্রতি মাসে অন্তত একবার মান ও দাম যাচাইকরণসহ প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করে ক্যাম্পাস এলাকায় নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য নিশ্চিত করা এবং প্লাস্টিক ও মাদকমুক্ত সবুজ, পরিষ্কার, সর্বত্র সুপেয় পানিসমৃদ্ধ প্রাণীবান্ধব ও দৃষ্টিনন্দন ক্যাম্পাস বিনির্মাণ করা হবে।
৮) নারীদের জন্য সার্বিক নিরাপত্তা, প্রতি বিভাগে পৃথক কমন রুম ও প্রার্থনা কক্ষ, যৌন হয়রানি ও সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণপূর্বক তা প্রতিরোধে শক্তিশালী ও কার্যকর অভিযোগ সেল এবং প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা, মাতৃত্বকালীন ছুটি, গর্ভধারিণী শিক্ষার্থীদের জন্য আবেদনের প্রেক্ষিতে নিচতলায় পরীক্ষা গ্রহণ, নারী হলগুলোতে সমৃদ্ধ ইনডোর গেমস, গার্ডিয়ান লাউঞ্জ, আত্মরক্ষা প্রশিক্ষণ প্রদান কেন্দ্র, ইত্যাদির উদ্যোগ নেওয়া হবে। ৯) সার্টিফিকেট ও অন্যান্য কাগজপত্র বিনা ফিতে সংশোধন, ভর্তি ও টাকা জমাসহ সকল প্রশাসনিক কার্যক্রম ডিজিটালাইজেশন, লাল ফিতার দৌরাত্ম্য নিশ্চিহ্নকরণ, অভিযোগ গ্রহণ ও প্রতিকার এবং প্রশাসনিক বিভিন্ন কাগজপত্র উত্তোলনসহ সকল আবেদনের হালনাগাদ তথ্য অনলাইন ড্যাশবোর্ডে প্রকাশের ব্যবস্থা করা হবে। ১০) চাকসু ভবনে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপনসহ প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে একে আধুনিকায়ন করা ও বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে সর্বদা প্রাণবন্ত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
১১) ক্যাম্পাস এলাকার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নিরাপত্তা বুথ ও নিরবিচ্ছিন্ন ওয়াইফাই জোন স্থাপন, ২৪ ঘণ্টা সচল হটলাইনসহ প্রয়োজনীয় উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ক্যাম্পাসের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। ১২) মেধাভিত্তিক বৃত্তির সংখ্যা ও অর্থ বৃদ্ধি, আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানসহ মানবাধিকার রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ১৩) অ্যাম্বুলেন্স সেবা বৃদ্ধি ও দ্রুতকরণ, বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে ২৪ ঘণ্টা সার্বিক সেবা ও গুরুত্বপূর্ণ সকল ঔষধ বিনামূল্যে সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধি এবং দেশের অন্যান্য হাসপাতালগুলোতে শিক্ষার্থীদের জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিতে ন্যূনতম ৫০% ছাড়ে চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা করা হবে।
১৪) কেন্দ্রীয় খেলার মাঠের পাশাপাশি সবগুলো হলের মাঠ সংস্কারপূর্বক নিয়মিত খেলাধুলার আয়োজন, জাতীয় দিবসসমূহসহ সব জাতি-গোষ্ঠীর বিভিন্ন দিবসসমূহে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রতিযোগিতা, সাহিত্য আড্ডা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা ইত্যাদি উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে দেশের সব ঐতিহ্য ধরে রাখা হবে। সব ক্ষেত্রে দক্ষ শিক্ষার্থীদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। ১৫) হতাশা, দুশ্চিন্তা ও মানসিক অস্থিরতা দূরীকরণে অভিজ্ঞ সাইকোলজিস্টের মাধ্যমে নিয়মিত কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে। ১৬) অহিংস শিক্ষার্থী ঐক্য প্যানেলকে নির্বাচিত করলে মাসিক প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে প্রত্যেক প্রতিনিধির জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে।