চীনে ৩০ খ্রিষ্টান গ্রেফতার, নতুন দমন অভিযানের শঙ্কা

চীনে ৩০ খ্রিষ্টান গ্রেফতার, নতুন দমন অভিযানের শঙ্কা

চীনে অন্তত ৩০ জন খ্রিষ্টানকে গ্রেফতার করেছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এটি গত কয়েক দশকের মধ্যে খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় ধরপাকড় অভিযান এবং আশঙ্কা করা হচ্ছে, এর মধ্য দিয়ে আরও বড় ধরনের দমন অভিযান শুরু হতে পারে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ খবর জানিয়েছে।

শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রে থাকা গ্রেস জিন ড্রেক্সেল তার বাবা, বিশিষ্ট পাদ্রি জিন মিংরি থেকে একটি বার্তা পান। বার্তায় তাকে বলা হয়, দক্ষিণাঞ্চলীয় শেনঝেনে এক পাদ্রি নিখোঁজ হয়েছেন, তার জন্য প্রার্থনা করতে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই মা ফোন করে জানান, বাবার সঙ্গেও যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পরিবারটি জানতে পারে, জিন মিংরিও গ্রেফতার হয়েছেন।

পাদ্রি জিন মিংরি বেইজিংভিত্তিক জায়ন চার্চের প্রতিষ্ঠাতা। এটি চীনের সবচেয়ে প্রভাবশালী আন্ডারগ্রাউন্ড চার্চ নেটওয়ার্কগুলোর একটি। গত সপ্তাহান্তে দেশটির অন্তত বেইজিং, সাংহাইসহ ১০টি শহর একযোগে অভিযান চালিয়ে জায়ন চার্চের সঙ্গে যুক্ত ৩০ জনকে আটক করা হয়।

বিবিসি জিন মিংরির নামে বেইহাই জননিরাপত্তা ব্যুরোর জারি করা একটি আটক নোটিশ পেয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, তিনি অবৈধ তথ্য নেটওয়ার্ক ব্যবহারের অভিযোগে বেইহাই নম্বর টু কারাগারে আটক আছেন।

জিন মিংরি ছাড়াও বিভিন্ন শহর থেকে আরও পাদ্রি, চার্চ নেতৃবৃন্দ ও সদস্যদের গ্রেফতার করা হয়েছে। কিছুজন মুক্তি পেলেও বেশির ভাগ এখনও আটক রয়েছেন বলে জানা গেছে।

চীনের খ্রিষ্টান অধিকার সংগঠন লুক অ্যালায়েন্সের প্রতিষ্ঠাতা কোরি জ্যাকসন বলেন, এ ধরনের সমন্বিত অভিযান আগে দেখা যায়নি। আমরা মনে করি, এটি কেবল শুরু। এর পর আরও ব্যাপক দমন অভিযান আসছে।

আরেকটি সংগঠন ওপেন ডোর্সের মুখপাত্র বলেন, জায়ন চার্চ ছিল সুপরিচিত ও সক্রিয় একটি গির্জা। সম্ভবত তাদের সংগঠনের শক্তিই কর্তৃপক্ষকে আতঙ্কিত করেছে। সরকার এখন আরও চার্চ সদস্যদের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অপরাধ বা প্রতারণার অভিযোগ তুলে ভয় দেখানোর কৌশল নিতে পারে।

জায়ন চার্চের মার্কিনভিত্তিক মুখপাত্র পাদ্রি শন লং বলেন, জায়নকে শিকড় থেকে উপড়ে ফেলতে এটি একটি পরিকল্পিত অভিযান। একটি চীনা প্রবাদে বলা হয়েছে, মুরগিকে মেরে বানরকে ভয় দেখানো। জায়ন সেই মুরগি, সবচেয়ে প্রভাবশালী। সরকারের উদ্দেশ্য অন্য চার্চগুলোকে ভয় দেখানো।

চীনের ব্রিটিশ দূতাবাস বলেছে, চীনের নাগরিকরা আইনের আওতায় ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করেন। তবে সব ধর্মীয় কার্যক্রম অবশ্যই রাষ্ট্রের আইন ও বিধান মেনে চলতে হবে।

এ সপ্তাহের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জায়ন চার্চের সদস্যদের গ্রেফতারের নিন্দা জানানোর পর বেইজিং পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছিল, চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ধর্মীয় ইস্যুর অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ আমরা কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করি।

চীনে রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুমোদিত দুটি খ্রিষ্টান সংগঠন প্রোটেস্ট্যান্ট থ্রি সেলফ প্যাট্রিয়টিক মুভমেন্ট ও ক্যাথলিক প্যাট্রিয়টিক অ্যাসোসিয়েশন-এর সদস্য সংখ্যা সরকারি হিসাবে প্রায় ৪৪ মিলিয়ন। তবে গবেষকদের মতে, রাষ্ট্র অনুমোদনবিহীন ‘হাউজ চার্চ’ বা আন্ডারগ্রাউন্ড চার্চে অংশগ্রহণকারী খ্রিষ্টানদের সংখ্যা কয়েক কোটি।

২০১৮ সালে জিনপিং সরকারের সংশোধিত ধর্মীয় আইন আন্ডারগ্রাউন্ড চার্চগুলোর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। অনেক চার্চ বন্ধ করা হয়, অনেকের ভবন ভেঙে ফেলা হয়, ক্রস চিহ্ন সরিয়ে দেওয়া হয় এবং ধর্মীয় সামগ্রী ও অনলাইন উপাসনা কঠোরভাবে সীমিত করা হয়।

সম্প্রতি চীন ধর্মীয় নেতাদের জন্য নতুন অনলাইন আচরণবিধি জারি করেছে। এর অধীনে কেবল লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানই অনলাইন প্রচার করতে পারবে। বিশ্লেষকদের মতে, এর লক্ষ্য আন্ডারগ্রাউন্ড চার্চগুলোর অনলাইন কার্যক্রম দমন করা।

১৯৬৯ সালে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় জন্ম নেওয়া জিন মিংরি ১৯৮৯ সালের তিয়ানআনমেন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পর খ্রিষ্টান ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন। ২০০২ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যান ধর্মতত্ত্ব পড়তে এবং ২০০৭ সালে দেশে ফিরে জায়ন চার্চ প্রতিষ্ঠা করেন।

প্রথমে ছোট একটি গৃহগির্জা হিসেবে শুরু হলেও এটি পরবর্তী এক দশকে বেইজিং ও অন্যান্য শহরে ১০ হাজারের বেশি অনুসারী নিয়ে একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্কে পরিণত হয়। ২০১৮ সালে কর্তৃপক্ষ সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর নির্দেশ দিলে তারা অস্বীকৃতি জানায়, এরপরই গির্জাটি বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং জিন মিংরির ওপর দেশত্যাগ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

বর্তমানে তার পরিবার যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছে। শন লং বলেন, নিপীড়ন কখনোই গির্জাকে ধ্বংস করতে পারে না। ইতিহাস প্রমাণ করেছে—যেখানেই দমন নেমে আসে, সেখানেই নতুন করে জাগরণ শুরু হয়।

 

Comments

0 total

Be the first to comment.

More from this User

View all posts by admin