একসময় পশ্চিমা ন্যারেটিভে যারা ছিল স্রেফ ‘উন্নয়নশীল’, তারাই আজ সগর্বে নিজেদের পরিচয় দিচ্ছে গ্লোবাল সাউথের অংশ হিসেবে। আর এ দেশগুলোর অবকাঠামো ও শিল্পায়নকে এগিয়ে নিতে চীনের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ এনে দিচ্ছে বাস্তব সুফল। বিশ্লেষকরা বলছেন, পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে চীনের বিরুদ্ধে যে ‘ঋণের ফাঁদ’ তত্ত্বের প্রচার হয়, ওটা মূলত একট ভ্রান্ত ধারণা এবং ভূরাজনৈতিক স্বার্থেরই বহিঃপ্রকাশ। অন্তত পরিসংখ্যানে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়।
ডেট জাস্টিস নামের যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিম্ন আয়ের দেশগুলো তাদের ঋণ পরিশোধে চীনা প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বহুগুণ বেশি অর্থ ব্যয় করছে বাণিজ্যিক ঋণদাতাদের কাছে। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এসব দেশের বহিঋণ পরিশোধের মাত্র ১৩ শতাংশ যাবে চীনা ঋণদাতাদের কাছে। ৩৯ শতাংশ পাবে বাণিজ্যিক ঋণদাতারা। ৩৪ শতাংশ যাবে বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠান এবং ১৪ শতাংশ অন্যান্য সরকার।
ডেট জাস্টিসের নীতি নির্ধারক টিম জোন্স বলেন, ‘উচ্চসুদে ঋণ দেওয়া বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোই নিম্ন আয়ের দেশগুলোর কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি পরিশোধিত ঋণ পাচ্ছে। ঋণ পরিশোধের চাপ বেশি হলে, সব ঋণদাতাকেই তাদের সুদের হারের অনুপাতে ঋণ মওকুফে অংশ নিতে হবে।’
এরপরও পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে চীনকেই বড় ঋণদাতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যা বিশেষজ্ঞদের মতে বিভ্রান্তিকর।
সুইডেনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনস্টিটিউটের ভাইস-চেয়ারম্যান হুসেইন আসকারি বলেন, ‘দরিদ্র দেশগুলো বহু বছর ধরে সহায়তা কর্মসূচি চালালেও দারিদ্র্য কমেনি। তাই অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য স্বল্পসুদে ও দীর্ঘমেয়াদি চীনা ঋণ তাদের প্রকৃত চাহিদা পূরণ করছে।’
চীনের ঋণ ইতোমধ্যে অনেক দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে দৃশ্যমান প্রভাব ফেলছে। গত জুলাইয়ে চায়না ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক কাজাখস্তানের রাষ্ট্রীয় রেলওয়ে কোম্পানিকে ১৮ কোটি ইউয়ান ঋণ দেয়, যা দিয়ে দেশটি ২০০টি লোকোমোটিভ কিনছে চীনের সিআরআরসি করপোরেশন থেকে। এর মধ্যে প্রথম ব্যাচ ইতোমধ্যে চালু হয়েছে, যা কাজাখস্তানের রেল পরিবহন সক্ষমতা বাড়িয়েছে এবং ট্রান্স-কাস্পিয়ান আন্তর্জাতিক পরিবহন করিডর গড়ে তুলতে সহায়তা করছে।
চায়না-আফ্রিকা ইনস্টিটিউটের ডিন ইয়ে হাইলিন বলেছেন, ‘চীনা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সবসময় অংশীদার দেশের সার্বভৌমত্ব ও উন্নয়ন লক্ষ্যকে সম্মান করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চীন কখনোই রাজনৈতিক শর্ত জুড়ে দেয়নি। ফলে পশ্চিমা ঋণদাতাদের উচ্চসুদ নির্ভর প্রভাবও কমে গেছে।’
এ ছাড়া চীন ইতোমধ্যে আফ্রিকার সবচেয়ে দরিদ্র দেশগুলোর জন্য সুদমুক্ত সরকারি ঋণ মওকুফের ঘোষণা দিয়েছে, যা ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ পরিশোধ করার কথা ছিল।
হাইলিনের মতে, ‘চীনের বিরুদ্ধে প্রচারিত অভিযোগগুলো মূলত গ্লোবাল সাউথে তাদের বাড়তে থাকা আস্থা ও সহযোগিতামূলক অবস্থানকে দুর্বল করার দুর্বল চেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়। বাস্তবে এই সহযোগিতাই উন্নয়নশীল দেশগুলোকে নতুন সম্ভাবনার পথে এগিয়ে নিচ্ছে।’