চোরের গলা কেন বড় হয়?

চোরের গলা কেন বড় হয়?

আমরা একটা কাল্পনিক গল্প ফাঁদবো। মানে আমি আর গল্পের চরিত্র হাসান মিলে। তবে কাকতালীয়ভাবে বাস্তবের সাথে কোনো চরিত্র মিলে গেলে তার দায় আমাদের কারোই না। শুরুতেই গল্পের প্রধান চরিত্র হাসানের বিষয়ে কিছু বিষয় পরিষ্কার করে নেওয়া যাক। গ্রামের স্নিগ্ধ প্রকৃতির গভীর মমতায় বেড়ে ওঠা হাসানের মধ্যে একটা সেকেলে ভাব বিদ্যমান। জীবনের অর্ধেকটা সময় পার করে এসেও তার স্বভাবে ভদ্রলোকদের ভণ্ডামিটা জায়গা করে নিতে পারেনি। সামনাসামনি সাধুকে সাধু এবং চোরকে চোর বলার সৎসাহস তার আছে। তার জন্য যে তাকে বিপদে পড়তে হয়নি ব্যাপারটা এমন না। কিন্তু এতেও তার স্বভাবের কোন পরিবর্তন হয়নি।

এই স্বভাবের সাথে আপস করতে না পারার কারণেই হয়তোবা তাকে প্রবাসে থিতু হতে হয়েছে। কথায় আছে ‘নগরে আগুন লাগলে দেবালয় এড়ায় না’। তাই প্রবাসেও দেশের সাধু মানুষের পাশাপাশি ধানের চিটার মতো চোর এসে হাজির হয়েছে। হাসানের সাথে সেইসব সাধু এবং চোরেদের সম্পর্ক এবং সংঘাতই এই গল্পের বিষয়বস্তু। অনেকেই হয়তোবা এই গল্পের সাথে বাংলাদেশের সামগ্রিক আর্থসামাজিক অবস্থার তুলনা খুঁজে পেতে পারেন। তার দায়ও আমরা নিচ্ছি না। আমরা শুধু গল্পটা বলতে চাই।

হাসানের যেহেতু ঠোঁটকাটা স্বভাব তাই প্রবাসের হাজারো দল লক্ষাধিক উপদলের কোনোটাতেই তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। সে প্রবাসে দেশের ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চার একটা প্রতিষ্ঠানের সাথেই শুধু যুক্ত। মূল কারণ হলো প্রবাসের দ্বিতীয় প্রজন্মের মধ্যে দেশের সংস্কৃতির চর্চাটা ধরে রাখার চেষ্টা। আর এর সাথে জড়িত মানুষগুলোর মানসিকতার সাথে নিজের মানসিকতার কিঞ্চিৎ মিল খুঁজে পাওয়া।

সবই ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু একদিন দেশ থেকে ব্যবসায়িক ভিসা নিয়ে আসা একজন যখন সেখানে যুক্ত হলো তখন হাসানের নিজের সাথে একটা যুদ্ধ শুরু হলো। ভদ্রতার মুখোশ পরে সেই লোককে কিছু বলতে ইচ্ছে করছিল না। কিন্তু সে যেহেতু সারাজীবন দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল তাই কণ্ঠরোধ করে রাখাও সম্ভব হলো না।

একদিন আলোচনাবশতঃ সেই লোককে সরাসরি চোর বলেই বসলো। তখন সেই লোকের আসল চেহারা বেরিয়ে আসলো। বললো, আপনি আমাকে চেনেন, জানেন আমি কি করতে পারি? বাংলাদেশে এই ধরনের কথা শোনা যায় রাজনীতিকদের কাছ থেকে। এখানে আমরা একটু দেশের থেকে ঘুরে আসি। দেশের আড্ডার সবচেয়ে প্রিয় বিষয় হচ্ছে দেশের আকণ্ঠ নিমজ্জিত দুর্নীতি। হাসান তার অভিজ্ঞতায় দেখেছে দেশকে যদি একটি শরীরের সাথে তুলনা করা যায় তাহলে দুর্নীতিটা সেই শরীরে ক্যান্সারের মতো বাসা বেঁধেছে।

আর যেটা হয় ক্যান্সারের কোষ যেমন দিনে দিনে বংশবৃদ্ধি করতে থাকে ঠিক তেমনি দুর্নীতিও ডালপালা ছড়াতে ছড়াতে এখন পুরো সমাজব্যবস্থাকেই গ্রাস করে নিয়েছে। দেশ ছাড়ার আগে তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সে লিখেছিল, একটা শরীরের সমস্ত দূষিত রক্ত বের করে দিয়ে যদি নতুন করে বিশুদ্ধ রক্ত প্রবেশ করানো যেত তাহলে হয়তোবা এই অসুখটা থেকে মুক্তি পাওয়া যেত কিন্তু সেটা করতে গেলে শরীরটা আর জীবিত থাকবে না।

যাইহোক আমরা গল্পে ফিরে আসি। সেই লোক বলল, জানেন আমি কি ভিসায় এদেশে এসেছি। এই ভিসা আপনার বাপও কোনো দিন পাবে না। হাসান তার সহজ বুদ্ধিতে একটা হিসাব কষলো। ব্যবসায়িক ভিসার জন্য অস্ট্রেলিয়ান ডলারে পাঁচ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে হয়। পাঁচ মিলিয়ন ডলারের বাংলাদেশি টাকায় মূল্যমান প্রায় পঞ্চাশ কোটি। তার মানে হিসাব করলে দাঁড়ায় এই লোক তার ভিসার জন্য দেশ থেকে ন্যূনতম পঞ্চাশ কোটি টাকা পাচার করেছে।

হাসান মনের প্রশ্ন তখন আর লুকিয়ে রাখতে পারলো না। জিজ্ঞেস করলো, ভাই আপনার এই এত টাকার উৎস কি? উত্তরে বললো, আমার বাপ দাদা জমিদার ছিলেন? তখন সে জিজ্ঞেস করলো আপনি কোন জমিদারের বংশধর যদি একটু বলতেন। তখন আর সেই লোক কোন সুদুত্তর দিতে পারেনি।

এরপর সেই লোক বলল, আসলে আমি বেতন জমিয়ে সেই টাকা দিয়ে ভিসা করিয়েছি। তখন হাসান বললো, বাংলাদেশে এমন কোনো চাকরির খবর তো আমার জানা নেই ভাই যেখানে বছর বিশ ত্রিশেক চাকরি করলে এতো টাকা জমানো যায়। এরপর সেই লোক বললো, না মানে আমাদের পারিবারিক ব্যবসা আছে সেখান থেকে টাকা জমিয়ে। টাকার উৎস যাইহোক টাকাটা তো বাংলাদেশের। হাসান সহজভাবে সেটাই হিসেব করলো আর মনেকরার চেষ্টা করলো নিজের ভিসাতে কত টাকা লেগেছিল। তার যতদূর মনেপড়ে পুরো পরিবারের ভিসা করাতে তার সর্বসাকুল্যে তিন হাজার বিশ ডলার লেগেছিল।

এরপর থেকে হাসান সেই লোককে মোটামুটি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করলো। কিন্তু যেটা হয় একই প্রতিষ্ঠানে আনাগোনার কারণে সেটা সম্ভব হচ্ছিলো না। কখনও দেখা হলে হাসান সামান্য কুশল বিনিময়ে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেই যাচ্ছিলো।

কিন্তু হাসান অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো যাদের সাথে সে এতদিন ওঠাবসা করে এসেছে, যাদের সে মোটামুটি সৎ মানুষ হিসেবেই জেনে এসেছে সেই মানুষগুলো তাকে তোষণ করছে রীতিমতো। এটা হাসানকে খুবই অবাক এবং আহত করলো। তখন হাসান বুঝতে পারলো আসলে সবাই দুর্নীতি নিয়ে কথা বললেও কেউই দুর্নীতিবাজকে সামাজিকভাবে বয়কট করার পক্ষে না। বরং তার কাছ থেকে বিভিন্ন সুবিধা আদায়ের পক্ষে। কিন্তু হাসান বুঝে উঠতে পারছিলো না প্রবাসে তো সবাই স্বনির্ভর। তাহলে সেখানেও কেন এই দ্বিচারিতা। তখন একজন বলল, আসলে আমরা সহাবস্থানের পক্ষে। কোন ভেদাভেদ করার পক্ষে নই। এটা শুনে হাসান খুবই অবাক হলো।

আরেকজনকে দেখা গেলো দুনিয়ার সব অন্যায় অনাচার নিয়ে চায়ের কাপে ঝড় তুলতে। ট্রাম্প একজন চরম উন্মাদ। মোদী একজন ঘোর কট্টরপন্থি। কিন্তু বাংলদেশে জনগণের প্রতক্ষ্য ভোট ছাড়া অনির্বাচিতভাবে টানা শাসন চালিয়ে যাওয়া সরকার উদারপন্থি। আবার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে খিল্লি করতে ওস্তাদ আরেকজনকে দেখা গেলো সেই দুর্নিবাজের সাথে দুর্নিবার আড্ডায়। এগুলো হাসানের চোখে পুরোপুরি ভণ্ডামি বলে ধরা দিলো। এরপর হাসান সিদ্ধান্ত নিলো যে তাকে বাকি জীবন আসলে একঘরে হয়েই থাকতে হবে। কারণ সত্যি কথা বলার বিপদ অনেক। সেই দুর্নীতিবাজ দিনে দিনে তার ডালপালা ছড়িয়ে অতিকায় বটবৃক্ষের রূপ নিচ্ছে। সে অস্ট্রেলিয়া এসেই প্রথমে অস্ট্রেলিয়ার সব বাংলাদেশি রাজনীতিবিদদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলেছে, হয়তোবা আগে থেকেই ছিল। এখানে অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতে বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণের কিছু বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ার মূলধারার রাজনীতিতে বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবী রাখে। কিন্তু বাস্তবতা একটু ভিন্ন। একটু তলিয়ে দেখলেই দেখা যায় বাংলাদেশি কমিনিটিতে যে মানুষটার অবস্থান সবচেয়ে নড়বড়ে, যার কোন আর্থিক এবং সামাজিক ভিত্তি নেই, নির্দিষ্ট কোন কাজও সে করে না তারাই রাজনীতিতে যোগ দেয়। আর যেহেতু দিনেদিনে বাংলাদেশিদের সংখ্যা বেড়ে চলেছে তাই তারা দল থেকে মনোনয়ন পায় এবং নির্বাচিতও হয়ে যায়। মজার ব্যাপার হচ্ছে বাংলাদেশি কমিউনিটির লোকজন বিভিন্ন অন্যায্য আবদার নিয়ে এদের কাছে হাজির হয়। আর এমন ভাব করে যেন তাদের এসব সমাধান করে দেয়ার ক্ষমতা আছে। এটা ঠিক যেন বাংলাদেশের একটা খণ্ড প্রতিচ্ছবি।

যাইহোক কানাডার বেগম পাড়া নিজগুণেই বিখ্যাৎ। সেটা নিয়ে বহু গালগল্প প্রচলিত আছে। এমনকি তার উপর ভিত্তি করে নাটক নির্মাণ করা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়াতেও এমন বহু মানুষ ব্যবসায়িক ভিসায় এসেছে। পল্লী বিদ্যুতের কোটিপতি মিটার রিডার না কি সিডনির কোন শহরেই থাকে। হাসানের প্রাক্তন অফিস স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মেলবর্নের কোথাও থাকে। হাসানের ক্যাম্পাস জীবনের পরিচিত একজন সন্ত্রাসীও থাকে অস্ট্রেলিয়াতেই যার হাত ধরে তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাস একটা অন্য মাত্রা পেয়েছিল। এরা সবাই প্রবাসে এসে বহাল তবিয়তেই আছে।

হাসানকে যে বিষয়টা সবচেয়ে অবাক করে সেটা হলো এই সকল মানুষদের পরিচয় জানার পরও কেন প্রবাসীরা তাদের তোষণ করে। সামাজিকভাবে তাদের সাথে মেলামেশা করে তাদের কেন পূণর্বাসন করে। প্রবাসে সবাই মোটামুটি একটা শিক্ষা অর্জন করেই নিজ পায়ে দাঁড়ায় তাহলে কেন এইসব দুর্নীতিবাজ মানুষদের তোষণ করা। এটা কি শুধুমাত্র সহাবস্থানের দোহায় না কি এর বীজ আমাদের মনের আরও অনেক গভীরে সুপ্ত অবস্থায় আছে।

হাসান ভাবে সমস্যাটা আসলেই তারই। তাকে তো আর দুনিয়ার সকল সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়নি। আবার ভাবে আমি কেন আমার অবস্থান থেকে এগুলোকে প্রতিরোধ এবং বর্জন করবো না। তার সবচেয়ে খারাপ লাগে নিজেদেরকে উদারমনা, সংস্কৃতিমনা, আধুনিক বলে পরিচয় দেওয়া মধ্যবিত্তরাও যখন এইসব স্বপ্রমাণিত দুর্নীবাজদের তোষণ করে। হাসান তার ছোটবেলায় দেখেছে গ্রামে কোন চোর ধরা পড়লে সে সারাক্ষণই মাথা নিচু করে রাখে। শত আঘাতেও আহা উহু করে না। চুরিটা কিন্তু খুবই সামান্য ছিল। হয়তোবা কারো ঘরে পরিশ্রম করে সিঁধ কেটে সামান্য হাড়ি পাতিল চুরির মতলব ছিল। চুরিটা হয়তোবা সে পেটের দায়েই করতে গিয়েছিল তবুও তার চোখেমুখে সে কি ভীষণ লজ্জা। ছোটবেলায় হাসান এইসব চোরদের প্রতি এক ধরণের মমতা বোধ করতো।

এছাড়াও তাদের পাড়ায় একজন সরকারি অফিসের কেরানি ছিল যিনি অনেক টাকার মালিক হয়েছিলেন। তার সাথে একই মসজিদে নামাজ পোড়া হতো। সে দেখতো গ্রামের মানুষ সেই কেরানিকে ঠিক কিভাবে এড়িয়ে চলতো এবং সুযোগ পেলেই তাকে চোর আখ্যা দিতে ভুল করতো না। এটা সেই ব্যক্তিও জানতো এবং সবসময় একটু জড়োসড়ো হয়েই থাকতো।

সময় বদলের সাথে সাথে চোরদের সামাজিক অবস্থানও পরিবর্তিত হয়েছে। বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় দুর্নীতিবাজদের অনেক খবর প্রকাশিত হচ্ছে। তাদের দুর্নীতি হাজার, লক্ষ, কোটি ছাড়িয়ে হাজার হাজার কোটিতে রূপ নিয়েছে। এবং তারা সেই টাকা দেশে না রেখে বিভিন্ন দেশে পাচার করেছে। ইতোমধ্যেই কানাডার বেগম পাড়ার কথা খুবই প্রচলিত।

ইংল্যান্ডেও নিশ্চই এমন অনেক বেগম পাড়া তৈরি হয়েছে। আর এখন হচ্ছে অস্ট্রেলিয়াতে। এইসব মানুষেরা জানে টাকাই তাদের শক্তির উৎস হোক সেটা অন্যের হক মেরে দুর্নীতি করে আয় করা। আর এই টাকার কারণেই সমাজের সবার মুখও বন্ধ হয়ে আছে। তাই এইসব চোরেদের গলার স্বর এখন দেশ ছাড়িয়ে প্রবাসেও উচ্চকিত। হাসান জানে না এর থেকে আসলে কিভাবে মুক্তি মিলবে।

এমআরএম/জিকেএস

Comments

0 total

Be the first to comment.

More from this User

View all posts by admin