আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। তার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের বাজারেও। সর্বশেষ দামে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের ভরি পেরিয়েছে ২ লাখ ১৩ হাজার টাকা। তবু আশ্চর্যের বিষয়—পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী তাঁতিবাজারে স্বর্ণপট্টিতে ক্রেতার ভিড় কমেনি, বরং বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, উৎসব মৌসুম, বিয়ের সময় এবং বিনিয়োগের নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে স্বর্ণের প্রতি মানুষের আগ্রহের কারণেই এমন চিত্র।
নাম তাঁতিবাজার হলেও পুরান ঢাকার এই এলাকাটি বিখ্যাত স্বর্ণের দোকান, স্বর্ণকার ও কারিগরদের কর্মদক্ষতার জন্য। বলা হয়ে থাকে, দেশের সবচেয়ে বড় স্বর্ণের বাজার পুরান ঢাকার সুপ্রাচীন এই এলাকাটি।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) সর্বশেষ ঘোষণায় দেখা যায়, নতুন দামে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের প্রতি গ্রাম বিক্রি হবে ১৮ হাজার ৩২৩ টাকা। ফলে প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ১৩ হাজার ৭১৯ টাকা।
jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68f311c61c7cc" ) );
নতুন দামের অন্যান্য শ্রেণি: ২১ ক্যারেট স্বর্ণের প্রতি গ্রাম ১৭ হাজার ৪৯০ টাকা, ১৮ ক্যারেট স্বর্ণের প্রতি গ্রাম ১৪ হাজার ৯৯১ টাকা, সনাতন পদ্ধতির প্রতি গ্রাম স্বর্ণ ১২ হাজার ৪৭৬ টাকা।
তাঁতিবাজারে রবিন জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী উত্তম দাস জানান, ৪০-৪১ বছরে এভাবে দাম বাড়তে দেখেননি তিনি। প্রবীণ এই ব্যবসায়ী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘স্বর্ণের দাম যেন পাগলা ঘোড়া হয়ে গেছে। প্রতিদিন বাড়ছে। কোথায় থামবে বোঝা যাচ্ছে না।’
দাম বৃদ্ধির প্রভাব আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রভাব নাই। দাম বাড়লে আমাদের ক্রেতা বাড়ে। দাম বাড়াতে ২০ শতাংশ ক্রেতা বেড়েছে। যাদের হাতে নগদ টাকা আছে, তারা কিনে রাখছে। স্বর্ণ তো অ্যাসেট, দাম যতই বাড়ুক কমে না। মানুষ মনে করছেন আরও বাড়বে, তাই কিনে রাখছে।’
কথা হয় লিপি জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী বিদ্যাধর সরকারের সঙ্গে। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘স্বর্ণের দাম তো আমাদের হাতে না। আন্তর্জাতিক ব্যাপার, সারা বিশ্বে দাম বাড়ছে। দাম যতই বাড়ুক ব্যবসায় কোনও প্রভাব পড়বে না আমাদের। বরং কাস্টমার বাড়বে, এটাই নিয়ম। তবে এবার এক ধাক্কায় যতটা বেড়েছে তাতে ঢাকার বাইরের ক্রেতা কম আসছে।’
আলো জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী পাপ্পু ঘোষ বলেন, ‘দাম যাই হোক, বিয়েশাদি থেমে থাকে না। অনেকে আবার বিনিয়োগ হিসেবেও স্বর্ণ কিনছেন। নগদ টাকায় ভরসা না পেয়ে মানুষ এখন স্বর্ণের দিকেই ঝুঁকছে।’
jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68f311c61c809" ) );
এই দোকানে কথা হয় রাফিয়া আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘দাম বেড়েছে জানি, তবু এখন না কিনলে পরে আরও বাড়বে। তাই একটু বেশি খরচ হলেও এখনই কিনে নিচ্ছি।’
তবে জুয়েলারি দোকানগুলোতে ভিড় বাড়লেও অনেকটা হাতখালি কারিগরদের। তারা বলছেন, দাম বাড়ার ফলে অনেকে স্বর্ণ কিনলেও মূলত স্টক থেকেই বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। ফলে তাদের হাতে আসছে না কাজ।
তাঁতিবাজার মন্দির মার্কেটে ৩০ বছর ধরে গহনা বানাচ্ছেন কারিগর রিপন ঘোষ। তিনি বলেন, ‘দাম বাড়ছে ঠিকই, ক্রেতা তো বাড়ছে না। ব্যবসায়ীদের কাছে স্টক আছে, কিনে নিচ্ছে। আমাদের কাজ বাড়ে শীতকালে, বিয়ের মৌসুমে।’
তাঁতিবাজার বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজী ইউসুফ শরীফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘স্বর্ণের বাজার বাড়তেছে ডলার, যুদ্ধ, তেলের কারণে। পরিস্থিতি যা চলছে তাতে কাস্টমার বাড়ছে। যার টাকা আছে, সে স্বর্ণ গড়িয়ে রাখছে। আমাদের ব্যবসা নিয়ে চিন্তা নেই। শুধু আতঙ্কে আছি নিরাপত্তা শঙ্কা নিয়ে। প্রশাসনকে জানানো হয়েছে, তারা ব্যবস্থা নিচ্ছে।’
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশে মুদ্রাস্ফীতি ও টাকার মান হ্রাস পাওয়ায় স্বর্ণে বিনিয়োগের প্রবণতা স্বাভাবিকভাবেই বাড়ছে।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আইনুল ইসলাম বলেন, ‘স্বর্ণ ঐতিহ্যগতভাবে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। মানুষ যখন অর্থনৈতিক অস্থিরতা দেখে, তখন তারা নগদ টাকা বা ব্যাংক সঞ্চয়ের চেয়ে স্বর্ণে বিনিয়োগে বেশি আস্থা রাখে। তাই যাদের হাতে নগদ অর্থ আছে, বিকল্প বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণকে পছন্দ করবে।’