এ সি আই মটরস্ বাংলাদেশে বাণিজ্যিক যানবাহন আমদানির ক্ষেত্রে কীভাবে নিজেকে আলাদা করেছে?
সুব্রত রঞ্জন দাস: এ সি আই মটরস্ সব সময় পণ্যের গুণমান, গ্রাহকের চাহিদা এবং আধুনিক প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দিয়ে পণ্য নির্বাচন করে আসছে। এ সি আই মটরস্ প্রধানত বিক্রি করছে ফোটন। ফোটন হচ্ছে চীন থেকে আমদানি করা যান, যা বাণিজ্যিক পরিবহনের ক্ষেত্রে বিশ্বের ১ নম্বর ব্র্যান্ড। ফোটনের সঙ্গে যাত্রা শুরু করার পর থেকে প্রতিটি মডেল সময়ের চাহিদা অনুযায়ী আপগ্রেড করা হয়েছে। এ সি আই মটরস্ ওজনের চেয়ে ভলিউম (পণ্যের পরিমাণ) বেশি পরিবহনের ওপর জোর দিচ্ছে। এর ফলে অন্যান্য ব্র্যান্ডের তুলনায় ফোটন ট্রাক ২০-৩০ শতাংশ বেশি মালামাল বহনে সক্ষম। অনলাইনে বিক্রীত পণ্য ডেলিভারির জন্য কিংবা গ্রাম থেকে আসা শাকসবজি, হাঁস–মুরগির মতো যে পণ্যগুলো ওজনে কম হলেও পরিবহনে বেশি জায়গার প্রয়োজন পড়ে সেসবের ক্ষেত্রে ফোটন হচ্ছে উত্তম বাহন। এ ছাড়া ফোটনের প্রতিটি মডেলে রয়েছে পাওয়ার-স্টিয়ারিং এবং লাইট কমার্শিয়াল ভেহিকেলে (এলসিভি) প্রথমবারের মতো আমরা এয়ার ব্রেক ও অ্যান্টিলক ব্রেকিং সিস্টেম প্রযুক্তি যুক্ত করেছি, যা চালকদের জন্য ড্রাইভিংকে আরও নিরাপদ ও আরামদায়ক করে তুলেছে।
ফোটন ট্রাক বাংলাদেশের বাজারে কেমন সাড়া পাচ্ছে? গ্রাহকদের প্রতিক্রিয়া কেমন?
সুব্রত রঞ্জন দাস: এ সি আই মটরস্ সব সময় গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহের বিষয়টি নিশ্চিত করে আসছে। এক থেকে তিন টন ধারণক্ষমতার পরিবহনে ফোটন সবচেয়ে ফাস্টেস্ট গ্রোয়িং ব্র্যান্ড। দেশের ৩৫টি অঞ্চলজুড়ে রয়েছে এর বিক্রয়োত্তর সেবার বিস্তৃত পরিধি। ফলে সহজেই গ্রাহকদের আস্থা অর্জন সম্ভব হয়েছে। গত বছর যদিও সামগ্রিকভাবে এই শিল্প খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, তবু আমরা সেখানে ১৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। বিশেষ করে ট্রাকের জ্বালানি–দক্ষতা, কর্মক্ষমতা ও মূল্য বিবেচনায় গ্রাহকেরা বরাবরই ফোটনের ওপর আস্থা রেখে আসছেন। বাণিজ্যিক যান শুধু বিজ্ঞাপন প্রচারেই বিক্রি নিশ্চিত করা যায় না। পাশের বাসায় একটা গাড়ি থাকলে, তারা ভালো না বললে আপনি কিনতে চাইবেন না। আমরা চাচ্ছি বাজারটা যুববান্ধব করার জন্য। বহু টাকা খরচ করে দেশের বাইরে অনেকেই যান অর্থ উপার্জনের জন্য। দেশে যে কাজ না করতেন, প্রবাসে সেই কাজও করতে হয়। কেউ কেউ গাড়িও চালান। আমরা চাই সেই টাকা কাজে লাগিয়ে দেশেই যেন যুবকেরা স্বনির্ভর হয়ে উঠতে পারেন।
বাংলাদেশে ট্রাক ও বাণিজ্যিক যানবাহনের বাজারের সম্ভাবনা কীভাবে দেখছেন?
সুব্রত রঞ্জন দাস: সম্ভাবনার কথা যদি বলি, গেল কয়েক বছরে এ বাজার গড়ে ১৫ শতাংশ হারে বাড়ছিল, যা অত্যন্ত ইতিবাচক। যদিও বৈশ্বিক অস্থিরতা, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা গত অর্থবছরের প্রথমার্ধে ১২ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি এনেছে, তবু পরের ছয় মাসে বাজার আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবন্ধকতার কথা যদি বলি, বর্তমান আমদানি নীতিমালায় বাণিজ্যিক যানবাহনকে ‘অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসী পণ্য’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে এবং ৭৫ শতাংশ এলসি মার্জিন জমা দিতে হয়। মার্জিন জমা দেওয়ার চার-পাঁচ মাস পর পণ্য আসে, যা ব্যবসার বড় বাধা। অথচ এ খাত জীবিকা, পণ্য পরিবহন ও জাতীয় উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আমি সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করব, বাণিজ্যিক যানবাহনকে ‘অত্যাবশ্যকীয় পণ্য’ হিসেবে পুনঃশ্রেণিবদ্ধ করে আমদানি নীতিমালায় প্রয়োজনীয় সংস্কার আনার জন্য।
দেশীয় পরিবহন খাতে কোন ধরনের ট্রাকের (হালকা, মাঝারি, ভারী) চাহিদা সবচেয়ে বেশি?
সুব্রত রঞ্জন দাস: হালকা। বিশেষ করে ১.২ থেকে দেড় টন ধারণক্ষমতার ট্রাকের চাহিদাই বেশি। আকারে ছোট। কেনার খরচ কম। প্রত্যন্ত অঞ্চলের সরু রাস্তা থেকে বড় রাস্তা—দেশের সর্বত্রই সহজে পরিবহনযোগ্য বলে হালকা গড়নের ট্রাকের চাহিদাই বেশি।
আপনাদের ট্রাকের জ্বালানি–দক্ষতা ও টেকসই দিকগুলো সম্পর্কে কী বলবেন?
সুব্রত রঞ্জন দাস: আমাদের প্রতিটি ট্রাকে ব্যবহার করা হয়েছে আধুনিক ও টেকসই প্রযুক্তি, যা নিশ্চিত করে সর্বোচ্চ জ্বালানি–দক্ষতা ও পরিবেশবান্ধব কার্যক্ষমতা। বিশেষভাবে, টার্বোচার্জার এবং ইন্টারকুলার প্রযুক্তির সমন্বয় আমাদের ট্রাকগুলোকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত জ্বালানিসাশ্রয়ী করে তুলেছে। টার্বোচার্জারের প্রধান কাজ হলো ইঞ্জিন সিলিন্ডারে বাতাস পাম্প করে ইঞ্জিনের শক্তি ও দক্ষতা বৃদ্ধি করা। অন্যদিকে ইন্টারকুলার তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের কাজ করে—টার্বোচার্জার দিয়ে সংকুচিত এবং উত্তপ্ত হওয়া বাতাসকে ঠান্ডা করা। এর ফলে বাতাসের ঘনত্ব যেমন বাড়ে ইঞ্জিনে অক্সিজেন সরবরাহ ও বাড়ে। ফলে ইঞ্জিনের শক্তি বৃদ্ধি পায়, জ্বালানি–দক্ষতা উন্নত হয় এবং ইঞ্জিনের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে।
এ সি আই মটরস্ ট্রাক ছাড়া আর কী কী আমদানি করে? সার্ভিসিং ও খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহে কী ধরনের সুবিধা দিচ্ছে?
সুব্রত রঞ্জন দাস: এ সি আই মটরসের লক্ষ্য হচ্ছে গতি ও গতিশীলতার মাধ্যমে মানুষের জীবনমান উন্নয়ন। বাণিজ্যিক পরিবহনের ক্ষেত্রে ট্রাকের পাশাপাশি কিছু মিনিবাস আমদানি করি আমরা। ফ্রোজেন আইটেম পরিবহনের জন্য আমাদের আছে কুলিং রেফ্রিজারেটর ভ্যান। মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে ইয়ামাহা তরুণদের প্রথম পছন্দ। কৃষি যন্ত্রপাতিতে সোনালীকা ট্রাক্টরের মাধ্যমে প্রায় ৫০ শতাংশ বাজার আমাদের দখলে। এ ছাড়া পাওয়ার টিলার, ওয়াটার পাম্প, ডিজেল ইঞ্জিন, ধান রোপণের মেশিন—রাইস ট্রান্সপ্লান্ট, ধান কাটার মেশিন—হার্ভেস্টার ও পোস্ট হার্ভেস্ট যন্ত্রপাতির মাধ্যমে কৃষিকে আধুনিকায়ন করার কাজে নিয়োজিত আছি। সম্প্রতি আমরা আধুনিক প্রযুক্তির ইকোফ্লো নিয়ে এসেছি, যা গ্রাহকদের জন্য একটি উন্নত পাওয়ার সলিউশন। পাশাপাশি লোভোল, সিয়েট, লিকুই মলির মতো বিশ্বমানের ব্র্যান্ড যুক্ত হয়েছে। এ সি আই মটরস্ শুধু পণ্য আমদানিতেই সীমাবদ্ধ নয় বরং বিক্রয়োত্তর সেবা ও খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহেও শক্তিশালী ভূমিকা রাখছে। দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকেই যোগাযোগ করার ছয় ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে যাবে দক্ষ টেকনিশিয়ান সেবা।
প্রতিযোগী ব্র্যান্ডের তুলনায় এ সি আইয়ের আমদানি করা পরিবহনের প্রধান শক্তি বা বৈশিষ্ট্য কী?
সুব্রত রঞ্জন দাস: প্রতিযোগীরা যখন মুনাফাকে প্রাধান্য দেয়, আমরা তখন গ্রাহকের সমস্যার সমাধান খুঁজি। আমরা শুধুই পণ্য বিক্রি করি না, বরং দেশের তরুণদের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার জন্য উৎসাহিত করি। আমরা দেখি-অনেক তরুণ বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন জীবিকার সন্ধানে, ঝুঁকিপূর্ণ পথে। অথচ দেশের ভেতরেই তাঁরা যদি উদ্যোক্তা হয়ে ওঠেন, তবে স্বনির্ভর হওয়া সম্ভব। ফোটন ও সোনালীকা ব্র্যান্ডের মাধ্যমে আমরা সেই স্বপ্ন পূরণের পথে সহায়তা করে যাচ্ছি। সর্বাধুনিক প্রযুক্তি সুবিধা নিয়ে বেশি ভলিউম পরিবহনের জন্য গ্রাহকেরা বেছে নেন এ সি আই মটরস্।
দেশে সড়ক অবকাঠামো ও পরিবহন খাতের চ্যালেঞ্জগুলো বাজারকে কীভাবে প্রভাবিত করছে?
সুব্রত রঞ্জন দাস: দেশে সড়ক অবকাঠামো ও পরিবহন খাতের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো বাণিজ্যিক যানবাহনের বাজারে নানাভাবে প্রভাব ফেলছে। সংকীর্ণ ও যানজটপ্রবণ রাস্তায় যান চলাচলের ফলে এর কার্যক্ষমতা কমে। এতে করে সময়, জ্বালানি এবং রক্ষণাবেক্ষণের খরচ বাড়ে। দেশে ওভারলোডিং নিয়ন্ত্রণে কার্যকর আইন বা প্রয়োগ না থাকায়, অনেক গাড়ি অতিরিক্ত মালামাল বহন করে। এতে যানবাহনের ইঞ্জিন, চেসিস ও ব্রেকিং সিস্টেমে অতিরিক্ত চাপ পড়ে, যা দ্রুত গাড়ি বিকল হওয়ার আশঙ্কা বাড়ায়। আবার ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত পণ্য বোঝাইয়ের ফলে রাস্তার ক্ষতি হয়, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বেড়ে যায় এবং যান চলাচল ধীরগতির হয়, যা আবার পুরো সাপ্লাই চেইনে প্রভাব ফেলে। সংক্ষেপে যদি বলি, সড়ক অবকাঠামোর দুর্বলতা, নিয়ন্ত্রণহীন ওভারলোডিং এবং দীর্ঘ আমদানি প্রক্রিয়া—তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ বাণিজ্যিক যানবাহনের বাজারকে মন্থর করে দিচ্ছে। এতে শুধু বিক্রেতা বা পরিবেশক নয়, ভোগান্তির মুখে পড়ছেন গ্রাহক ও উদ্যোক্তারাও।
ভবিষ্যতে কি বৈদ্যুতিক বা পরিবেশবান্ধব বাণিজ্যিক যান আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে?
সুব্রত রঞ্জন দাস: অবশ্যই। পরিবেশবান্ধব এবং বৈদ্যুতিক যানবাহন হচ্ছে আগামীর বাহন। কিন্তু দামের অঙ্কটা অনেক বেশি। এ ক্ষেত্রে সরকারের সহযোগিতা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশে, বিশেষ করে ঢাকার শহরে জ্যামে আটকে অহেতুক প্রচুর জ্বালানি শক্তির অপচয় হয় এখনকার গাড়িতে। তাতে পরিবেশের দূষণও হয়। পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক বাণিজ্যিক যান হলে এ থেকে পরিত্রাণ মিলত।