ধনীদের বিলাসে জ্বলছে পৃথিবী

ধনীদের বিলাসে জ্বলছে পৃথিবী

বিশ্বের অতিধনী শূন্য দশমিক এক শতাংশ মানুষ একদিনে যত কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন করেন, বিশ্বের দরিদ্রতম ৫০ শতাংশ মানুষ এক বছরে মিলে ততটুকু নির্গমনও করেন না। আন্তর্জাতিক দাতব্য ও উন্নয়ন সংস্থা অক্সফামের ‘ক্লাইমেট প্লান্ডার: হাউ আ পাওয়ারফুল ফিউ আর লকিং দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টু ডিজাস্টার’ শীর্ষক প্রতিবেদনে আঁতকে ওঠার মতো এমন তথ্য উঠে এসেছে।

ব্রাজিলে কপ৩০ শীর্ষ সম্মেলনের আগে বুধবার (২৯ অক্টোবর) প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, মানবজাতি এখন এমন এক সংকটের মুখে যেখানে বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখতে যে কার্বন বাজেট বাকি আছে, তা মাত্র দুই বছরের মধ্যেই ফুরিয়ে যেতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৯০ সাল থেকে বিশ্বের ধনীতম শূন্য দশমিক এক শতাংশ মানুষের মোট কার্বন নির্গমন বেড়েছে ৩২ শতাংশ, এই সময়ে বিশ্বের দরিদ্রতম অর্ধেক জনগোষ্ঠীর নির্গমন কমেছে ৩ শতাংশ।

সবচেয়ে ধনী শূন্য দশমিক এক শতাংশ মানুষের প্রতিজন প্রতিদিন প্রায় ৮০০ কিলোগ্রাম কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন করেন, যেখানে দরিদ্রতম ৫০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর প্রতিজনের নির্গমন মাত্র ২ কিলোগ্রাম।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যদি পৃথিবীর সবাই এই অতিধনী গোষ্ঠীর মতো জীবনযাত্রা ও কার্বন নির্গমনের ধরন অনুসরণ করে, তাহলে বিশ্বের কার্বন বাজেট তিন সপ্তাহেরও কম সময়ে ফুরিয়ে যাবে।

বৈশ্বিক উষ্ণয়ান ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখতে হলে এই অভিজাত শ্রেণির ব্যক্তিপ্রতি কার্বন নির্গমন ২০৩০ সালের মধ্যে ৯৯% পর্যন্ত কমাতে হবে।

অক্সফামের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিলিয়নিয়ারদের বিনিয়োগও জলবায়ু সংকটের অন্যতম বড় কারণ।

এতে বলা হয়েছে, বিশ্বের মাত্র ৩০৮ জন বিলিয়নিয়ারের বিনিয়োগ পোর্টফোলিও থেকেই ২০২৪ সালে ৫৮৬ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়েছে, যা ১১৮টি দেশের সম্মিলিত নির্গমনের চেয়েও বেশি।

তাদের প্রায় ৬০ শতাংশ বিনিয়োগ জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্পে — যেমন; তেল, গ্যাস ও খনির মতো খাতে। এগুলোর বেশিরভাগই এখনও প্যারিস চুক্তির লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

 অক্সফাম ইন্টারন্যাশনালের নির্বাহী পরিচালক অমিতাভ বেহার বলেন, “জলবায়ু সংকট আসলে একটি বৈষম্যের সংকট। বিশ্বের ধনীতম ব্যক্তিরা জলবায়ু ধ্বংসে অর্থায়ন ও মুনাফা করছে, আর বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ এর প্রাণঘাতী পরিণতি ভোগ করছে।”

অতিধনীদের সম্পদের ওপর কর আরোপ, জীবাশ্ম জ্বালানি লবিং নিষিদ্ধ করা, এবং জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের নীতি নির্ধারণে অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য আহ্বান জানান তিনি।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কপ২৯ সম্মেলনে জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানির ১৭৭৩ জন লবিস্ট অংশগ্রহণের অনুমতি পেয়েছিলেন, যা জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দশটি দেশের মোট প্রতিনিধির সংখ্যার চেয়েও বেশি।

অক্সফাম সতর্ক করেছে, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী শূন্য দশমিক এক শতাংশ মানুষের নির্গমন ২১০০ সালের মধ্যে প্রায় ১৩ লাখ তাপ-সম্পর্কিত মৃত্যু ঘটাতে পারে। এর ফলে ২০৫০ সালের মধ্যে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ৪৪ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত অক্সফাম কান্ট্রি ডিরেক্টর অশীষ দমলে বলেন, “ক্লাইমেট প্লান্ডার প্রতিবেদনটি এক গভীর বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরেছে। অল্পকিছু ধনী দূষণকারী নিজেদের মুনাফার জন্য পৃথিবী পুড়িয়ে দিচ্ছে, আর বাংলাদেশসহ ঝুঁকিপূর্ণ দেশের লাখো মানুষ বন্যা, ক্ষুধা ও জীবিকা হারিয়ে কষ্ট পাচ্ছে। জলবায়ু ন্যায়বিচার দাবি করে, এই ধনী শ্রেণিকে তাদের ন্যায্য অংশের জন্য কর দিতে হবে এবং দায় নিতে হবে; যাতে মানুষ ও পৃথিবী মর্যাদার সঙ্গে টিকে থাকতে পারে।”

Comments

0 total

Be the first to comment.

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে BanglaTribune | অন্যান্য

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে

জুলাই আন্দোলনের মামলা থেকে অব্যাহতির ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং সাড়ে পাঁ...

Sep 12, 2025

More from this User

View all posts by admin