দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ধর্ষণের ঘটনা। শিশু থেকে বৃদ্ধ, কেউই রেহাই পাচ্ছেন না ধর্ষকদের নৃশংসতা থেকে। পুলিশের একটি সংস্থা ধর্ষণকে ‘নৈতিকতা বিবর্জিত সামাজিক ব্যাধি’ হিসেবে অভিহিত করেছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু বাংলাদেশের সংকট নয়—বিশ্বজুড়েই নানা সামাজিক, মানসিক ও প্রযুক্তিগত কারণে যৌন সহিংসতা বাড়ছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ পুলিশের তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ধর্ষণ ইস্যু নিয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে ধর্ষক, ভুক্তভোগী, চিকিৎসক, তদন্ত কর্মকর্তা, ম্যাজিস্ট্রেট ও সাক্ষীসহ বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আলোচিত একাধিক মামলার তথ্য ও প্রমাণ পর্যালোচনার ভিত্তিতে পিবিআই গুরুত্বপূর্ণ, চাঞ্চল্যকর ও ব্যতিক্রমধর্মী কিছু তথ্য উদঘাটন করেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধর্ষণকারীরা ভুক্তভোগীর পরিচিতজন, নিকটাত্মীয় ও বিবাহিত ব্যক্তি। অর্থাৎ অপরাধীরা প্রায়ই ভুক্তভোগীর আস্থার সম্পর্ককেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ বছরের প্রথম ৮ মাসে (জানুয়ারি থেকে আগস্ট) দেশে ৩৯০ জন কন্যাশিশু ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৪৩ জন দলবদ্ধ ধর্ষণ এবং ২৯ জন প্রতিবন্ধী কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণ বা দলবদ্ধ ধর্ষণের পর ১৫ শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। ৫ জন আত্মহত্যা করেছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসে শিশু ধর্ষণ বেড়েছে ৭৫ শতাংশ। সংস্থাটির প্রতিবেদনে এ বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ৭২৫ জন ছেলে ও মেয়ে শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছে— যার মধ্যে শূন্য থেকে ছয় বছর বয়সী শিশু রয়েছে ১০২ জন। ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশু রয়েছে ২১৭ জন। ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশু রয়েছে ২০৮ জন। বয়স জানা যায়নি এমন শিশু রয়েছে আরও ১৯৮ জন। এদের মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৫৫টি শিশু, মামলা হয়েছে ২৭টি। ১৩৪টি শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে—যার মধ্যে ছয় বছরের নিচের শিশু রয়েছে ৩৫টি। ৭ থেকে ১২ বছরের শিশু রয়েছে ৫৭টি। ১৩ থেকে ১৮ বছরের শিশু রয়েছে ১২ জন। ৩০ জনের বয়স জানা যায়নি। ৭২৫টি ঘটনায় মামলা হয়েছে মাত্র ৪৩৬টি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড গবেষণা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও সামাজিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড. মো. তৌহিদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়, প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং সোশ্যাল মিডিয়ার নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহার ধর্ষণকাণ্ডে রসদ জোগাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে বিচারহীনতা ও সামাজিক নিরাপত্তা। এক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদেরও সবচেয়ে বেশি সচেতন ও সতর্ক হতে হবে।
পিবিআইর গবেষণা প্রতিবেদনে ২০১৪ সাল থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ধর্ষণের ঘটনায় মামলার একটি পরিসংখ্যান দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ওই ১০ বছরে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৫০ হাজার ৫৮৬ জন। এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন তিন হাজার ৬১১ জন। ধর্ষণের কারণে মৃত্যু হয়েছে ৩২১ জনের। একই সময়ে ১৯ হাজার ২৩৪ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা হয়েছে ৭৩ হাজার ৬৫২টি। এসব মামলার এজাহারে নাম উল্লেখ করে আসামি করা হয়েছে এক লাখ ১৭ হাজার দুই জনকে। পুলিশ গ্রেফতার করেছিল ৬৭ হাজার ৩৯৭ জনকে। অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেওয়া হয়েছে ৬১ হাজার ৮৪০ মামলায়। চূড়ান্ত রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে ১০ হাজার ৮৮৪টি মামলায়।
পিবিআই আলোচিত ৮৪টি ধর্ষণ মামলা বাছাই করে বিশ্লেষণ করেছে। সেসব মামলার ৮৭ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পিবিআই। তারা জানিয়েছে, ভিকটিম শিশু থেকে মধ্যবয়স্ক নারী যে কেউ হতে পারে। এক্ষেত্রে শিশু, শিক্ষার্থী ও অবিবাহিতার সংখ্যা বেশি। ধর্ষণকারীর পূর্ব পরিচিত ও নিকটাত্মীয়। ধর্ষণের সঙ্গে অভিযুক্তদের ২০ দশমিক ২৩ শতাংশ মাদকাসক্ত, ২৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত। আর ভুক্তভোগীদের ৭২ দশমিক ৬১ শতাংশ শিশু ও শিক্ষার্থী। এ ছাড়া বেশিরভাগ ভুক্তভোগী অতি দরিদ্র পরিবারের।
ধর্ষণের কারণ হিসেবে গবেষণায় পিবিআই বলছে, অপরাধপ্রবণ মানসিকতা, নিয়ন্ত্রণহীন যৌন চাহিদা, সাইকোলজি ও মানসিক অস্থিরতা, মাদকাসক্তি ও পর্নোচিত্র, ক্ষমতা ও বলপ্রয়োগ, ঐতিহাসিক কারণ, সঙ্গদোষ, পারিবারিক শিক্ষার অভাব, ধর্মীয় অনুশাসন না মানা, বিচার ব্যবস্থা বা প্রক্রিয়ার দুর্বলতা। এক্ষেত্রে আরও বলা হয়, এতিমখানা, মাদ্রাসা, ছাত্রাবাস ও শিক্ষাঙ্গন ইত্যাদি জায়গাতেও অনেক ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। শিক্ষকরা অনেক সময় শিক্ষার্থীদের বাধ্য করে যৌনকাজে। বিভিন্ন ধরনের প্রলোভন, অভিভাবকদের অনুপস্থিতিতে শিক্ষকরা সুযোগ গ্রহণ করে। অবৈধ সম্পর্ক, অসম ও অপরিণত বয়সে প্রণয়, যৌনতা সম্পর্কে নোংরা ধারণা, বিপরীত লিঙ্গের প্রতি অশ্রদ্ধা, বিদ্বেষ পর্নোগ্রাফিতে আসক্তি ধর্ষণ ঘটনার জন্য অনেকটা দায়ী। এছাড়া আরও কিছু কারণ উল্লেখ করা হয় গবেষণা প্রতিবেদনে।
পিবিআই প্রধান পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি মো. মোস্তফা কামাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘ধর্ষণ একটি সামাজিক সমস্যা। শুধু আইন, শাস্তি কিংবা নারীকে বাক্সবন্দি ও মোটা কাপড়ে আচ্ছাদিত করে সব কাজকর্ম বাদ দিয়ে কেবলই ধর্মকর্মে মনোনিবেশ, কিংবা সবাইকে সাধু-সন্ন্যাসী হওয়ার পরামর্শ দেওয়ার মধ্যে এর কোনও সমাধান নেই। এক্ষেত্রে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। আর রাষ্ট্রকে সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।’’