দিল্লিতে ‘সফট পাওয়ার’ কূটনীতিতেই এখন বাংলাদেশের ঝোঁক!

দিল্লিতে ‘সফট পাওয়ার’ কূটনীতিতেই এখন বাংলাদেশের ঝোঁক!

সুপরিচিত মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জোসেফ নাই ‘সফট পাওয়ারে’র সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে– আকর্ষণ (অ্যাট্রাকশন) বা ধৈর্য ধরে তাগাদার (পারসুয়েশন) ভিত্তিতে কাউকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা এবং কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো— যেখানে কোনও জোরজবরদস্তি বা টাকাপয়সা লেনদেনের লেশমাত্র থাকে না!

কূটনীতির ক্ষেত্রে এই ‘সফট পাওয়ার’ আন্তর্জাতিক বিশ্বে আজ একটি শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে  এবং বিভিন্ন দেশ তাদের সংস্কৃতি, শিল্পকলা, বিজ্ঞান, প্রকৃতি বা সাহিত্যের নানা উপাদানকেই পররাষ্ট্রনীতি রূপায়নের প্রভাবশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে।

বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক যখন গত একবছরেরও বেশি সময়ের ওপর এক নজিরবিহীন শীতলতার পর্ব পেরোচ্ছে, তখন এই অস্বাভাবিক সময়টাকে ‘অ্যাড্রেস’ করার জন্য ঢাকার দিক থেকেও কিন্তু স্পষ্টতই এখন প্রাধান্য পাচ্ছে সফট পাওয়ার কূটনীতি।

গত কয়েক মাসের মধ্যে ভারতে হাঁড়িভাঙা আম, পদ্মার ইলিশ, চিনিগুঁড়া চাল পাঠানো, ঢাকাই জামদানির প্রদর্শনী কিংবা বিমসটেকের মঞ্চে বাংলাদেশের মিউজিক ব্যান্ডকে পাঠানোর মধ্যে দিয়ে ঢাকা ঠিক এই প্রচেষ্টাটাই চালাচ্ছে। অন্য বড় বড় কূটনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো আপাতত থমকে থাকলেও যার মধ্যে দিয়ে সম্পর্কের একটা সহজ স্বাভাবিকতা বজায় রাখার চেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

শনিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) দিল্লির চাণক্যপুরীতে বাংলাদেশ হাই কমিশন প্রাঙ্গণে যে ইলিশ ভূরিভোজের আয়োজন করেছিল দূতাবাস কর্তৃপক্ষ, সেটাও ছিল এই সচেতন প্রচেষ্টারই অঙ্গ।

jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68d9405bc66c8" ) );

বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত রিয়াজ হামিদুল্লাহ সেই আয়োজনে দিল্লির গণ্যমান্য অতিথিদের পদ্মার ইলিশ দিয়ে আপ্যায়ন করলেন— বাংলাদেশের এক অনন্য প্রাকৃতিক সম্পদের নীরব বিজ্ঞাপনও হলো। সফট পাওয়ার ডিপ্লোম্যাসি আসলে যে কতটা সফল ও কার্যকরী হতে পারে, দিল্লির শারদীয়া দুপুরে তারই সাক্ষী হয়ে রইলেন ভারতের মৎস্যরসিক হুজ হু’রা!

তার কিছুদিন আগেই বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবারেও দুর্গাপুজো উপলক্ষে ভারতে ১২০০ টন ইলিশ পাঠানো হবে। বস্তুত দিল্লির মাছপ্রেমীরা সপ্তাহ শেষে  সেই সিদ্ধান্তেরই সুফল পেলেন।

এর মাত্র কদিন আগেই দিল্লির ন্যাশনাল ক্র্যাফটস মিউজিয়াম ও হস্তকলা অ্যাকাডেমিতে বাংলাদেশ সরকার আয়োজন করেছিল ঢাকাই জামদানির এক অনন্য প্রদর্শনী– সেখানে তুলে ধরা হয়েছিল নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যা পারের সেই সুপ্রাচীন ও জীবন্ত ঐতিহ্যকে।

আশিটি অতি দুষ্প্রাপ্য ও বাছাই করা জামদানির সম্ভার সেখানে দেখার সুযোগ হলো দিল্লির সমঝদার দর্শকদের, এমনকি বাংলাদেশের তাঁতিরা কীভাবে একেবারে বেসিক লুমে এই অনবদ্য শিল্প সৃষ্টি করে থাকেন, সেটাও তারা চাক্ষুষ করতে পারলেন। ভারতের বিখ্যাত ডিজাইনার সুনীতা কোহলি বা বর্ষীয়ান চিত্র পরিচালক মুজফফর আলী এসে উচ্ছ্বসিত প্রশংসায় ভরালেন বাংলাদেশের এই ঐতিহ্যশালী শাড়িকে।

 

jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68d9405bc6704" ) );

প্রদর্শনীর জন্য জামদানিগুলো যখন দিল্লিতে এসে পৌঁছেছে, প্রায় সে সময়ই আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশ ভারতে পাঠিয়েছিল ৫০০ কেজি চিনিগুঁড়া চাল। বাংলাদেশের সেই বিখ্যাত সুগন্ধী চালও ইতোমধ্যে ভারতের নানাপ্রান্তে বিশিষ্ট অতিথিদের ঘরে ঘরে উপহার হিসেবে পৌঁছে গেছে, উৎসবের মৌসুমে তাদের হেঁশেল সুবাসে আমোদিত করে রেখেছে বাংলাদেশের একটি বিশেষ চাল!

তার আগে জুলাইয়ে আমের মরশুমেও দিল্লি, কলকাতা বা আগরতলায় প্রতিবারের মতো এসে পৌঁছেছিল রংপুরের হাঁড়িভাঙা আমের ঝুড়ি– প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সে প্রীতি উপহার থেকে বঞ্চিত হননি নরেন্দ্র মোদি, এস জয়শংকর বা মমতা ব্যানার্জি কেউই!

ঠিক তার পরের মাসে, অগাস্টের গোড়াতেই যখন ভারতের আইসিসিআর বিমসটেক জোটের সাতটি দেশের বিভিন্ন দেশজ সংগীতের ধারাকে সেলিব্রেট করতে দিল্লিতে ‘সপ্তসুর: সেভেন নেশনস, ওয়ান মেলডি’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করলো – সেখানেও কিন্তু পারফর্ম করে গিয়েছিলে বাংলাদেশের লোকসংগীত আর বাউল গানের দল ‘মন কুঠুরি’, মুগ্ধ করেছিল দিল্লির শ্রোতাদের। ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর, দিল্লিতে বাংলাদেশের হাই কমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহও।

এভাবে একটার পর একটা পদক্ষেপের মাধ্যমে বাংলাদেশ আসলে দিল্লিতে নিজেদের সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক সম্পদের পসরাকেই খুব সুক্ষ্মভাবে মেলে ধরছে– যেটাকে বলা যেতে পারে সফট পাওয়ারের এক কুশলী প্রয়োগ।

ভারতের সাবেক একজন শীর্ষস্থানীয় কূ‍টনীতিবিদের কথায়, ‘আমি বাংলাদেশের এই পদক্ষেপের ভূয়সী প্রশংসাই করবো। এই মুহূর্তে যে তিস্তা চুক্তি নিয়ে আলোচনায় অগ্রগতি হবে না, কিংবা বাণিজ্যিক জটগুলো এখনই ছাড়ানো যাবে না– সেটা দু’পক্ষই জানে। কিন্তু তাই বলে তো সম্পর্ক একেবারে থমকে যেতে পারে না। তাই এই পরিস্থিতিতে এটাই সেরা রাস্তা, যাতে সম্পর্কে একটা স্বাভাবিকতা বজায় রাখা যায়!’

ঢাকায় ভারতের সাবেক হাই কমিশনার ভিনা সিক্রি আবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের  মতো দুটো ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশীর মধ্যে ‘সফট পাওয়ার’ প্রয়োগ কিন্তু নতুন কিছু নয়, বরং যেহেতু দুই দেশের বাঙালিদের মধ্যে ভাষা-শিল্প-সংস্কৃতির দুনিয়ায় অনেক মিল, তাই এটা খুব স্বাভাবিক একটা প্রক্রিয়া।

‘সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে শেখ মুজিবুর রহমানের অনুরোধে যখন ভারত কবি নজরুল ইসলামকে সে দেশে পাঠিয়েছিল, সেটাই ছিল দু’দেশের মধ্যে সফট পাওয়ার কূটনীতির প্রথম দৃষ্টান্ত। যদিও তখন হয়তো আমরা প্রক্রিয়াটাকে ঠিক সেই নামে চিনতাম না’, বলছিলেন ভিনা সিক্রি।

jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68d9405bc673b" ) );

দিল্লিতে কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা প্রায় সবাই একটা বিষয়ে একমত— যতদিন না বাংলাদেশে আবারও একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব না নিচ্ছে, ততদিন হয়তো দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক আবার সহজ ও বন্ধুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার আশা করা যাবে না।

ফলে এই পরিস্থিতিতে ‘সফট পাওয়ার’-ই একমাত্র রাস্তা বলে তাদের অনেকেই মনে করছেন। বাংলাদেশ যেমন শাড়ি-আম-ইলিশ বা সুগন্ধী চালে ভারতের মন জয় করতে চাইছে, তেমনই ভারতেরও উচিত হবে ধীরে ধীরে আবারও পর্যটন ভিসা দেওয়া শুরু করে সাধারণ বাংলাদেশিদের মনে আস্থা ফেরানো, এমনও পরামর্শ দিচ্ছেন তাদের কেউ কেউ।    

Comments

0 total

Be the first to comment.

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে BanglaTribune | অন্যান্য

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে

জুলাই আন্দোলনের মামলা থেকে অব্যাহতির ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং সাড়ে পাঁ...

Sep 12, 2025

More from this User

View all posts by admin