দিনের আলোয় রুশ হামলা, থমকে যাচ্ছে ইউক্রেনীয়দের জীবন

দিনের আলোয় রুশ হামলা, থমকে যাচ্ছে ইউক্রেনীয়দের জীবন

ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু করেই পাঁচ বছরের শিশুকে শ্রেণিকক্ষের বদলে নামতে হয়েছে ভূগর্ভস্থ আশ্রয়ে। ২ সেপ্টেম্বর সকালেই বিমান হামলার সাইরেন বেজে ওঠে। আর অন্যান্য শিক্ষার্থীর মতো তাকেও পাঠানো হয় বেজমেন্টে। যুদ্ধের মধ্যে স্কুলজীবনের এমন বাস্তবতাই এখন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে ইউক্রেনীয় শিশুদের জন্য। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-র এক প্রতিবেদনে এমন পরিস্থিতির কথা উঠে এসেছে।

রাশিয়া এ বছর নিজেদের ড্রোন উৎপাদন বাড়ানোর পর থেকে হামলার পরিমাণ ও মাত্রা বেড়েছে। আগে বেশিরভাগ আক্রমণ হতো রাতে, তবে সম্প্রতি দিনের বেলায়ও হামলার হুমকি বাড়ছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে সর্বাত্মক আগ্রাসন শুরুর পর থেকে শুধু কিয়েভেই এক হাজার আটশোর বেশি বিমান হামলা সতর্কতা জারি হয়েছে। এর ফলে নাগরিক জীবনে প্রায় ২ হাজার ২০০ ঘণ্টা থেমে গেছে কার্যক্রম। চলতি মাসের প্রথম দুই সপ্তাহে গড়ে দিনে দু’বার সাইরেন বাজছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার-এর বিশ্লেষক ক্রিস্টিনা হারওয়ার্ড বলেন, পুতিন ও ক্রেমলিনের শীর্ষ নেতারা বারবারই বলেছেন, তারা আলোচনায় আগ্রহী নন। বরং এসব হামলা তাদের সেই অবস্থানকেই আরও স্পষ্ট করছে।

jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68d5727ed40e7" ) );

স্কুলগুলোরও মানিয়ে নেওয়ার নিয়ম তৈরি হয়েছে। নতুন শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুটিনের পাশাপাশি এখন শেখানো হয় আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছানোর পথ, জরুরি সরে যাওয়ার নিয়ম। কিয়েভের একটি স্কুলের উপ-প্রধান লিউদমিলা আন্দ্রুক জানান, ৭০০ শিক্ষার্থীকে আশ্রয়ে পৌঁছাতে ছয় মিনিট লাগে। তিনি বলেন, শারীরিক নিরাপত্তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, মানসিক স্থিতিও আমাদের জন্য সমান জরুরি। দীর্ঘ সময় আশ্রয়ে কাটাতে হলে আমরা গল্প বলি, খেলা খেলি বা ভিডিও দেখি। তবুও ক্লাসে ফেরার পর শিশুরা ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

শুধু স্কুল নয়, দৈনন্দিন জীবনেও ব্যাপক প্রভাব পড়ছে। কিয়েভের বৃহত্তম শপিং সেন্টার লাভিনা মলে একসঙ্গে ২০ হাজার মানুষ কেনাকাটা করেন। প্রতিবার সাইরেন বাজলেই সেখানে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। সিইও দিমিত্রো লাশিন বলেন, মানুষ এখন আর অবসরে ঘুরে কেনাকাটা করে না, বরং দ্রুত যা প্রয়োজন তাই কিনে নেয়।

তার কথায়, আমাদের জরিপে দেখা গেছে, মানুষ একদিন ধরে বেঁচে থাকার পরিকল্পনা করছে। তারা ভাবে, কাল হয়তো আর থাকব না, তাই আজ কেন নিজেকে বঞ্চিত করব?

jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68d5727ed4128" ) );

সংস্কৃতিজগতেও বদল এসেছে। চলচ্চিত্র প্রযোজক ওলেক্সি কোমারোভস্কি বলেন, এখন সিনেমা রেটিংয়ের নতুন মানদণ্ড তৈরি হয়েছে। যদি দর্শকরা আশ্রয় থেকে ফিরে এসে ছবি শেষ করেন, তবে বুঝতে হবে সিনেমাটি সত্যিই ভালো।

বেসামরিক স্বেচ্ছাসেবকরাও এখন প্রতিরক্ষায় যুক্ত হচ্ছেন। কিয়েভের একটি স্বেচ্ছাসেবী ইউনিটের প্রধান আন্দ্রি জানান, নির্মাণশ্রমিক থেকে শুরু করে কবি পর্যন্ত বিভিন্ন পেশার মানুষ তাদের দলে আছেন। ছয় সপ্তাহের প্রশিক্ষণে ড্রোন শনাক্ত ও গুলি করে নামানোর কৌশল শেখানো হয়। তার মতে, ড্রোনযুদ্ধ এখন জটিল হয়ে উঠেছে, যা আসলে ‘ক্ষুদ্রাকৃতির বিমান চালনার সমান দক্ষতা’ দাবি করে।

বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া বর্তমানে মাসে পাঁচ হাজারের বেশি দূরপাল্লার আঘাত হানতে সক্ষম ড্রোন তৈরি করছে। চীনা যন্ত্রাংশ সরবরাহ না থাকলে এ উৎপাদন সম্ভব হতো না। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার সামরিক শিল্পে ব্যবহৃত চিপস ও টেলিযোগাযোগ সরঞ্জামের বড় অংশ আসছে চীনা কোম্পানি থেকে।

কিয়েভের শিশুশিক্ষার্থীরা এখন ‘গ্র্যাব ব্যাগ’ নিয়ে স্কুলে আসে। যার ভেতরে থাকে পানি, খাবার ও জরুরি নম্বর লেখা স্টিকার। টিম হ্রিশচুক নামের এক শিশু জানায়, দ্বিতীয় দিনে আশ্রয়ে তিন ঘণ্টা কাটাতে হয়েছে। তার কথায়, আমি শুধু বসেছিলাম, কিছু স্ন্যাকস খেয়েছি আর খেলা খেলেছি। তবে বেশ বিরক্তও লেগেছিল।

যুদ্ধের প্রতিটি হামলা, প্রতিটি সাইরেন, প্রতিটি আশ্রয়—ইউক্রেনের লাখো মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে প্রতিদিন থামিয়ে দিচ্ছে। আর এটিই রাশিয়ার যুদ্ধনীতির বড় অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Comments

0 total

Be the first to comment.

More from this User

View all posts by admin