ডিপ্লোমা প্রকৌশল শিক্ষার্থীরা কেন আন্দোলনে

ডিপ্লোমা প্রকৌশল শিক্ষার্থীরা কেন আন্দোলনে

বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি সম্পন্ন করা ছাড়া আর কাউকেই ‘প্রকৌশলী’ হিসেবে পরিচয় ব্যবহার করতে দিতে চান না বিএসসি প্রকৌশল শিক্ষার্থীরা। আবার ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের ‘উপ-সহকারী প্রকৌশলী’র সংরক্ষিত পদে নিয়োগও চান তারা।

এদিকে, ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের ‘ইঞ্জিনিয়ার’ মানতে চান না যারা, তারাই আবার নিম্ন পদে নিয়োগ চাইছেন। এটিকে ‘স্ববিরোধিতা’ উল্লেখ করে নিজেদের দাবি আদায়ে রাজপথে আন্দোলনে নেমেছেন ডিপ্লোমা প্রকৌশল শিক্ষার্থীরা।

তাদের এই আন্দোলন নিয়ে বুধবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রকৌশল পেশাজীবীদের সমস্যা নিরসনে ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে সরকার।

এ বিষয়ে ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশের (আইডিইবি) অন্তর্বর্তী কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী মো. কবীর হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সমস্যাগুলো নিয়ে প্রায় আড়াই ঘণ্টা আলোচনা হয়েছে। সব পক্ষের প্রতিনিধি ছিলেন। আলোচনার পর ছয় সদস্যের একটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। সমস্যা সমাধানে কমিটি এ বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত দেবে।’

তিনি বলেন, ‘ইঞ্জিনিয়ার কাকে বলা হবে বা কাকে বলা হবে না, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি। এ বিষয়ে কমিটি সিদ্ধান্ত নেবে।’

কবীর হোসেন বলেন, ‘দশম গ্রেডে প্রবেশ পদে ডিপ্লোমা প্রকৌশলী ছাড়া কেউ আবেদন করতে পারবে না, বর্তমানে যে অবস্থায় আছে সে অবস্থায় থাকবে। তিন জায়গা অর্থাৎ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রুয়েট ও মেট্রোরেলে যে নিয়োগ হয়েছে তা বাতিল করার দাবি জানানো হয়েছে। নবম গ্রেডে পদোন্নতি পাবেন ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরা। তবে আপাতত ৩৩ শতাংশই থাকছে।’

বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সমিতির অন্তর্বর্তী কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের আহ্বায়ক মো. আরিফুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ওরা গ্র্যাজুয়েট ইঞ্জিনিয়ার। মানুষ উপরের দিকে যাওয়ার প্রত্যাশা করে কিন্তু তারা নিম্ন পদে আবেদন করার সুযোগ চান। অথচ ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের ইঞ্জিনিয়ার পদ ব্যবহার করতে দিতে চান না তারা। এটা হচ্ছে ভিন্ন চোখে দেখা। প্রকৌশল বিভাগের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ের কাজ বাস্তবায়ন করে ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরা। গ্র্যাজুয়েট প্রকৌশলীরা পরিকল্পনা করবেন, ডিজাইন করবে, মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করবেন ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরা। ডিপ্লোমা প্রকৌশল পাস না করলে উপ-সহকারী পদে আবেদনই করতে পারবে না। সেই পদ তারা (বিসিএস প্রকৌশলী) গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি নিয়ে চাকরি করতে চায়। তারা ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের বলছে টেকনিশিয়ান, তাহলে সেই পদে তারা চাকরির চাইবে কেন? তাদের তিনটি দাবিই সাংঘর্ষিক।’

ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের ৬ দাবি

১. জুনিয়র ইনস্ট্রাক্টর পদে ক্রাফট ইনস্ট্রাক্টরদের অবৈধ পদোন্নতির রায় হাইকোর্ট কর্তৃক বাতিল করতে হবে। ক্রাফট ইনস্ট্রাক্টরদের পদবি পরিবর্তন, মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের চাকরিচ্যুত করতে হবে। ২০২১ সালে ‘রাতের আঁধারে’ নিয়োগপ্রাপ্ত ক্রাফট ইনস্ট্রাক্টরদের নিয়োগ সম্পূর্ণভাবে বাতিল এবং সেই বিতর্কিত নিয়োগবিধি অবিলম্বে সংশোধন করতে হবে।

২. ডিপ্লোমা ইন-ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সে যেকোনও বয়সে ভর্তির সুযোগ বাতিল করতে হবে। উন্নত বিশ্বের আদলে চার বছর মেয়াদি মানসম্পন্ন কারিকুলাম চালু করতে হবে এবং অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে ইংরেজি মাধ্যমে করতে হবে।

৩. উপসহকারী প্রকৌশলী ও সমমান (১০ম গ্রেড) থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের জন্য সংরক্ষিত থাকা সত্ত্বেও যেসব সরকারি, রাষ্ট্রীয়, স্বায়ত্তশাসিত ও স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের নিম্ন পদে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

৪. কারিগরি সেক্টর পরিচালনায় পরিচালক, সহকারী পরিচালক, বোর্ড চেয়ারম্যান, উপসচিব, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, অধ্যক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সব পদে কারিগরি শিক্ষাবহির্ভূত জনবল নিয়োগ নিষিদ্ধ করতে হবে এবং তা আইনানুগভাবে নিশ্চিত করতে হবে। এই পদগুলোয় অনতিবিলম্বে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত জনবল নিয়োগ ও সব শূন্য পদে দক্ষ শিক্ষক ও ল্যাব সহকারী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে।

৫. স্বতন্ত্র ‘কারিগরি ও উচ্চশিক্ষা’ মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা ও ‘কারিগরি শিক্ষা সংস্কার কমিশন’ গঠন করতে হবে।

৬. পলিটেকনিক ও মনোটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগের লক্ষ্যে একটি উন্নতমানের টেকনিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পাশাপাশি নির্মাণাধীন চারটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে (নড়াইল, নাটোর, খাগড়াছড়ি ও ঠাকুরগাঁও) পলিটেকনিক ও মনোটেকনিক থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের জন্য অস্থায়ী ক্যাম্পাস ও ডুয়েটের আওতাভুক্ত অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে আগামী সেশন থেকে শতভাগ সিটে ভর্তির সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

নতুন দাবি

বুধবার রাজধানীতে সড়ক অবরোধ করেছেন ডিপ্লোমা প্রকৌশল শিক্ষার্থীরা। আন্দোলন থেকে আগের ৬ দাবির সঙ্গে আরও ৪টি দাবি জানানো হয়েছে। এগুলো হলো-

১. ‘প্রকৌশল অধিকার আন্দোলন’ কর্তৃক ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের প্রকাশ্যে গুলি ও জবাই করে হত্যার হুমকি প্রদানকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

২. বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার্থীদের অযৌক্তিক তিন দফা দাবির পক্ষে পরিচালিত সব ধরনের রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।

৩. ‘কারিগরি ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ’-এর উত্থাপিত যৌক্তিক ছয় দফা দাবির রূপরেখা ও সুপারিশ অনুযায়ী পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

৪. ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ান-চ্যানেল এডুকেশন চালু করতে হবে।

বিসিএস প্রকৌশলীদের তিন দফা দাবি

নবম গ্রেড সহকারী প্রকৌশলী পদে কেবল পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ ও ন্যূনতম যোগ্যতা বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার করা।

দশম গ্রেডে শুধু ডিপ্লোমাধারীরা আবেদন করতে পারেন, সেখানে যেন উচ্চ ডিগ্রিধারীরাও আবেদন করতে পারেন, সে ব্যবস্থা করা।

শুধু বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং যারা সম্পন্ন করবেন, তারাই যেন প্রকৌশলী (ইঞ্জিনিয়ার) লিখতে পারেন, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া।

Comments

0 total

Be the first to comment.

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে BanglaTribune | অন্যান্য

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে

জুলাই আন্দোলনের মামলা থেকে অব্যাহতির ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং সাড়ে পাঁ...

Sep 12, 2025

More from this User

View all posts by admin