উত্তর কোরিয়া তাদের শাসক দল ওয়ার্কার্স পার্টি-এর ৮০ বছর পূর্তি উদযাপন করেছে এক জাঁকজমকপূর্ণ সামরিক প্যারেডের মাধ্যমে। এই আয়োজনে চীন ও রাশিয়ার উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি ছাড়াও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দুই দেশ ভিয়েতনাম ও লাওসের নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, এ আয়োজনের মাধ্যমে পিয়ংইয়ং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন বন্ধু জোটে যুক্ত হওয়ার কূটনৈতিক বার্তা দিয়েছে। জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে এ খবর জানিয়েছে।
ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক তো লাম ছিলেন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অতিথি। ১৮ বছর পর এই প্রথম কোনও ভিয়েতনামি নেতা উত্তর কোরিয়া সফর করলেন। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সমমর্যাদার পদে রয়েছেন তো লাম। তিনি নিজের দেশে রাষ্ট্র ও দলের সর্বোচ্চ নেতা।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে চায় উত্তর কোরিয়া। তবে নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে এ উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
জাপানের ওসাকার কানসাই গাইদাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মার্ক এস কোগান বলেন, এই সফর উত্তর কোরিয়ার জন্য কূটনৈতিক জয়। দীর্ঘদিন পর এমন উচ্চপর্যায়ের সফর দেশটির বৈধতা ও কূটনৈতিক অস্তিত্বের স্বীকৃতির ইঙ্গিত।
তিনি আরও বলেছেন, দুই দেশই একে অপরের জন্য লাভজনক। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা পাশ কাটাতে ভিয়েতনাম দীর্ঘদিন ধরে উত্তর কোরিয়ার পণ্য ও সেবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে কাজ করছে।
২০২৫ সালে উত্তর কোরিয়া ও ভিয়েতনাম তাদের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭৫ বছর উদযাপন করবে। উভয় দেশই কমিউনিস্ট শাসনব্যবস্থা অনুসরণ করে। তবে অর্থনৈতিক কাঠামোতে বড় পার্থক্য রয়েছে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিজ্ঞানী এডওয়ার্ড হাওয়েল বলেন, ভিয়েতনাম আদর্শগতভাবে কমিউনিস্ট, কিন্তু অর্থনীতিতে উন্মুক্ত বাজারনীতি অনুসরণ করছে। যা কিম জং উন স্পষ্টতই অনুকরণ করতে চান না।
তিনি আরও বলেন, তবে প্রতিরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও বিমান খাতে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি প্রমাণ করে পিয়ংইয়ং নতুন উপায়ে সম্পদ ও প্রযুক্তি অর্জনের চেষ্টা করছে।
চীন উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। ২০২৩ সালে দেশটির মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের ৯৮ শতাংশই চীনের সঙ্গে হয়েছে বলে জানিয়েছে কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস।
অন্যদিকে ভিয়েতনামও কৃষি ও সাংস্কৃতিক খাতে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সীমিত সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী। তবে উত্তর কোরিয়ার ছোট ও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি বাস্তবে খুব বেশি সুযোগ দেয় না। দক্ষিণ কোরিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালে উত্তর কোরিয়ার মোট অর্থনীতির আকার ছিল মাত্র ২৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।
লাওসের প্রেসিডেন্ট থোংলাউন সিসুলিথও উত্তর কোরিয়ার এই আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন। পিয়ংইয়ং ও ভিয়েনতিয়েনের সম্পর্কের বয়স পাঁচ দশকের বেশি হলেও বাণিজ্য এখনও ন্যূনতম। তবু লাওস উত্তর কোরিয়াকে এমন সহায়তা দেয়, যা অন্য দেশগুলো দেয় না।
অক্সফোর্ডের এডওয়ার্ড হাওয়েল বলেন, লাওসের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার মানে উত্তর কোরিয়ার জন্য নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর আরেকটি পথ তৈরি হওয়া।
লাওসে উত্তর কোরিয়ার আইটি ও নির্মাণ খাতের শ্রমিকরা কাজ করছে বলে রিপোর্ট আছে। এসব শ্রমিকের উপার্জন থেকে পাওয়া বৈদেশিক মুদ্রা উত্তর কোরিয়ার সামরিক কর্মসূচিতে ব্যয় হচ্ছে বলে পশ্চিমা দেশগুলোর দাবি।
সিউলভিত্তিক সংবাদমাধ্যম এনকে নিউজ-এর প্রধান প্রতিবেদক শ্রেয়াস রেড্ডি বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া উত্তর কোরিয়ার জন্য আদর্শ কূটনৈতিক ক্ষেত্র। এই অঞ্চলের দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে চায়।
তিনি আরও বলেন, যদি উত্তর কোরিয়া এই দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য বা কূটনৈতিক সহযোগিতা বাড়ায়, তবে তা নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গের ঝুঁকি তৈরি করবে। সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া বা থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলো তাই সাবধানে এগোবে।