দলিলে লেখা এসব শব্দের অর্থ জেনে রাখুন, নাহলে পড়তে পারেন আইনি জটিলতায়

দলিলে লেখা এসব শব্দের অর্থ জেনে রাখুন, নাহলে পড়তে পারেন আইনি জটিলতায়

১. গংঅর্থ: অন্যান্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। একজনের নামের সঙ্গে গং থাকলে বোঝায় তাঁর সঙ্গে আরও লোক আছে।

২. খংঅর্থ: খতিয়ান। জমির বিবরণ, দাগ নম্বর, অংশসহ সরকারি জরিপের একটি দলিল। বিভিন্ন দলিলে খতিয়ানের সংক্ষিপ্ত রূপ হিসেবে খং লেখা হয়।

৩. নিংঅর্থ: নিরক্ষর। যে ব্যক্তি লেখাপড়া জানেন না, তাঁর পক্ষে দলিলে অন্য কেউ স্বাক্ষর দিলে প্রথমে নিরক্ষর ব্যক্তির নামের বাঁ পাশে বা সামনে লেখা হয় নিং।

৪. বংঅর্থ: বাহক। যিনি নিরক্ষর ব্যক্তির নাম লিখে সাক্ষর দেন, তাঁর নামের সামনে লেখা থাকে বং।

৫. সাংঅর্থ: সাকিন বা গ্রাম। বাসস্থানের ঠিকানা অর্থে ব্যবহৃত হয়।

৬. জংঅর্থ: স্বামী। দলিলে কোনো বিবাহিত নারীর স্বামীর নামের সামনে লেখা হয় জং।

৭. মংঅর্থ: মোট। কোনো মোট হিসাব বা পরিমাণের সংক্ষিপ্ত রূপ এটি। অনেক দলিলে ‘মবলক’ শব্দটিও ব্যবহার করা হয় মোট পরিমাণ বোঝাতে।

৮. এওয়াজঅর্থ: বিনিময়। সমমূল্যের জমি বা সম্পদের বিনিময়কে বলা হয় এওয়াজ।

৯. সিটঅর্থ: মানচিত্রের অংশ।

১০. পিংঅর্থ: পিতা। দলিলে কোনো ব্যক্তির পিতার নামের আগে লেখা হয়।

১১. ইয়াদিকৃতঅর্থ: পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তার নামে শুরু। শব্দটি লেখা হতো পুরোনো দলিলগুলোতে।

১২. পত্র মিদংঅর্থ: পত্রের মাধ্যমে। চিঠি দিয়ে জানানো বা অবগত করা হয়েছে, এ অর্থে ব্যবহার করা হয়।

১৩. বিংঅর্থ: বিস্তারিত। কোনো কিছু বিস্তারিত বোঝাতে ব্যবহার করা হয় বিং।

১৪. দংঅর্থ: দখলকারী। কোনো জমি যাঁর দখলে আছে, তাঁর নামের পাশে লেখা হয় দং।

১৫. হাল দাগঅর্থ: বর্তমানে প্রচলিত দাগ নম্বর।

১৬. সাবেক দাগঅর্থ: পূর্বের বা আগের দাগ নম্বর।

১৭. চালাঅর্থ: একটু উঁচু জমি, যেখানে সহজে চাষবাস করা যায়।

১৮. নালঅর্থ: যে জমিতে চাষবাস করা যায় বা চাষের উপযুক্ত।

১৯. বাইদঅর্থ: বৃষ্টির পানি জমে, এমন নিচু ও জলাভূমি প্রকৃতির জমি।

২০. কোর্ফা বা কোরফাঅর্থ: জমির মালিকানা স্বত্ব, যা প্রজা তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বা রাজার কাছ থেকে নিয়ে চাষ করেন।

২১. ছাহামঅর্থ: জমিজমার অংশ বা ভাগ। কোনো জমিতে কে কত অংশ জমি পেলেন বা পাবেন, বিশেষ করে শরিকদের মধ্যে জমিজমার প্রাপ্য অংশ বোঝাতে ব্যবহার করা হয় ছাহাম।

২২. খাসজমিঅর্থ: সরকারি মালিকানাধীন জমি।

২৩. পতিত জমিঅর্থ: যে জমিতে চাষবাস করা হতো, কিন্তু জমির উর্বরতা বাড়ানোর জন্য সাময়িকভাবে চাষাবাদ হচ্ছে না।

২৪. চাকরানঅর্থ: জমিদারেরা চাকরদের বেতনের বদলে জমিতে যে ভোগদখলের সুবিধা দিতেন, তাকে বলে চাকরান।

২৫. ছুট বা ছুটা দাগঅর্থ: জমির নকশায় ভূমির দাগ নম্বর দেওয়ার সময় ভুলে কোনো সংখ্যা বাদ পড়ে গেলে বাদ পড়া নম্বরটি হচ্ছে ছুট বা ছুটা দাগ।

২৬. বাটাঅর্থ: বাটা মানে বিভক্ত। জমির নকশা তৈরির সময় কোনো দাগ বিভক্ত করে বা আলাদা করে নতুন দাগ নম্বর সৃষ্টি করার সময় বিশেষভাবে দাগ তৈরি করা হয়, একেই বলে বাটা দাগ।

২৭. ছড়া বা ছড়িঅর্থ: পাহাড় বা টিলা থেকে যে জমি সমতলের দিকে ছড়িয়ে পড়েছে, তাকে বলে ছড়া বা ছড়ি।

২৮. নয়নজুলিঅর্থ: কোনো রাস্তা তৈরির সময় দুই দিক থেকে মাটি তোলার ফলে একধরনের নালা তৈরি হয়। সেই নালাকেই বলে নয়নজুলি।

২৯. হালটঅর্থ: জমির পাশ দিয়ে চাষের সুবিধার্থে বলদ কিংবা কৃষকদের চলাচলের জন্য যে পথ রাখা হয়, তাকে বলে হালট।

৩০. সিকস্তিঅর্থ: নদী বা সাগরের জোয়ারে যখন কোনো জমি ভেঙে যায়, তাকে বলে সিকস্তি।

৩১. পয়স্তিনদী বা সাগরে বিলীন হয়ে যাওয়া কোনো জমি যখন পুনরায় চরের মতো জেগে ওঠে, তাকে বলে পয়স্তি।

৩২. বিলাঅর্থ: জলাবদ্ধ এলাকা, মৌসুমি জলাভূমি।

৩৩. ডাঙ্গাঅর্থ: চাষের উপযোগী উঁচু জমি।

৩৪. গোপাটঅর্থ: পতিত জমি, যেখানে গবাদিপশু ঘাস খাওয়ার জন্য চষে বেড়ায়।

৩৫. কোলা জমিঅর্থ: বসতবাড়ির সঙ্গে অবস্থিত কোনো নাল বা চাষাবাদের জমিকে বলে কোলা জমি।

৩৬. চিরাগীঅর্থ: মসজিদ বা কবরস্থানে আলো জ্বালানোর জন্য যে খরচ হয়, তা মেটানোর জন্য কোনো দানকৃত ভূমি।

৩৭. পালাম ভূমিঅর্থ: বসতবাড়ির পাশেই অবস্থিত সবজি চাষের জন্য উঁচু জমি।

৩৮. লায়েক জমিঅর্থ: চাষের উপযুক্ত জমি।

৩৯. কস্যঅর্থ: কস্য মানে হলো কার নামে দলিল। মালিকের নামে দলিল হলে কস্য শব্দটি ব্যবহার করা হয়।

৪০. মৌরশীঅর্থ: পৈত্রিক সম্পত্তি।

৪১. চটানঅর্থ: বাড়ির কাছাকাছি থাকা একটি উঁচু কিন্তু সমতল বা ঢালু এলাকা, যেখানে কোনো চাষবাস হয় না।

৪২. ইজাঅর্থ: চলমান কোনো হিসাবে টেনে আনা।

৪৩. খারাজঅর্থ: কৃষিকাজে ব্যবহৃত কোনো জমির ওপর ধার্য করা কর।

৪৪. লাখেরাজঅর্থ: যে জমিতে কোনো কর দিতে হয় না বা করের আওতামুক্ত।

৪৫. তসদিকঅর্থ: কোনো প্রমাণ, দলিল–দস্তাবেজ বা সাক্ষ্যপ্রমাণের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা।

৪৬. জমাবন্দীঅর্থ: ভূমি অফিসে প্রজা বা ক্রেতার নাম, জমির বিবরণ ও খাজনার বিবরণী লিপিবদ্ধ করা।

৪৭. আমলনামাঅর্থ: জমিদার কর্তৃক জমির বন্দোবস্ত দেওয়ার নির্দেশপত্র বা দলিল।

৪৮. চান্দিনাঅর্থ: হাটবাজারের জন্য স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে বরাদ্দ দেওয়া অকৃষি জমি।

৪৯. হারাহারিঅর্থ: গড়পড়তা, অনুপাত অনুযায়ী ভাগবাঁটোয়ারা বা অনুপাত অনুযায়ী। জমির পরিমাপ বা ভাগাভাগির ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার করা হয়।

৫০. তৌজিঅর্থ: রাজস্ব রেকর্ড, যা কোনো জমি বা সম্পত্তির রাজস্বের পরিমাণ এবং মালিকের নাম ধারণ করে। এটি মূলত ব্রিটিশ আমলে ভূমি রাজস্ব আদায়ের জন্য ব্যবহৃত হতো।

৫১. কায়েমিঅর্থ: বিশেষ অধিকার, যা স্থায়ী ও কোনো শর্তের ওপর নির্ভরশীল নয়। অর্থাৎ কায়েমি সত্তা বা অধিকার হলো এমন এক অধিকার, যা সহজে বাতিল করা যায় না।

৫২. খাইখন্দকঅর্থ: জলাশয় বা গর্তযুক্ত ভূমিকে বলা হয় খাইখন্দক।

৫৩. বাস্তুঅর্থ: বসতভিটাকে বলা হয় বাস্তু।

৫৪. রোকঅর্থ: নগদ অর্থ দিয়ে কেনা জমি। রোক মানে নগদ।

৫৫. আসলিঅর্থ: মূল ভূমি বোঝাতে লেখা হয় আসলি।

৫৬. তুদাবন্দীঅর্থ: জমির সীমানা নির্ধারণ করা।

৫৭. দিয়ারাঅর্থ: নদীর পলি দিয়ে গঠিত কোনো চরাঞ্চল বা জমিকে বলে দিয়ারা জমি।

৫৮. কিত্তাঅর্থ: ভূমিখণ্ডকে কিত্তা লেখা হয় অনেক দলিলে।

৫৯. কবুলিয়তঅর্থ: স্বীকারোক্তি দলিলকে বলা হয় কবুলিয়ত।

৬০. কান্দাঅর্থ: নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা উর্বর কোনো উঁচু জমি।

৬১. কিসমতঅর্থ: ভূমির অংশ বোঝাতে কিসমত লেখা হয়।

৬২. গির্বঅর্থ: বন্ধক। কোনো জমি বন্ধক নিলে বা বন্ধকি জমি বোঝাতে বলা হয় গির্ব।

৬৩. টেকঅর্থ: নদীর পলি জমে সৃষ্ট ভূমি।

৬৪. দরবস্তঅর্থ: সবকিছু।

৬৫. দিঘলিঅর্থ: নির্দিষ্ট খাজনা প্রদানকারী।

৬৬. নক্সা ভাওড়ন বা নকশা ভাওড়নঅর্থ: আগের জরিপের কোনো মানচিত্রকে বলা হয় নক্সা ভাওড়ন বা নকশা ভাওড়ন।

যেকোনো দলিল লিখতে হয় আইনে বলে দেওয়া নির্দিষ্ট পদ্ধতি মেনে। বিশেষ করে সাফকবলা, হেবা বা দানপত্র দলিল, বায়না দলিল, আমমোক্তার দলিলসহ অন্যান্য জমিজমাসংক্রান্ত দলিলে ব্যবহৃত হয় বিভিন্ন ব্যতিক্রমী শব্দ ও সংকেত। এসব শব্দ সচরাচর অন্য কোথাও ব্যবহৃত হয় না। দলিল করার সময় কিংবা দলিল তল্লাশি বা পরীক্ষা করে দেখার সময় এসব শব্দের অর্থ ভালোভাবে না বুঝলে হতে পারে নানা জটিলতা, পড়তে পারেন বিপদে। তাই জেনে নিন, দলিলে ব্যবহৃত কিছু শব্দের আসল অর্থ।

Comments

0 total

Be the first to comment.

More from this User

View all posts by admin