মহালয়ার পর থেকেই টানা বৃষ্টি, নিম্নচাপ, জলমগ্ন রাস্তা—সব মিলিয়ে এবারের দুর্গাপুজোর আগেই চিন্তা দেখা দিয়েছিল ব্যবসায়ী মহলে। কিন্তু সব আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে রাজ্যের দুর্গাপুজো ঘিরে ব্যবসা পৌঁছে গেছে প্রায় ৬৫ হাজার কোটি রুপিতে। গত বছরের তুলনায় বৃদ্ধি প্রায় ৮ থেকে ১০ শতাংশ।
মহালয়ার পর ভারী বৃষ্টির মধ্যেও এবারের দুর্গাপুজোয় পশ্চিমবঙ্গে ব্যবসা ছুঁয়েছে ৬৫ হাজার কোটি। রাজ্যের মোট জিডিপির প্রায় ৪ শতাংশ আসে দুর্গাপুজো ঘিরে অর্থনৈতিক কার্যকলাপ থেকে। কলকাতার অবদান সর্বাধিক, রাজ্যের পুজো ব্যবসার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই মহানগরকেন্দ্রিক। রেস্তোরাঁ, মল, প্যান্ডেল নির্মাণ, পোশাক ও অনলাইন বাজার মিলিয়ে রাজ্যের উৎসব-অর্থনীতি এই বছরও রেকর্ড ছুঁয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের হিসাবে, কলকাতার অবদানই এই ব্যবসার প্রায় ৬৫-৭০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৪২ হাজার কোটি রুপি বেশি। বাকি অংশ রাজ্যের অন্যান্য জেলায় ছড়িয়ে রয়েছে। বৃষ্টির ধাক্কা সামলেও দুর্গাপুজো-কেন্দ্রিক এই বিপুল আর্থিক লেনদেন রাজ্যের অর্থনীতিতে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
দুর্গাপুজো এখন আর কেবল ধর্মীয় উৎসব নয়—এটি একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক চক্রে পরিণত হয়েছে। প্যান্ডেল, আলোকসজ্জা, প্রতিমা নির্মাণ, ফ্যাশন, রেস্তোরাঁ, পর্যটন, ই-কমার্স, পরিবহন—সব ক্ষেত্রেই হয়েছে ব্যাপক কেনাবেচা।
কলকাতার বড় শপিং মলগুলোতে ব্যবসা বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ। আটটি প্রধান শপিং মলে মোট বিক্রি প্রায় ৯০০ কোটি রুপি। রেস্তোরাঁ, ফুড কোর্ট ও হোটেল খাতে আয় দাঁড়িয়েছে ১,২০০-১,৫০০ কোটি রুপির মধ্যে, যার ৬০ শতাংশই কলকাতায়। প্রায় ২,৫০০টি পুজো কমিটি মিলে প্রতিমা, আলোকসজ্জা ও প্যান্ডেল নির্মাণে খরচ করেছে ২০০ কোটিরও বেশি। হস্তশিল্প, পোশাক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ক্ষেত্রেও পুজোকে ঘিরে উৎপাদন ও বিক্রি বেড়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্গাপুজো-নির্ভর অর্থনীতি রাজ্যের মোট জিডিপির প্রায় ৪ শতাংশ জুড়ে আছে। কলকাতার অবদান প্রায় ২ দশমিক ৬ শতাংশ, বাকি অংশ রাজ্যের অন্যান্য অঞ্চল থেকে আসে। এই উৎসবেই রাজ্যজুড়ে কয়েক লাখ অস্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি হয়।
তীব্র বৃষ্টি, নিম্নচাপ ও নতুন জিএসটির নীতির অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও ক্রেতাদের আগ্রহে ঘাটতি দেখা যায়নি। তবে শহরের বাইরে কিছু খুচরা বাজারে বিক্রির হার কিছুটা কমেছে। যেমন- গড়িয়াহাট, হাতিবাগান ও নিউ মার্কেটে বিক্রির পরিমাণ আগের তুলনায় কম বলে জানাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
অর্থনীতিবিদদের বক্তব্য, বড় শপিং মল ও অনলাইন বাজারের দাপটে ছোট ব্যবসায়ীরা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তবুও সামগ্রিকভাবে বাজারে যে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা গেছে, তা আগামী দিনের জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দুর্গাপুজোর এই বিপুল অর্থনীতি যদি তথ্যভিত্তিক ও পরিকল্পিতভাবে ব্যবস্থাপনা করা যায়, তবে এটি রাজ্যের উন্নয়নের অন্যতম চালিকা শক্তি হতে পারে। ডিজিটাল লেনদেন, পরিবেশবান্ধব প্যান্ডেল নির্মাণ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সহায়তা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলে আগামী বছরগুলোতে পুজো-অর্থনীতি আরও সম্প্রসারিত হবে বলেই আশা।