দুর্ঘটনায় মা হারানো শিশুটির কান্না থামছে না

দুর্ঘটনায় মা হারানো শিশুটির কান্না থামছে না

‘রাতে হঠাৎ ঘুমঘুম চোখে কান্না শুরু করে। একবার কান্না শুরু হলে তা আর থামতেই চায় না। তখন মাঝরাতে তাকে বাইরে নিয়ে হাঁটাহাঁটি করতে হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত না ঘুমায়, ততক্ষণ নিজের সঙ্গে রাখতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে কোনোরকমে মাকে ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করি। তবে কান্না থামাতে পারছি না।’

কথাগুলো বলছিলেন এক বছরের শিশু সাফওয়ান ইসলামের বাবা মো. ইমন ইসলাম। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে সীতাকুণ্ড পৌর সদরের মৌলভীপাড়া এলাকায় রেললাইনে বিকল হয়ে পড়া একটি সিএনজি অটোরিকশাকে ধাক্কা দেয় একটি ট্রেন। এ সময় শিশু সাফওয়ানের মা সানজিদা সুলতানা (২৫) ও নানি মাহমুদা বেগমের (৪৫) মৃত্যু হয়। এর পর থেকে সাফওয়ানকে সারাক্ষণ নিজের কাছে রাখছেন তার বাবা ইমন।

ইমনের বাড়ি সীতাকুণ্ড উপজেলার কুমিরা ইউনিয়নের ঘাটগড় এলাকায়। তিনি একটি রড তৈরির কারখানায় ট্রান্সপোর্ট সুপারভাইজার হিসেবে কর্মরত। যে জায়গাটিতে দুর্ঘটনা হয়েছিল তা ইমনের শ্বশুরবাড়ি থেকে মাত্র চার শ গজ দূরে। পুলিশ জানায়, রেলক্রসিংটি অবৈধ। ঘটনার দিন সেখানে কোনো গেটম্যানও ছিল না।

গতকাল শনিবার বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, ইমনের বাড়িতে স্বজনদের ভিড়। এক পাশে ছেলে সাফওয়ানকে কোলে নিয়ে বসে আছেন তিনি। অনেকেই ছেলের এ অবস্থা দেখে ইমনকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিচ্ছেন। সাফওয়ান চোখ মেলে আশপাশে তাকিয়ে দেখছে। আর কিছুক্ষণ পরপরই কান্না করছে।

ইমন প্রথম আলোকে বলেন, মা মারা যাওয়ার দিন বাড়িতে অনেক লোকের ভিড় থাকায় সাফওয়ান তেমন কান্না করেনি। তবে রাত হতেই মাকে না পেয়ে কান্না শুরু করে। এর পর থেকে প্রতি রাতেই কান্না করে। দিনের বেলায় বাড়িতে মানুষের ভিড় থাকায় তেমন কান্না করে না। তবে যখন বুকের দুধ খাওয়ার সময় হয়, তখন আর কান্না থামিয়ে রাখা যায় না।

ইমন ইসলাম আর সানজিদা সুলতানার বিয়ে হয়েছিল ২০২৩ সালের ২৩ আগস্ট। পরের বছর ১৭ সেপ্টেম্বর সাফওয়ানের জন্ম। কিছুদিন আগে সাফওয়ানের প্রথম জন্মদিন উপলক্ষে বাড়িতে উৎসব হয়েছিল। আনন্দে মেতেছিলেন সবাই। সেই স্মৃতি মনে করে ইমন বলেন, ‘আমরা কত আনন্দ করে ছেলের জন্মদিন পালন করেছি।  অথচ এক মাস না যেতেই আমার ছেলেটি তার মাকে হারাল। গোছানো সংসারটা যেন তছনছ হয়ে গেল।’

দুর্ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ইমন বলেন, ঘটনার দিন তিনি তাঁর স্ত্রী এক আত্মীয়ের লাশ দেখতে গিয়েছিলেন। সেখানে তাঁর স্ত্রীর মা–বাবা ও ভাইও এসেছিলেন। জানাজার পর সানজিদা বাবার বাড়িতে দুদিন থাকার আবদার করেন। তিনি সম্মতি দিয়ে তাঁদের যাওয়ার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ঠিক করে দেন। এরপর বাসে উঠে নিজের বাড়িতে চলে আসেন। বাড়িতে আসতেই মুঠোফোনে দুর্ঘটনার বিষয়ে জানতে পারেন।

ছেলে সাফওয়ান আধো আধো মা, বাবা, মামা ডাকতে পারে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে ইমন বলেন, ‘আমার স্ত্রী মৃত্যুর আগে মা ডাক শুনে গেছে। সাফওয়ান এখন আধো আধো কথা বলে—কখনো মা ডাকে, কখনো বাবা। সে জানেই না, তার মা আর বেঁচে নেই।’দুর্ঘটনার দিন সানজিদার সঙ্গে তাঁর ভাই ইমাম হাসানও ছিলেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বৃষ্টি থাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি পর্দা দিয়ে ঢাকা ছিল। এ কারণে ট্রেন আসছে এমন কিছু বোঝা যায়নি। ক্রসিং পার হওয়ার সময় ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। চালক স্টার্ট দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। একপর্যায়ে পর্দার ফাঁক দিয়ে দেখেন ট্রেন প্রায় কাছে চলে এসেছে। এরপর ভাগনে সাফওয়ানকে নিয়ে তিনি নেমে যান। মা ও বোন নামার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।

যে জায়গায় সিএনজিচালিত অটোরিকশাটির দুর্ঘটনা হয়েছিল সে রেলক্রসিংটি অবৈধ। ফলে সেখানে কোনো গেটম্যান ছিল না। দুর্ঘটনার পরে ক্রসিংটির উভয় পাশের দুটি গাছে নোটিশ টানিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। নোটিশে লেখা—‘রেললাইনের ওপর দিয়ে কোনো প্রকার যান চলাচল নিষেধ’।

স্থানীয় বাসিন্দা সোহরাব হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনার পরদিন শুক্রবার রেলওয়ের লোকজন এসে পশ্চিম পাশের একটি খুঁটিতে এবং পূর্বপাশের একটি গাছের মধ্যে এই নোটিশ টানিয়ে দিয়ে যায়। এরপর থেকে কেউ আর এই রেলক্রসিংয়ে আসেনি। রেললাইনের উভয় পাশে অনেক ঘরবাড়ি রয়েছে। ক্রসিংটি বৈধ করে সেখানে গেটম্যান নিয়োগ দেওয়া উচিত।

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে সীতাকুণ্ড পৌর সদরের মৌলভীপাড়া এলাকায় রেললাইনে বিকল হয়ে পড়া একটি সিএনজি অটোরিকশাকে ধাক্কা দেয় একটি ট্রেন। এ সময় শিশু সাফওয়ানের মা সানজিদা সুলতানা (২৫) ও নানি মাহমুদা বেগমের (৪৫) মৃত্যু হয়। এর পর থেকে সাফওয়ানকে সারাক্ষণ নিজের কাছে রাখছেন তার বাবা ইমন।

Comments

0 total

Be the first to comment.

গাজীপুরে নারীকে উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় সাংবাদিকসহ ৪ জনকে মারধর Prothomalo | জেলা

গাজীপুরে নারীকে উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় সাংবাদিকসহ ৪ জনকে মারধর

গাজীপুরের কাশিমপুরে এক নারীকে উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় সাভারে কর্মরত বেসরকারি ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন...

Sep 24, 2025

More from this User

View all posts by admin