এ প্রাণ সঁপে দিই শোকাতুর বিজয়ীদের−প্রিয়জনদের হত্যা করা হলেওযারা রক্ষা করে যাচ্ছিল বাকিদের। পায়ের তলার এক বিঘত মাটিতেইরক্ষা করে যাচ্ছিল মানসিক ভারসাম্য ওদুনিয়ার বুকে ইনসাফের পূর্ণ মর্ম, রক্ষা করে যাচ্ছিল সব মানুষকেইএমনকি বেকার ক্রীতদাসদেরও; যুদ্ধ আমাদের শেখায়, ডাক দিয়ে যায়−যোদ্ধারা বেঁচে যায়তবে মারা পড়ে তাদের ঘরের লোকজনহ্যাঁ, এটিই খোদার বিধান, তবেঅনেক সময় সবাই বেঁচে যায়−সবাই যোদ্ধা হলে। এ প্রাণ সঁপে দিই মুখোশের আড়ালের বীরদেরনিচ থেকে ওপরের দিকে উড়ে যাওয়ামোনাজাতের মতো করে যারা অস্ত্র চালনা করেইতিহাসের সেই মুহূর্তের মতো, যখন তর্জনী উঁচিয়ে ঘোষিত হয়যেভাবে ইচ্ছা অবরোধ করো আমাদের, রুটি ও ইতিহাস এখানে, এই অবরোধের তলেই রচিত হয়। এ প্রাণ সঁপে দিই এ-ঘর ও-ঘর করা সুড়ঙ্গ-সূর্যালোকেজালিমদের বিমান হামলায় ধ্বংস হওয়া ভোরের বদলেযেখানে হাতবদল হয় এক রাঙা প্রভাতের
এ প্রাণ সঁপে দিই ফসফরাস বোমায় ভরা আকাশেএ যেন হাজার হাজার বেণি করা ডাইনির সাদা চুলধেয়ে আসে পৃথিবীর দিকে হাজার হাজার সাপজীর্ণ ঘরের মতো ভেঙে পড়তে চায় আকাশ, এ ভেঙে পড়া রুখতেই তো হাত তুলি আমরাভালো মানুষেরা হাত না দিলে যে তা ভেঙে পড়বেই!হে গাজাবাসী, এরপর তোমাদের কী–ই বা করার আছে?খোদার কসম, তোমরা না থাকলে দুনিয়াকে আগলে রাখা এ আকাশই থাকত না! এ প্রাণ সঁপে দিই ‘বালাদিল আমিন’ (নিরাপদ জনপদ)-এর জয়তুনের ডালে−পথে জলাশয় দেখলে যেমন বৃদ্ধ কাপড় গুটিয়ে নেয়, তেমনি তাওনিজের ছায়া গুটিয়ে নেয়, যেন নিচ দিয়ে কোনো হানাদার যেতে না পারেএবং বলে−তাদের ট্যাংকগুলো যদি শহরের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় আমাকে গুঁড়িয়েও দেয়, ন্যূনতম কোনো আফসোস নেই; কারণ আমার ছায়া যে মাড়াতে পারেনি ওরা!এ এক অখণ্ডিত বচন−অতীতে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যোদ্ধারা জেনে আসছেএ তো পুণ্যভূমি শামমমম!এখানে কীভাবে জয়তুন বৃক্ষের সঙ্গে শত্রুতা করে বেড়ে উঠবে একটি রাষ্ট্র, হে বোকার দল? তবে তোমাদের অজুহাত তো থাকবেই, তোমরা তো একালেরই হানাদার; আমার বার্ধক্যের কসম, তোমাদের অবস্থান দীর্ঘ হবে না মোটেওকারণ, ছায়া চায় না, তোমরা তার নিচ দিয়ে চলোমাটিও চায় না, তোমরা তাকে মাড়াওতাই তো আল্লাহ তোমাদের অনেক আগেই আমাদের দেশের ‘আবিরিন’ (পথিক) বলে সম্বোধন করেছেন।
এ প্রাণ সঁপে দিই উদ্ধারকর্মীদেরকখনো মাথা না নোয়ালেও তারা ধ্বংসস্তূপে মাথা নোয়ায়ঘর থেকে ঘরে ছুটে যায় আর্তনাদের খোঁজেযেখানে আর্তনাদ মানেই জীবনের ঘ্রাণসেই আর্তনাদও বিরলযেখানে জীবন সত্য−ধুলায় ভেসে ওঠা আংটির মতো রূপকথা নয়তারা কান পেতে রাখে বোমার তলেএকবার আড়ালে যায় তো ফের দৃশ্যমান হয়ধ্বংসস্তূপ খোড়েকেউ নেই সেখানেওই যে ওখানে হাত বা এর মতো কী যেন দেখা যায়! মরদেহ বের করেধ্বংসস্তূপ ও মানুষের রঙের মিল থাকা সত্ত্বেওপ্রলাপের মতোবিস্মৃত এক জাতি বেরিয়ে আসে; লাশগুলোর কথা মনে রেখো, হে সময়!ওখানে, দ্বিতীয় তলায় সাতজনঘরের দরজায় পড়ে আছে আটজনমা-মরা চার শিশুর দিন যাচ্ছেপানিহীন, আশ্রয়হীননির্বাক, উপায়হীনকোনো দাবিহীনমান্না-সালওয়ার রবের কাছে; মৃত্যুকে বলো, ওগো, প্রস্তূত হওখোদার কসম, তোমাদের কাছে তারা শিশু হয়ে ফিরবে নাবরং ফিরবে বুড়োদের মতো অভিজ্ঞতা, তিক্ততাসহতোমরা আত্মরক্ষার উপকরণ প্রস্তূত রেখো, কারণ, বিচারকেরাতাদের বিচারকার্যে বদ্ধপরিকর; তারা আসবে তোমাদের কাছে ক্রোধ ও প্রশ্ন নিয়ে। এ প্রাণ, আমার এ প্রাণ সঁপে দিই সেই পরিবারে−যেখানে সৈন্যরা নারী, পুরুষ ও শিশুদের একটি কক্ষে জড়ো করে বলে,−‘তোমরা আমাদের ক্ষতি থেকে নিরাপদ এখানে;’ এরপর চলে যায়এবং তাদেরই এক অফিসার দূর থেকে সেই ঘরে বোমা ফেলার নির্দেশ দেয়এরপর দুটি বুলডোজার পাঠায়, বাকিটা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতেপ্রথম আঘাতে কোনো শিশু মারা না–ও যেতে পারে বলেএরপর সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যান পাঠায় ধীরে ধীরে সবার দেহ মাড়াতেএকটাই চাওয়া, সৈনিক যেন সবার মৃত্যু নিশ্চিত করে;হয়তো তারা বেঁচে আছে−রাতে বিড়বিড় করে এবংআবার ফিরে এসে সেই একই ঘরে বোমা ফেলেনিজেকে প্রবোধ দেয়, মরেছে, সম্ভাব্য সব উপায়েই মরেছে!নিজেকে জিজ্ঞেস করে, তবেআমি কি তাদের আগেও হত্যা করিনি? ষাট বছর ধরে? একইভাবে? একই ধাপগুলো পেরিয়ে? আমার মনে হয় না তারা মরেছে, এরপর মৃতদেহগুলোর বিরুদ্ধে লড়তেসে বিমানবাহিনীর কাছে আরেকটি হামলার অনুরোধ করেক্যামেরার লেন্সে হাসিমুখে বিজয় চিহ্ন দেখায়তৃপ্তমনে ফিরে আসে আর ভাবেধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উঠে এসে কোনো শিশু তাকে বিরক্ত করবে না আরতবুও রাতভর ঘুমোতে পারে না সে,কারণ, তাদের ফিরে আসার সম্ভাবনা যে এখনো রয়ে গেছে! তাই হরেক রকম বোমা মেরে ধ্বংসস্তূপ ও বাসিন্দাদের চোখ ঝলসিয়েরাতের আকাশ আলোকিত করে (নারী পাইলটকে) জিজ্ঞেস করে−কী দেখছ এবং কী শুনছ? সে জবাব দেয়,‘আমি কেবল উন্মত্ত খুনি ও নিথর দেহগুলো দেখতে পাচ্ছি।’
এ প্রাণ সঁপে দিই ক্ষুৎপিপাসায় কাতর বিনিদ্র শিশুদেরচারপাশে যাদের অভাব নেই উদরপূর্তিতে মত্ত প্রিয়জনেরনীলনদ, উপত্যকাসহ আশপাশের সবকিছুর একচ্ছত্র অধিপতি তারাপাকা চুল, রং মাখে তাতে, যেন বাঁচবে অনেক দিন; কোথা থেকে আসে তোমাদের চিরকাল বেঁচে থাকার এ অনুভূতি? কসম, আমি কখনোই কারও ভরসা পাইনিযেভাবে ইচ্ছা ফুর্তি করে নাও আজ বা কালতবে কেবল তোমাদের মর্যাদা ও অবস্থার দিকে তাকিয়েএকটি সত্য কথা বলি−কাল টিভির পর্দায় হাঁটলে, মাথা নত করেই হেঁটো।এ প্রাণ সঁপে দিই চিরনিদ্রায় শায়িত শিশুদের−হাসপাতালের করিডরে, ঠান্ডা মেঝেতে, বিছানাহীন, পাঁচ-ছয়জন গাদাগাদি করেরক্তমাখা পশমের কম্বলে কাফন পরে আছে;শত্রুকে বলো, তোমাকে এখনো বোকাই মনে হয় আমারএখন হলেও তোমার দাবি নিয়ে আলোচনায় বসোতাকে যুদ্ধ বন্ধের অনুরোধ করো,ওগো পাখির বাসা কিংবা সুরমাঠাসা চোখে আক্রমণকারীদের কমান্ডারঅনেক বছর ধরে জানি,−তুমি জীবিত শিশুকে ভয় পাওয়া নাতবে তোমাকে আন্তরিক অনুরোধ করছি,মৃত শিশুদের তো অন্তত ভয় পাও!
তামিম আল-বারঘৌথি হাল জমানার অন্যতম জনপ্রিয় আরবি কবি। বাবা মুরিদ আল-বারঘৌথি ফিলিস্তিনি কবি এবং মা রাদওয়া আশুর মিসরি ঔপন্যাসিক। জন্ম কায়রোয়, ১৯৭৭ সালের ১৩ জুন। পড়াশোনা মিসর ও যুক্তরাষ্ট্রে। বোস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিএইচডি করেন। অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব কায়রো, জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি, ওয়াশিংটন এবং ফ্রি ইউনিভার্সিটি, বার্লিনে। কাজ করেন জাতিসংঘের পরামর্শক হিসেবেও।
প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯৯৯ সালে, প্যালেস্টাইনিয়ান হাউস অব পোয়েট্রি থেকে। ফিলিস্তিনি ও মিসরি কথ্য ভাষায় কবিতা রচনা করেও সুনাম কুড়ান। এ পর্যন্ত তাঁর ছয়টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ২০০৭ সালে আবুধাবির আমিরাতি টেলিভিশন আয়োজিত কবিতা প্রতিযোগিতায় ‘প্রিন্স অব পোয়েট’ পুরস্কার লাভ করেন। ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের বিরোধিতা করায় ২০০৩ সালে তাঁকে মিসর ত্যাগ করতে হয়। পরে অবশ্য সেই নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেয় সরকার।
আরব বসন্তে তাঁর দুর্দান্ত সব জাগরণী কবিতা বিপ্লবীদের পথ দেখায়। দরাজ কণ্ঠে নিজের কবিতা আবৃত্তিতে তামিমের জুড়ি নেই। পিতৃভূমি ফিলিস্তিনের পুরো ভূখণ্ডই একদিন মুক্ত হবে, এ বিশ্বাস মনেপ্রাণে লালন করেন এবং প্রতিনিয়ত প্রতিরোধ যোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ করেন। নিচে অনূদিত কবিতাটি ২০০৯ সালের শুরুর দিকে রচিত হলেও আজও সমান আবেদনময় ও প্রাসঙ্গিক। সম্প্রতি ফিলিস্তিন প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসের মুখপাত্র আবু ওবায়দাকেও এ কবিতা থেকে উদ্ধৃতি টানতে দেখা গেছে।
• ভূুমিকা ও অনুবাদ: ইজাজুল হক