সার্চ ইঞ্জিন, মোবাইল অ্যাপ, স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে চাকরির আবেদন—প্রায় সবখানেই এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহৃত হচ্ছে। গুগলের এআই ওভারভিউ ফিচার অনেকেরই এখন বিরক্তির কারণ। ডিজিটাল দুনিয়ায় এমনভাবে ছড়িয়ে পড়া এই প্রযুক্তি চাইলে কি এড়ানো সম্ভব?
মজার ব্যাপার, কেউ যদি সার্চ বারে অশালীন শব্দসহ প্রশ্ন করে—তাহলে গুগল সরাসরি ওয়েবসাইটের লিংক দেখায়, এআই ওভারভিউ আর আসে না। এটা এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ আলোচনায়।
এআই নীতিমালা বিশেষজ্ঞ ড. কোবি লেইন্স এক অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন। তিনি জানান, সন্তানকে ডাক্তার দেখাতে গিয়ে বলেন যেন কথোপকথন রেকর্ডে কোনও এআই ট্রান্সক্রিপশন সফটওয়্যার ব্যবহার না করা হয়। কিন্তু চিকিৎসক জানান, সময়ের অভাবে সেটি বন্ধ করা সম্ভব নয়—তাকে অন্য কোথাও যেতে হবে।
লেইন্স বলেন, ব্যক্তিগতভাবে প্রতিরোধ করা কঠিন। শিল্পখাতের চাপ এত বেশি যে প্রায় সব ক্ষেত্রেই এআই ব্যবহারের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
চ্যাটজিপিটি, গুগল জেমিনি সবই এআই চালিত টুল। মোবাইল ফোন, সোশ্যাল মিডিয়া, নেভিগেশন অ্যাপ, ব্যাংকিং সিস্টেম, কাস্টমার সার্ভিস, এমনকি প্রেম খোঁজার ডেটিং অ্যাপেও এখন এআই কাজ করছে।এটি চাকরির আবেদন বাছাই, ভাড়ার আবেদন যাচাই, এমনকি আদালতের মামলা বিশ্লেষণেও ব্যবহৃত হচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতে এটি ডাক্তারদের প্রশাসনিক কাজ সহজ করছে এবং রোগ নির্ণয়ে সহায়তা দিচ্ছে।
মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, অর্ধেক অস্ট্রেলিয়ান নিয়মিত বা মাঝেমধ্যে এআই ব্যবহার করেন, তবে মাত্র ৩৬ শতাংশ মানুষ এআইকে বিশ্বাস করেন।
ঝুঁকি কতটা?
এআই-এর সম্ভাব্য ১,৬০০ ধরনের ঝুঁকি নথিভুক্ত করেছে এমআইটি’র এআই রিস্ক ডেটাবেইজ। সেখানে উল্লেখ রয়েছে—এআই কখনও মানবিক লক্ষ্যবস্তুর সঙ্গে সাংঘর্ষিক উদ্দেশ্য গ্রহণ করতে পারে বা বিপজ্জনক ক্ষমতা অর্জন করতে পারে।
দাতব্য সংস্থা গুড অ্যানচেস্টরস এর প্রধান গ্রেগ সেডলার বলেন, যখন আউটপুটে বিশ্বাস করা যায় না বা গোপন তথ্যের আশঙ্কা থাকে, তখনই এআই এড়ানো উচিত।
পরিবেশগত ক্ষতিও বাড়াচ্ছে এআই
গুগলের কার্বন নিঃসরণ ৫১ শতাংশ বেড়েছে—মূলত এআই ডেটাসেন্টারের বিদ্যুৎ খরচের কারণে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ডেটাসেন্টারগুলো বিশ্বব্যাপী মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪.৫ শতাংশ ব্যবহার করবে।
কিভাবে এড়াবেন এআই?
বিভিন্ন ব্রাউজার এক্সটেনশন আছে যা এআই কনটেন্ট বা ছবি ব্লক করতে পারে। অনেক চ্যাটবটের ক্ষেত্রে বারবার ‘স্পিক টু হিউম্যান’ বা ‘আর্জেন্ট’, ‘ইমার্জেন্সি’ বললে মানব প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাওয়া যায়।
তবে পুরোপুরি এআইমুক্ত জীবন যাপন প্রায় অসম্ভব। আরএমআইটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জেমস জিন ক্যাং বলেন, এটা এখন এত গভীরভাবে প্রযুক্তির ভেতরে মিশে গেছে যে একে ‘বন্ধ’ করার মতো কোনো সুইচ নেই।
ভবিষ্যতের এআই
বিশ্বজুড়ে সরকারগুলো এখনও এআই নীতিমালা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ান সরকারকে চাপের মুখে পড়তে হয়েছে—বিশেষ করে সাংবাদিকতা ও বইয়ের কনটেন্ট এআই ট্রেনিংয়ে ব্যবহারের নিয়ম নিয়ে।
‘দ্য কনভার্সেশন’-এর এক বিশ্লেষণে পাঁচজন বিশেষজ্ঞের মধ্যে তিনজনই বলেছেন, এআই এখনই কোনও অস্তিত্বগত হুমকি নয়।
কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটির অ্যারন স্নোসওয়েল বলেন, ঝুঁকি এআই খুব বুদ্ধিমান হয়ে যাওয়া নয়, বরং মানুষ কীভাবে এটিকে ব্যবহার করছে সেটাই আসল বিষয়।
অন্যদিকে টরেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সেয়েদালি মিরজালিলি বলেন, আমি বরং বেশি ভয় পাই মানুষ এআইকে সামরিকভাবে ব্যবহার করে সভ্যতা ধ্বংস করবে—এআই নিজে নয়।
‘হাইপ নয়, বাস্তবতা দেখুন’
ড. লেইন্সের মতে, যেখানে যুক্তিসঙ্গত, সেখানে এআই ব্যবহার করি। কিন্তু আমি জানি এর পরিবেশগত প্রভাব কী, আর আমি নিজে লিখতে ভালোবাসি। এআই আমাদের সময় বাঁচায়, কিন্তু ভাবনাচিন্তা করার ক্ষমতাও কমিয়ে দিতে পারে।
তিনি যোগ করেন, আমরা মানুষ হিসেবে যথেষ্ট বুদ্ধিমান—একই সঙ্গে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলো বোঝার ক্ষমতা আমাদের আছে। বিষয়টা হলো ভারসাম্য রক্ষা করা, না হাইপে গা ভাসানো, না আতঙ্কে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান