“একসময় প্রত্যেকে নিজ দলের সদস্যদের সঙ্গে বসে থাকতেন, কিন্তু চার মাসের ট্রেনিং কোর্সে অংশ নিয়ে তারা এখন এক টেবিলে বসেন। একসঙ্গে মানুষের জীবন, রাজনীতি ও নতুন সমাজ নির্মাণের স্বপ্ন দেখছেন। কীভাবে ঐক্যবদ্ধ উপায়ে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে, এখন এ বিষয়ে তরুণ নেতারা সক্রিয়ভাবে ভাবছেন।”
কথাগুলো বলছিলেন ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের সিনিয়র ডিরেক্টর লিপিকা বিশ্বাস।
চারমাস ট্রেনিংয়ের পর বুধবার (২৯ অক্টোবর) বিএনপি, এনসিপি, গণসংহতি আন্দোলন ও গণঅধিকার পরিষদ ও ছাত্র ইউনিয়নের তরুণ নেতাদের নিয়ে ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল আয়োজিত ‘ইয়ং লিডারশিপ ফেলোশিপ প্রোগাম’ এর সমাপনী দিনে তিনি এসব কথা বলেন।
লিপিকা বিশ্বাস বলেন, “শুরুর দিকে প্রত্যেকে তার নিজ দলের হয়ে ভাগ হয়ে বসেছে, কিন্তু ট্রেনিং শুরুর পরই নিজেদের মধ্যে বন্ধুত্ব সৃষ্টি হয়েছে। এই চার মাসব্যাপী ট্রেনিংয়ের মধ্য দিয়ে চার দল ও একটি সংগঠনের ২৫ জন তরুণ নেতার মধ্যে অনন্য সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে।”
সেমিনারে অংশ নেওয়া ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতা আনিকা আনজুম অর্নি বলেন, “আমি ১১-১২ বছর ধরে বামপন্থি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত আছি। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে শুধু দ্বন্দ্ব নয়, একসঙ্গে কাজ করাও সম্ভব। এই ট্রেনিং দিয়ে আমরা এটা শিখেছি।”
বাংলাদেশ ছাত্র শক্তির নেতা ইমন দ্দোজা আহমদ বলেন, “আমরা আলাদা আলাদা বসতাম, দলমত ভিন্ন হতে পারে। সবাই একসঙ্গে মিলে কাজ করি, তাহলে সুন্দর দেশ করতে পারি।”
সমাপনী অনুষ্ঠানে ছাত্রদল, গণসংহতি আন্দোলনের নেতারাও বক্তব্য দেন।
সেমিনারে অংশগ্রহণকারীরা জানান, ট্রেনিংয়ের সময় বিভিন্ন মিলনায়তনের শৌচাগার সমস্যা সমাধান, সংস্কার; বিভিন্ন জেলার হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত; খেলার মাঠ উদ্ধার; ফার্স্ট এইড কর্নারসহ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন তরুণ নেতারা। সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রশিক্ষণার্থীরা স্লাইডে এসব উদ্যোগের বিষয়ে ব্রিফ করেন।
২৫ তরুণ নেতাদের মতবিনিময়ের পর সেমিনারে কথা বলেন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সুলতান মুহাম্মদ জাকারিয়া, গণসংহতি আন্দোলনের নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান রুবেল, গণঅধিকার পরিষদের স্থায়ী কমিটির সদস্য খালেদ হোসাইন, জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে প্রশিক্ষণার্থীদের সার্টিফিকেট, ক্রেস্ট তুলে দেন সিনিয়র রাজনীতিকরা।
আয়োজকরা জানান, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও আরও বিভিন্ন বিষয়ে দেশে চলমান রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যেও রাজনৈতিক ঐক্যের এক ব্যতিক্রমী চিত্র দেখা গেছে ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল আয়োজিত এই ইয়াং লিডারস ফেলোশিপ প্রোগ্রামে।
চারটি প্রধান রাজনৈতিক দলের ২৫ জন তরুণ রাজনীতিবিদ এই প্রোগ্রামের আওতায় গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করেছেন। যা রাজনৈতিক সম্প্রীতি ও সহনশীলতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বলে উল্লেখ করেছেন আয়োজকরা।
আয়োজকরা জানান, এফসিডিও’র আর্থিক সহায়তায় ‘বি-স্পেস’ প্রজেক্টের আওতায় উদীয়মান তরুণ রাজনীতিবিদদের নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক দক্ষতা বৃদ্ধি, রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের মধ্যে পেশাগত সম্পর্ক তৈরি ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে এই ফেলোশিপের আয়োজন করে যাচ্ছে ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল।
এবার ফেলোশিপ প্রেগ্রামের ২৫তম ব্যাচের ফেলোরা রাজনৈতিক সম্প্রীতি, সৎ ও দক্ষ নেতৃত্ব, গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলসমূহের ভূমিকা, দলীয় অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, ক্যাম্পেইন ম্যানেজমেন্ট, ভোটদান প্রক্রিয়া এবং রাজনীতিতে নারীদের অন্তর্ভুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে নিবিড় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। সেইসঙ্গে তারা জেলা ও মহানগর পর্যায়ে স্থানীয় সমস্যা সমাধানে একসঙ্গে কাজও করেছেন। তারা সংলাপ, প্রেস কনফারেন্স, প্রশাসনকে স্মারকলিপি প্রদানসহ বিভিন্ন যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।
সমাপনী অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন- মাল্টিপার্টি অ্যাডভোকেসি ফেরামের ঢাকার মুখপাত্র ও জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সাধারণ সম্পাদক শাহিনুর নার্গিস, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের মুখ্য পরিচালক ড. মো. আব্দুল আলীম, সিনিয়র ডিরেক্টর লিপিকা বিশ্বাস ও প্রোগ্রাম অফিসার রামিসা করিম।
অনুষ্ঠানে ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের চিফ অব পার্টি ক্যাথেরিন সেসিল গ্রাজুয়েটদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, “এই ফেলোশিপ থেকে যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা আপনারা অর্জন করলেন, তা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
অনুষ্ঠানে সমাপনী বক্তব্য দেন সংস্থাটির ডেপুটি চিফ অব পার্টি আমিনুল এহসান।
প্রসঙ্গত, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের এই ফেলোশিপের আওতায় দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ৫৮৭ জন তরুণ নেতা ২৫টি ব্যাচে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করেছেন। তাদের মধ্যে ৩২৫ জন পুরুষ ও ২৬২ জন নারী ফেলো। এই ফেলোশিপ প্রোগ্রাম ইতোমধ্যে বাংলাদেশের তরুণ রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে বেশ পরিচিত ও আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে।