গাজা যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে মিসরের শার্ম আল-শেখে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনার তৃতীয় দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীরা যোগ দিয়েছেন। বুধবার তারা এই আলোচনায় যোগ দেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই বৈঠককে যুদ্ধ সমাপ্তির পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ খবর জানিয়েছে।
ট্রাম্পের উপদেষ্টা ও জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ বুধবার সকালে শার্ম আল-শেখে পৌঁছান। তাদের সঙ্গে ছিলেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানি ও তুরস্কের গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ইব্রাহিম কালিন।
মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি এই সফরকে ‘অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, তারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছ থেকে শক্তিশালী বার্তা ও পূর্ণ ক্ষমতা নিয়ে এসেছেন যুদ্ধ শেষ করতে।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ইসরায়েলের কৌশলবিষয়ক মন্ত্রী রন ডার্মার বিকালে আলোচনায় যোগ দেন বলে জানা গেছে। হামাসের পাশাপাশি ইসলামি জিহাদ ও পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব প্যালেস্টাইন (পিএফএলপি)-এর প্রতিনিধিরাও বৈঠকে অংশ নিয়েছেন।
বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এক সিনিয়র হামাস কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা আলোচনায় প্রয়োজনীয় ইতিবাচকতা দেখিয়েছেন এবং বন্দি বিনিময়ের জন্য একটি তালিকা জমা দিয়েছেন। তালিকায় রয়েছেন ইসরায়েলে কারাবন্দি ফিলিস্তিনি নেতারা মারওয়ান বারঘুতি ও আহমাদ সা’দাত।
বারঘুতি ২০০৪ সালে পাঁচজন বেসামরিক নাগরিক হত্যার পরিকল্পনার দায়ে পাঁচটি যাবজ্জীবন ও ৪০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। সা’দাত ২০০১ সালে এক ইসরায়েলি মন্ত্রী হত্যার অভিযোগে ৩০ বছরের দণ্ডে দণ্ডিত হন।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ জানিয়েছে, আলোচনা অগ্রগতির উচ্চ সম্ভাবনা রয়েছে এবং কয়েক দিনের মধ্যেই একটি চুক্তি হতে পারে। অন্যদিকে ইয়েদিওথ আহরোনথ সূত্র জানিয়েছে, ইসরায়েল সতর্ক আশাবাদী অবস্থান নিয়েছে।
ট্রাম্প বলেছেন, আমরা কিছু বাস্তব অগ্রগতি দেখতে পারি। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির সুযোগ তৈরি হয়েছে, শুধু গাজা নয়, এর বাইরেও।
তিনি আরও বলেন, যদি হামাস ও ইসরায়েল চুক্তিতে পৌঁছায়, যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত করবে যে সবাই যেন সেটি মেনে চলে।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান জানান, ট্রাম্প সম্প্রতি তাকে ফোন করে হামাসকে তার পরিকল্পনা মেনে নিতে রাজি করানোর অনুরোধ করেছেন। তবে তিনি সংসদে বলেন, শান্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে ইসরায়েলের গাজায় অব্যাহত হামলা।
এদিকে, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলি হামলায় অন্তত আটজন নিহত হয়েছেন। গত এক সপ্তাহে যা সর্বনিম্ন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েল আক্রমণের পর থেকে ইসরায়েলি অভিযানে এখন পর্যন্ত ৬৭ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২০ হাজারেরও বেশি শিশু।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, অপুষ্টিজনিত কারণে আরও অন্তত ৪৬০ জন মারা গেছেন, যার মধ্যে ১৮২ জনের মৃত্যু ঘটে আগস্টে গাজা সিটিতে দুর্ভিক্ষ ঘোষণার পর। যদিও ইসরায়েলি সরকার এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, তারা খাদ্য ও ত্রাণ সরবরাহে সহায়তা করছে।
প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু মঙ্গলবার যুদ্ধের দুই বছর পূর্তিতে দেওয়া এক ভাষণে বলেছেন, আমরা এখন নিয়তির মুহূর্তে আছি। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, ইসরায়েল যুদ্ধের সব লক্ষ্য অর্জন না করা পর্যন্ত লড়াই চলবে। লক্ষ্যগুলো হলো, সব জিম্মিকে ফেরত আনা, হামাস শাসন ধ্বংস করা এবং গাজাকে চিরতরে হুমকিমুক্ত করা।
অন্যদিকে, হামাসের প্রধান আলোচক খালিল আল-হাইয়া বলেছেন, তারা গুরুত্বপূর্ণ ও দায়িত্বশীলভাবে আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন। তবে যুদ্ধ সত্যিই শেষ করতে হলে ট্রাম্প ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে বাস্তব নিশ্চয়তা প্রয়োজন।