প্রায় দুবছর ধরে চলা ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের পর ইসরায়েল অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার সবচেয়ে জনবহুল এলাকা গাজা সিটিতে স্থল অভিযান শুরু করেছে। ইসরায়েলের দাবি, এই অভিযানের লক্ষ্য ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসকে সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করা। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, হামাসের বিস্তৃত সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক ও গেরিলা যুদ্ধের কৌশল ইসরায়েলের জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিতে পারে। তুরস্কের সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড এ খবর জানিয়েছে।
ভয়াবহ মানবিক সংকট ও আন্তর্জাতিক সমালোচনা
জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়েছে যে ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় ৬৫ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং ২ লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এর পাশাপাশি, ত্রাণ সরবরাহ বন্ধ করে গাজায় কৃত্রিমভাবে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করা হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইসরায়েল সফরকালে বলেছিলেন, গাজা যুদ্ধের সমাধান শুধু সামরিক পথেই সম্ভব, কূটনৈতিক উপায়ে নয়। তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পাশে দাঁড়িয়ে এই মন্তব্য করেন। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) নভেম্বরে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে।
jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68cc0dd64686b" ) );
হামাসের প্রতিরোধ ক্ষমতা ও ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ
গাজা সিটির স্থল অভিযান নিয়ে কিংস কলেজের অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ বলেন, এই অভিযান ইসরায়েলকে ভূখণ্ড দখল এবং হামাসের ব্যাপক ক্ষতি করার সুযোগ দেবে, কিন্তু এটি ইসরায়েলি নেতাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী যুদ্ধ শেষ করতে পারবে না।
তিনি বলেন, গাজা সিটি অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এবং সুরক্ষিত এলাকা, যা এটিকে যুদ্ধের জন্য সবচেয়ে কঠিন ক্ষেত্রগুলোর একটি করে তুলেছে।
তিনি আরও জানান, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ নিলেও হামাস যোদ্ধারা ভূগর্ভে বা বেসামরিক এলাকায় মিশে যেতে পারে।
ইস্তাম্বুল জাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইসলাম অ্যান্ড গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স-এর পরিচালক সামি আল আরিয়ান মনে করেন, ইসরায়েলের এই সামরিক অভিযান আবারও ব্যর্থ হবে। তিনি বলেন, জায়নবাদী শাসক তাদের লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সংকল্পকে দমাতে পারেনি।
jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68cc0dd64689d" ) );
যুদ্ধ নিয়ে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন
দীর্ঘদিন ধরে চলা যুদ্ধের কারণে ইসরায়েলের ভেতরেও নেতানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধে জনমত বাড়ছে। জিম্মিদের পরিবারগুলো ভয় পাচ্ছে যে গাজা সিটির অভিযান হামাসের হাতে জিম্মি তাদের প্রিয়জনদের জীবন কেড়ে নিতে পারে। ধারণা করা হয়, হামাস জিম্মিদের তাদের সুড়ঙ্গ ব্যবস্থায় আটকে রেখেছে।
কয়েকজন শীর্ষ ইসরায়েলি জেনারেলও নেতানিয়াহুর এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তারা মনে করেন, প্রায় দুবছর ধরে চলা যুদ্ধের পর ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী সেরা অবস্থায় নেই।
ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইউসেফ আলহেলু বলেছেন, ইসরায়েল গাজা সিটিকে ধ্বংস করতে চায় কারণ তারা এটিকে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের কেন্দ্র মনে করে। তিনি আরও বলেন, যদিও হামাসের শক্তি অনেকাংশে কমে গেছে, তবুও তারা ইসরায়েলের সঙ্গে গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রাখে।
jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68cc0dd6468cb" ) );
কেন থামছে না এই গণহত্যা?
বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান সমালোচনার পরও নেতানিয়াহু তার যুদ্ধ কৌশল থেকে সরে আসছেন না। কারণ তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অবিচল সমর্থন পাচ্ছেন। আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, ওয়াশিংটন অস্ত্র ও রাজনৈতিক সমর্থন দিয়ে ইসরায়েলকে সহায়তা করছে।
আঞ্চলিক দেশগুলোর যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টা তেমন কোনও সাফল্য দেখতে পায়নি। ১৫ সেপ্টেম্বর কাতারের রাজধানী দোহায় আরব লিগ ও অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি) এর বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে কাতারের প্রতি সংহতি প্রকাশ করা হলেও নেতানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধে কোনও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
ফিলিস্তিনি লেখক ও শিক্ষাবিদ আবির কপ্টি বলেন, পাশ্চাত্য এই গণহত্যার মদত দিচ্ছে কারণ ইসরায়েলের এই যুদ্ধের শুধু জায়নবাদী চরিত্রই নয়, একটি সাম্রাজ্যবাদী বৈশিষ্ট্যও আছে।
তিনি মনে করেন, ইসরায়েলের লক্ষ্য গাজাকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া। তিনি বলেন, তারা দশ লাখ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করতেও দ্বিধা করবে না এবং গাজা দখল করবে। বিশ্বকে এর জন্য জবাবদিহি করতে হবে, কারণ তারা এই গণহত্যাকে প্রায় ৭৩০ দিন ধরে চলতে দিয়েছে।