গাজায় তুরস্কের নতুন ভূমিকা: ত্রাণ সহায়তা, প্রভাব বিস্তার নাকি সামরিক উপস্থিতি?

গাজায় তুরস্কের নতুন ভূমিকা: ত্রাণ সহায়তা, প্রভাব বিস্তার নাকি সামরিক উপস্থিতি?

মধ্যপ্রাচ্যে গাজায় যুদ্ধবিরতিতে এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ানের নাম সামনে আসছে। সাম্প্রতিক বৈঠকগুলোয় ট্রাম্প প্রকাশ্যে এরদোয়ানকে ‘বিশ্বাসযোগ্য বন্ধু’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এতে তুরস্কের ভূমিকা নিয়ে কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।

গত ১৩ অক্টোবর মিসরের শারম আল শেখে অনুষ্ঠিত গাজা যুদ্ধবিরতি বৈঠকে এরদোয়ানকে ট্রাম্প সামনের সারিতে আসন দেন। মিসর ও কাতারের নেতাদের সঙ্গে তিনি যুদ্ধবিরতির পক্ষে বিবৃতিতেও স্বাক্ষর করেন। এ সময় ট্রাম্প বলেন, এরদোয়ান আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং তিনি গাজা সংকট নিরসনে গঠনমূলক ভূমিকা রাখছেন।

তবে এই অবস্থান ইসরায়েলি সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন মতপার্থক্য তৈরি করেছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গাজায় আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনীতে তুর্কি সেনা অংশ নেবে, এই ধারণা নিয়ে আমার স্পষ্ট মতামত আছে। অনুমান করতে চান?

নেতানিয়াহু সরকারের ডানপন্থি মন্ত্রীরা বরাবরই এরদোয়ানের তীব্র সমালোচক। গাজায় ইসরায়েলি অভিযানের নিন্দা জানিয়ে তুর্কি প্রেসিডেন্ট নেতানিয়াহুকে ‘গাজার কসাই’ এবং হামাসকে ‘মুক্তি আন্দোলন’ বলে উল্লেখ করেন। ইসরায়েল অভিযোগ করেছে, তুরস্ক হামাস সদস্য ও তাদের পরিবারকে আশ্রয় দিয়েছে, যদিও আঙ্কারা তা অস্বীকার করে বলেছে যে, তাদের দেশে হামাসের কোনও আনুষ্ঠানিক কার্যালয় নেই।

জার্মান ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল অ্যান্ড এরিয়া স্টাডিজের গবেষক হাক্কি তাস মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তুরস্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার। ট্রাম্প গাজা সংকট কম খরচে সমাধান করতে চান। তুরস্ক একদিকে হামাসকে প্রভাবিত করতে পারে, অন্যদিকে নেতানিয়াহুর ওপরও পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য, পশ্চিমা বিশ্বের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং মানবিক সহায়তা ও পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ একটি দেশ। দেশটির সরকারি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা ও তুর্কিশ রেড ক্রিসেন্ট গাজায় ত্রাণ ও পুনর্বাসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

তাসের মতে, এই ভূমিকা এরদোয়ানকে কেবল আঞ্চলিক নয়, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও একটি কেন্দ্রীয় অবস্থানে নিয়ে এসেছে। গাজা যুদ্ধবিরতিতে তুরস্কের সম্পৃক্ততা এরদোয়ানের ভাবমূর্তি ও দেশীয় সমর্থন দুটোই বাড়াচ্ছে।

তুরস্কের নিরাপত্তা বিশ্লেষক বুরাক ইয়িলদিরিম বলেন, গাজায় তুর্কি সেনা পাঠানোর সুযোগ পেলে এরদোয়ানের জন্য এটি বড় রাজনৈতিক সাফল্য হবে। এটি সরকারের পররাষ্ট্রনীতির কার্যকারিতা তুলে ধরবে এবং জাতীয়তাবাদী ভোটারদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবে।

গত বছর হামাসের ইসরায়েলবিরোধী হামলার পর এবং ইসরায়েলের পাল্টা অভিযানের প্রেক্ষিতে তুরস্কে বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে সমালোচনা বাড়ে। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোয় ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে এরদোয়ান সমঝোতার পথে হাঁটছেন। ইয়িলদিরিমের মতে, অর্থনৈতিক সংকটে থাকা এরদোয়ান সরকার নতুন করে ইসরায়েলবিরোধী অবস্থানে গিয়ে ঝুঁকি নিতে চায় না।

গাজার যুদ্ধবিরতি এখনও নড়বড়ে। এমন পরিস্থিতিতে আঙ্কারা একদিকে সিরিয়ায় প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে গাজায় মানবিক ভূমিকা বাড়াতে চায়।

ইয়িলদিরিম বলেন, তুরস্ক এককভাবে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্বের সমাধান করতে পারবে না। কিন্তু এটি উভয় পক্ষ ও অন্যান্য দেশকে আলোচনার টেবিলে আনতে পারে।

তবে বিশ্লেষক হাক্কি তাস সতর্ক করে বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদে তুরস্কের প্রভাব ধরে রাখা কঠিন হবে। ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন, মিসরের সঙ্গে সম্ভাব্য মতভেদ, মার্কিন কংগ্রেসের এরদোয়ানবিরোধী অবস্থান, সব কিছুই তুরস্কের জন্য চ্যালেঞ্জ।

তাসের ধারণা, তাই তুরস্ক রাজনৈতিক বা সামরিক ঝুঁকি না নিয়ে মূলত মানবিক সহায়তা ও অবকাঠামো পুনর্গঠনের দিকে মনোযোগ দেবে। গাজায় এখন তুরস্কের বাস্তব ভূমিকা সামরিক নয়, মানবিক।

সূত্র: ডয়চে ভেলে

Comments

0 total

Be the first to comment.

যেভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দাফন করছে ইসরায়েল? BanglaTribune | মধ্যপ্রাচ্য

যেভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দাফন করছে ইসরায়েল?

ইসরায়েলি দখলকৃত পশ্চিম তীরে এখন বসবাস করছেন প্রায় ২৭ লাখ ফিলিস্তিনি। দীর্ঘদিন ধরে এ ভূখণ্ডকে ভবিষ্...

Sep 22, 2025

More from this User

View all posts by admin