দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে ‘পশু-পাখি-বন্যপ্রাণী তথা বাস্তুতন্ত্রের অধিকারও নিশ্চিত হবে’ বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
শনিবার (১৪ সেপ্টেম্বর) এক আলোচনা সভায় তিনি এই মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘বাংলাদেশ অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন’ এর উদ্যোগে দিনব্যাপী ‘প্রাণী ও প্রাণের মেলা’ অনুষ্ঠানে বিকালে এই আলোচনা সভা হয়। মেলায় সৌখিন প্রাণীপ্রেমীরা তাদের পোষা পাখি-পশু নিয়ে আসেন।
তারেক রহমান বলেন, ‘গণতন্ত্রের সঙ্গে মানুষের অধিকারের সম্পর্কটা যেমন, বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে পশুপাখি এবং বন্যপ্রাণীর অধিকারের সম্পর্কটা তেমন। রাষ্ট্র রাজনীতিতে গণতন্ত্র এবং শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠিত থাকলে বাস্তবিকভাবেই বাস্ততন্ত্র নিরাপদ থাকে।’
তিনি বলেন, ‘দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে একজন মানুষ একজন, নাগরিক হিসেবে সব গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার হারানোর কারণে আমাদের অনেকের মনে হয়তো এক ধরনের অসহিষ্ণুতার জন্ম নিয়েছে। এই অসহিষ্ণুতা কাটিয়ে একজন মানবিক মানুষ হয়ে ওঠার জন্য মনুষত্ব অর্জন আর পশুত্ব বর্জনই হোক আমাদের অঙ্গীকার। মানুষ হিসাবে আমরা রাষ্ট্র এবং সমাজে নিজেদের অধিকার নিশ্চিত করতে পারলে, অন্য সব প্রাণীর অধিকার সংরক্ষণের ব্যাপারেও আমরা আরও সতর্ক এবং যত্নবান থাকবো।’
‘দেশ হোক সব প্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল’ এই স্লোগানে অনুষ্ঠানে প্রাণীপ্রেমী শাহিনা খান জামান এবং সদ্য প্রয়াত স্কুল শিক্ষক আকাশ কলি দাসকে সম্মাননা দেওয়া হয়।
‘বাংলাদেশ অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন’ এর এই অনুষ্ঠানটিকে ব্যতিক্রমধর্মী হিসেবে অভিহিত করেন সংগঠনটির প্রধান পৃষ্ঠপোষকও। তারেক রহমান বলেন, ‘দেশের রাজনৈতিক ডামামোডলের বাইরে এসে পশু-প্রাণীপ্রেমী কিছু মানুষের আয়োজনের আজকের প্রাণীবিষয়ক এই আলোচনাটি অবশ্যই অর্থবহ এবং অত্যন্ত ভালো একটি উদ্যোগ।’
তিনি বলেন, ‘দেশের প্রাণীর নিরাপত্তা এবং অধিকার সংরক্ষণের স্বার্থে বাংলাদেশ অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন গঠন করে সুসংগঠিতভাবে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রে আপনাদের এই চলমান উদ্যোগকে আমি আন্তরিকভাবে সাধুবাদ জানাই এবং আন্তরিক সাফল্য কামনা করি।’
বিএনপি আইনগুলো সময়োপযোগী করবে
তারেক রহমান বলেন, ‘প্রাণী কল্যাণ আইন ২০১৯, বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন, জীব বৈচিত্র রক্ষা আইন, পরিবেশ উন্নয়ন আইন, জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট আইন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দেশের অনেকগুলো আইন রয়েছে। ইনশাআল্লাহ জনগণের রায়ে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে পশুপাখি বন্যপ্রাণী তথা বাস্তুতন্ত্রের নিরাপত্তার জন্য এই আইনগুলোকে আমরা সময়োপযোগী করবো।’
জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে
জীববৈচিত্র্যের হুমকির বিষয়টি তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ‘যতটুকু জেনেছি এর মধ্যে প্রায় ৩৯০টি প্রজাতি কিন্তু বিলুপ্তির মুখে চলে গিয়েছে। এবং এটা শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের আরও অনেক দেশেই কিন্তু মানুষের সৃষ্টি পরিস্থিতির কারণে অনেক প্রজাতির অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন। বাংলাদেশের গর্ব, আমাদের ঐতিহ্যের প্রতীক রয়েল বেঙ্গল টাইগার নিয়েও আজ এখানে আলোচিত হয়েছে… আমার যতটুকু মনে আছে, যতটুকু দেখেছি, ৮০‘র দশকে বাংলাদেশের সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ছিল খুব সম্ভবত ৪‘শ এরও বেশি, প্রায় ৫‘শরও কাছাকাছি। সর্বশেষ জরিপে যতটুকু আমার ধারণা সেই বাঘের সংখ্যা কমতে কমতে কমতে একশ‘র কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘হাতির সংখ্যাও এখন কমে ২‘শ এর নিচে চলে এসেছে বা রাউন্ড ২‘শর মতো হবে। ঠিক এভাবে বাংলাদেশের আরও অনেক প্রাণী কিন্তু ধীরে ধীরে যুক্ত হচ্ছে বিলুপ্ত প্রজাতির তালিকায়। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জলবায়ুর পরিবর্তন, আনপ্ল্যানড, নগরায়ন, নদী, জলভূমি ভরাট, বন উজাড়সহ নানা কারণে একদিকে জীব বৈচিত্র যেরকম হুমকির মুখে পড়ছে, ঠিক একইভাবে বন্যপ্রাণী পাচারের ঘটনাও কিন্তু বেশ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এসব কারণেই বন্যপ্রাণী, জলজ উদ্ভিদ এবং প্রাণীদের যে আবাসস্থল এগুলো কিন্তু অস্তিত্ব সংকটের মধ্যে পড়েছে।’
জনসচেতনতা জরুরি
তারেক রহমান বলেন, ‘জীববৈচিত্র্য রক্ষা বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তা বিধানের ক্ষেত্রে আইন যেটি এখানে আলোচনা হয়েছে, একজন বক্তা বলেছেন- আইন কিংবা বিধিবিধানের চেয়েও আপনার-আমার-আমাদের সবার অর্থাৎ প্রত্যেক নাগরিকের সচেতনতা সবচেয়ে বেশি জরুরি। আমাদের প্রত্যেকের এই উপলব্ধিটা আসতে হবে যে, জীববৈচিত্র রক্ষা এবং বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তার সঙ্গে কিন্তু আমাদের নিরাপত্তাও জড়িত।’
প্রাণীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করলে ভবিষ্যৎ টেকসই হবে
তারেক রহমান বলেন, ‘প্রাণী অধিকারের যে বিষয়টি শুধুমাত্র প্রাণীদের প্রতি মানবিক দায়িত্বই নয় বরং জীববৈচিত্রের সংরক্ষণ বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্য রক্ষা এবং মানবজাতির নিজেদের সুস্থ এবং টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাও অত্যাবশ্যক। মানুষ যখন প্রাণীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়, প্রাণীদের নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করে, তখন এটা মানব সমাজের পরিপক্কতা এবং উন্নত নৈতিকতারই প্রতিফলন ঘটায়। মানুষ তার নিজের প্রয়োজনেই প্রাণীদের বাঁচিয়ে রাখা দরকার, প্রাণীদের আবাস অক্ষত রাখা দরকার।’
তিনি বলেন, ‘আমরা যখন প্রাণীর নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলছি, আমার ধারণা এই মুহূর্তে আমাদের হয়তো অনেকেরই মনে একটা চিন্তা আসতে পারে, সেটা হচ্ছে-রাষ্ট্র যখন কখনও কখনও খোদ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তখন আমরা প্রাণীর নিরাপত্তা নিয়ে আলাপ করছি… কারও মনে এ ধরনের কথা আসাটা অন্যায্য নয়। তবে আমাদের বোধহয় এটাও জেনে রাখা প্রয়োজন, নানা ক্ষেত্রে আমাদের সীমাবদ্ধতা কিংবা দৃশ্যত ব্যর্থতা কিংবা ব্যর্থতা দৃশ্যমান থাকলেও সব শুভ উদ্যোগকে আমাদের প্রতিদিনের চর্চায় এবং আলোচনায় রাখা দরকার।’
সংগঠনের আহ্বায়ক আদনান আজাদের সভাপতিত্বে এবং মুস্তাকিম বিল্লাহ ও লোভা আহমেদের যৌথ সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, কোষাধ্যক্ষ রাশিদুজ্জামান মিল্লাত, কবি আবদুল হাই শিকদার, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল লতিফ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মনোয়ার হোসেন তুহিন, জাতীয় ক্রিকেটের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবাল খান, চিত্রনায়িকা আইরিন সুলতানা, জাতীয় চিড়িয়াখানার কিউরেটর আতিকুর রহমান মিঠু, প্রাণীপ্রেমী আবু হানিফ, রহিমা আনজুম পুস্প, দিপান্বিতা রিদি, আবুল হাসনাইন মঞ্জুর মোর্শেদ ইমন, অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান সমন্বয়ক আতিকুর রহমান রুমন, কেন্দ্রীয় নেতা নিশাত তামান্না জামান, বাপ্পী খান প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
তারেক রহমানের সহধর্মিনী জুবাইদা রহমানের বড় বোন প্রাণীপ্রেমী শাহিনা খান জামানের লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শাম্মী আখতার।