আমি কী কখনো লজ্জা পেয়েছি? হ্যাঁ, পেয়েছি। সত্যি কথা বললে আমার বক্তব্যের শুরুতেই সেই কথাটি আপনাদের কাছে বলতে আমি লজ্জা পাচ্ছি, হয়ত কথাটি আমি পরে আপনাদের বলব।আমি বৈরুতের জন্মগ্রহণ করেছি ও বেড়ে উঠেছি—যেখানে লজ্জা, আরবিতে ‘আইব’, একটি সংক্রামক রোগ ছিল এবং এখনো আছে, অনেকটাই আমাদের শ্বাস নেয়ার অক্সিজেনের মতো। আমি যখন শব্দটি স্কুলে ব্যবহার করতে শুনেছিলাম, তখন সেটা কিছুটা বোধগম্য ব্যাপার ছিল, একজন ছাত্র তার বন্ধুর কাছ থেকে একটি পেন্সিল শার্পনার চুরি করেছিল। কিন্তু আমি যখন এই শব্দটি আমাদের বাড়িতে শুনেছিলাম, যখন আমাদের এক আত্মীয় নিজের অপরাধ স্বীকার করে বিড়বিড় করে বলেছিল, “হ্যাঁ, আমি আমার ছেলেকে কলেজে লেখাপড়া করাতে আমার সম্পত্তি বিক্রি করেছি” আর তারপর লোকটি মাথায় হাত রেখে কাঁদতে আরম্ভ করেছিল, বলছিল, “এটা আমার জন্য খুব লজ্জার কথা, ভীষণ লজ্জার!” আমাদের পরিবারের বন্ধু সম্পর্কীয় একজন প্রায় দুই বছর ধরে অস্বীকার করে আসছিল যে তার স্বামী অন্য একটি নারীকে বিয়ে করেছে, “গুজবটি সত্যি এটা স্বীকার করতে আমি লজ্জা পাচ্ছিলাম।” আমার খালা তখন রেগে বলেছিল, “তোমার স্বামীর উচিত লজ্জা পাওয়া, তোমার না! আমি শুধু ভাবছি তখন যদি তুমি আমাদের কাছে সত্যিটা বলতে! আমরা সবাই তার মুখে থুথু দিতে পারতাম!” নিরক্ষর মানুষগুলো বিড়বিড় করত, আমাদের পাড়ার মুচি, যারা কানে একটি পেন্সিল গুঁজে রাখত ও ভান করত লিখতে পড়তে জানে, তারা বলত, “আমরা লজ্জিত, খুবই নিন্দিত।” আমার মা-ও, তার নিরক্ষরতার জন্য লজ্জা পেতেন, প্রতিবার বিমানে চড়ার সময় তাকে যখন ইমিগ্রেশন ফর্ম দেয়া হতো, তিনি বলতেন তার চশমাটি খুঁজে পাচ্ছেন না।ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতে আসা একটি লোকের প্রতি আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম, লোকটি তার দুই হাতের কনিষ্ঠ আঙুলের নখ লম্বা রেখেছিল। প্রতিবার যখনই আমি জিজ্ঞেস করতাম কান চুলকানোর জন্য সে নখ লম্বা রাখে কিনা, সে শুধু হাসত, আর আমিও আমার ছেলেমানুষি অনুমানে হেসে ফেলতাম, পরবর্তী সময়ে আমি জানতে পেরেছিলাম পুরুষরা তাদের নখ লম্বা করে এটা প্রমাণ করতে, বিশেষ করে বেইরুতিদের কাছে যে তারা কৃষক নয়, শ্রমিক নয়, ক্ষেতে কাজ করা লোক নয়, বরং তারা শহরের বাসিন্দা। কৃষক হওয়া ও জমির মালিক না হওয়া তাদেরকে লজ্জা দিত।আমার নানী উম হাসান দক্ষিণ লেবাননে লেবুজাতীয় ফল সংগ্রহের কাজ করতেন, যেখানে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি নিজের ও তার দুই সন্তান, আমার মা ও আমার মামা, যাদের বয়স ছয় ও আট বছর ছিল, তাদের খাবারের জন্য বুনো গাছগাছালি ও পাখিদের জন্য রেখে যাওয়া গমের উপর নির্ভর করে বেঁচে ছিলেন, কারণ তাকে তালাক দেয়া স্বামী বাচ্চাদের লালনপালনের খরচ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। আমি আমার মায়ের শৈশব সম্পর্কে জেনেছি যখন আমি অবশেষে আমাদের অতীতকে আলোয় তুলে ধরতে ও আমার মায়ের জীবন কাহিনী লিখতে সম্মত হয়েছিলাম। আমি আমার মায়ের স্পষ্টভাষী ও সাহসী আচরণ দেখে অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম যখন তিনি তার প্রতারণা, ছোটখাটো চুরি, অসংখ্য মিথ্যা বলা, অবৈধ শারীরিক সম্পর্ক, প্রেমিকের সঙ্গে ভালোবাসার-সম্পর্ক, সবকিছুই কোনো রকমের অতিরঞ্জিত মোড়ক ছাড়া অথবা কোনো প্রকার অপরাধবোধ বা অনুশোচনা ছাড়াই বলে গিয়েছেন। কিন্তু কয়েকদিন পরে তিনি মন পরিবর্তন করে ফেলেন, তিনি চাননি আমি তার দারিদ্র্য সম্পর্কে লিখি। “আমার লজ্জা লাগে। আমি চাই না আমার পরিচিত কেউ জেনে যাক আমি কত গরিব ছিলাম!” মায়ের কথায় আমি প্রায় চিৎকার করে উঠেছিলাম, “আপনার কাছে কোনটি বেশি লজ্জার, খাবারের জন্য মাঠে গিয়ে দানা কুড়াতে বাধ্য হওয়া, নাকি আমার বাবাকে আপনি ডিভোর্স দেয়ার পরে সামাজিকভাবে যেভাবে অপমানিত হয়েছিলেন সেটা, আর আমার ছয় বছর বয়সে আপনি যখন আমাকে ফেলে রেখে গিয়েছিলেন ও আপনার প্রেমিককে বিয়ে করেছিলেন সেটা?” আমি একটি শব্দও উচ্চারণ করিনি, আমি শুধু এগিয়ে গিয়েছি আর আমার মায়ের আত্মজীবনীর প্রথম অধ্যায়টি লিখে ফেলেছিলাম তার শৈশব ও দারিদ্র্যের বর্ণনা দিয়ে, লেখাটি আমি তাকে পড়ে শুনিয়েছি, আমার মা উত্তেজনায় কেঁদে ফেলে বলেছিল, “লিখে যাও, আমার দারিদ্র্য নিয়ে লেখো, গরিব হওয়ায় লজ্জার কিছু নেই, সবচেয়ে বড় লজ্জার বিষয় ওটাই যখন তোমার নানা দশটি স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে আমার চৌদ্দ বছর বয়সে আমাকে বিক্রি করে দিয়েছিল আমার মৃত বড় বোনের স্বামীর কাছে, এমন এক লোকের কাছে, যার বয়স কেবল আমার দ্বিগুণই ছিল না, ওই লোকটা জীবনে কোনোদিন চলচ্চিত্র ভালোবাসেনি কিংবা একটি গানও শোনেনি!”আমি যদি আপনাদের এই ভাবনায় ফেলে দিয়ে থাকি যে নিরক্ষর মানুষেরা অন্যদের তুলনায় বেশি লজ্জা অনুভব করে, তাহলে আপনারা লেবাননের এই বিশিষ্ট সমালোচকের কথা শুনুন।“এই বইটির গুরুত্ব হলো এটি মুক্তভাবে বলার ও স্বীকারোক্তির দরজা খুলে দেয়, দারিদ্র্য ও ক্ষুধার শ্বাসরুদ্ধকর বিবরণ প্রকাশ করার ক্ষেত্রে কোনো প্রকার লজ্জা পাওয়া ছাড়াই।”আমার মনে আছে আমাদের এক শিক্ষক বলেছিল, আমাদের আরব পূর্বপুরুষেরা কীভাবে তাদের চরম বীরত্ব ও গৌরব বজায় রাখায় বিশ্বাসী ছিল। শিক্ষক আমাদের একজন শেখের গল্প বলেছিল, যে তার গোত্রের প্রধান ছিল, একবার শেখ অসুস্থ হয়ে পড়েন, আর যখন তার গোত্রের সদস্যরা তার শরীরের অবস্থা সম্পর্কে জানতে তাকে দেখতে এসেছিল, তখন তিনি লজ্জায় পড়ে গিয়েছিলেন। তিনি শারীরিকভাবে দুর্বল ও অসুস্থ হয় পড়ায় লজ্জিত বোধ করছিলেন। তাই শেখ উঠে দাঁড়ান, প্রাণশক্তি জড়ো করে ঘোড়ায় চড়ে বসেন এবং এরপর সবাই চলে যাবার সাথে সাথে তিনি পড়ে যান ও মারা যান। আমাদের শিক্ষক বলেছিলেন মহান আরব ও বিজয়ী সেনাপতি লজ্জায় চিৎকার করে বলেছিল, ‘এটা কী সম্ভব, এটা কী হতে পারে, আমি, খালিদ বিন আল-ওয়ালিদ, যে শতাধিক যুদ্ধ জয় করেছে, নিজেকে সে বিছানায় পা ছড়িয়ে দিয়ে পড়ে থাকতে ও উটের মতো মরে যেতে দেখছে?”আমাদের শেখানো হয়েছিল একজন আরব হওয়া মানে হলো হাকিম বিন তাইয়ের মতো উদার হওয়া। সেই কবি হাকিম, যিনি বাড়িতে অতিথি আসার পর খেতে দেয়ার মতো কিছু না থাকায় তার প্রিয় ঘোড়াটিকে জবাই করেছিলেন, ঘোড়ার মাংস পুড়িয়ে তিনি অতিথিদের খেতে দিয়েছিলেন। এই ঘটনাটি ঘটেছিল ষষ্ঠ শতাব্দীতে, জাহেলিয়াতের সময়, ইসলামের আগে অজ্ঞতার যুগে। তবুও আমার কলেজের এক সহপাঠী তার বন্ধুদের প্রতি দানশীলতা প্রদর্শন করতে অনেক দূর চলে গিয়েছিল। তার কাছে যত টাকা ছিল বা ছিল না, বন্ধুদের জন্য সে ব্যয় করত, যখন সে পাওনাদারদের টাকা ফেরত দিতে অস্বীকার করল, তখন তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। “কেন?” মেয়েটি আমার একমাত্র প্রশ্নের জবাব দিয়েছিল। “আমার ধনী বাবা-মা এখন আর ধনী নেই, আর এই কারণে আমার মাথা থেকে পা পর্যন্ত লজ্জা লাগে।”আমরা লজ্জা পাই কারণ আমরা রেসিস্ট, কারণ আমাদের রেসিজম আমাদের সাহিত্যেও প্রতিফলিত হয়। দশম শতাব্দীর আমাদের এক মহান কবি, আল মুতানাব্বি, যিনি জীবনের দর্শন নিয়ে গবেষণা করেছেন ও লিখেছেন, তারপরও তিনি এই কবিতাটি রচনা করেছিলেন: “আগে লাঠি না কিনে তোমরা নিজের জন্য দাস কিনো না। কারণ দাসেরা একটি দুষ্টু জাতি ছাড়া আর কিছুই না।” যখনই আমরা এই কবিতাটির কথা ভাবি অথবা কোনো বইয়ে এটা পড়ি, তখনই আমরা এই লজ্জাকর কালিমা থেকে নিজেদের দূরে রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে বলি, ইসলাম দাস প্রথাকে বিলুপ্ত করেছে, আমাদের নবী ইথিওপিয়ার এক কৃষ্ণাঙ্গ দাস বেলালকে (রা.) তাঁর মুয়াজ্জিন, নামাজের জন্য আহ্বানকারী হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন, এমনকি যখন বিলাল ‘শিন’ শব্দটি সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারত না। নবী মানুষদের নাম দিয়েছেন ‘আব্দ’, যার আরবি অর্থ ‘দাস’, এবং তিনি মানুষেকে উৎসাহিত করেছেন তাদের সন্তানদের এই নামে ডাকতে। বিষয়টি খুব জনপ্রিয় হয়েছিল; বিখ্যাত মিশরীয় প্রেসিডেন্ট জামাল আব্দ-আল নাসেরের নামটি মনে করেন, জামাল আল-নাসেরের দাস।একবার ভূগোল ক্লাসে আমি শিক্ষককে এই প্রশ্নটি করেছিলাম: “সুদান দেশের মানুষেরা কালো বলেই কী দেশটির নাম সুদান রাখা হয়েছে, কারণ সুদান শব্দের অর্থ কালো?” আমার মনে আছে, শিক্ষিকা কীভাবে হেসেছিল, বলেছিল, “সত্যি বলতে, তোমার প্রশ্নের কোনো উত্তর আমার কাছে নেই! হয়ত তোমার এই কথায় যুক্তি আছে।” এরপর সে আরো বলেছিল, “কারো গায়ের চামড়ার রঙের ভিত্তিতে একটি দেশের নামকরণ করা বড় লজ্জার বিষয়!’ আর এটা কী লজ্জার কথা নয় যে বৈরুত একটি রেসিস্ট শহর, বৈরুত, ২০০৯ সালে যে দেশ ইউনেস্কো কর্তৃক নির্বাচিত হয়েছে ও বইয়ের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। যে শহরটি তার ক্লাবের দৃশ্য, রেঁস্তোরা ও ভূমধ্যসাগরীয় সৈকতের জন্য সারা বিশ্বের মানুষকে আকর্ষণ করে। কিন্তু আপনাদের আমি অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলছি, আমাদের সমুদ্র সৈকতের জলে ডুব দিতে গেলে আগে একটি শর্ত আছে : আপনাকে সাদা হতে হবে! হ্যাঁ, সাদা। ওখানে গোসল করতে থাকা সাদা চামড়ার মানুষদের সঙ্গে কালোদের কাঁধ ঘষার অনুমতি নেই, যদিও নীতিগতভাবে আইন এই ভয়াবহ বৈষম্যকে অনুমোদন করে না।হয়ত আমি তাদের মধ্যে একজন যারা সাধারণত লজ্জাবোধ করে না। আমার ভাইয়ের এক বন্ধু যখন প্রথমবার আমাকে বলেছিল “নিজেকে নিয়ে তোমার লজ্জা হওয়া উচিত,” তখন আমি গর্বিত ও আনন্দিত বোধ করেছিলাম। আমার বয়স তখন পনেরো বছর, লেবাননের একটি শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রের শিক্ষার্থী-পাতায় আমি একঘেয়েমি সম্পর্কে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছিলাম। আমার প্রবন্ধের এই বিশেষ লাইনটি পড়ে সে ভয়ে আঁতকে উঠেছিল: “যখন আমি আমার দুই স্তনের মাঝে সুগন্ধির ফোঁটা ছিটিয়ে দেই।” এরপর অনেকগুলো দিন ও বছর কেটে গেছে, আমার ভাইয়ের সেই বন্ধুটি কুয়েতে একটি সাহিত্য পাতার সম্পাদক হয়েছে। আমি যখন কয়েকটি ছোটগল্পের একটি সংকলন প্রকাশ করলাম, আমাকে সে একটি চিঠি পাঠিয়েছিল; লিখেছিল, “কী লজ্জার ব্যাপার! তুমি নিশ্চিত থাকো এখন থেকে আমি তোমার লেখা একটি শব্দও পড়ব না। বি. দ্র. তোমার অবগতির জন্য জানাচ্ছি, তোমার বইটি আমি আবর্জনার মধ্যে ফেলে দিয়েছি!”যে কারণটি আমার ভাইয়ের বন্ধুকে রাগিয়ে দিয়েছিল, সেটি ছিল আমার একটি গল্পের এই লাইন; “এমনকি আমি তাদের শুনেওছিলাম, আমার পরিবারের পুরুষেরা একবার প্রতিযোগিতা করেছিল তারা কে কত বেশিবার বাতাস ছাড়তে পারে, আর কত জোরে।” ঘটনাক্রমে, একবার আমার বৈরুতে বেড়াতে যাবার সময় আমার ভাইয়ের বন্ধু, সম্পাদককে রাস্তা পার হতে দেখেছিলাম, তখন আমি নিজেকে প্রশ্ন করতে শুরু করেছিলাম কেন সেদিন তার অসভ্য কথাগুলো আমার গায়ে লাগেনি, কেন সেগুলো রেইনকোটের উপর বৃষ্টির ফোঁটার মতো গড়িয়ে নেমে গিয়েছিল, আমি অনুমান করে নিয়েছিলাম এর কারণ হচ্ছে আমি খুব ভালো করেই জানি আমি কী করছি এবং আমি আসলে কে। আর এখন, অর্ধ শতাব্দী পরে, আমি তার আচরণ পুরোপুরি বুঝতে পারি। আমি তার পৌরুষ, তার গৌরবকে অপমান করেছিলাম।আমার উপন্যাস ‘উইম্যান অব স্যান্ড এন্ড মার’-এ একটি আরব পুরুষ চরিত্র আছে যার একটি আমেরিকান মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক ছিল, আরব লোকটি যখন দেখল যে আমেরিকান মেয়েটি কামোত্তেজনার চরম শিখরে পৌঁছাতে চেষ্টা করছে, তখন সে উল্টে যায়, মেয়েটিকে সে “শয়তান নারী” বলে অভিহিত করে আর চিৎকার করে বলে, “খোদা তোমাদের বানিয়েছেন বাচ্চা জন্ম দিতে ও পুরুষকে আনন্দ দিতে, নারীদের সৃষ্টি করা হয়েছে শুধু এ কারণেই।” এই বিশ্বাসটি ব্যাখ্যা করে পুরুষদের মধ্যে কেন লজ্জার অনুভূতি টগবগ করে ফুটে ওঠে এবং তারা এই তথাকথিত “অনার কিলিং” সম্মান রক্ষার জন্য পরিবারের মেয়েদের হত্যা করে। অন্য কথায়, নারীরা নিজের আকাঙ্ক্ষার জন্য তৎপর হওয়া মানে হচ্ছে তারা পুরুষ তৈরি করার কারখানার রক্ষক হিসেবে ব্যর্থ হয়েছে। ব্যভিচারিণী, ধর্ষিতা অথবা অ-কুমারী নারীদের হত্যা করে তারা তাদের বংশের জন্য উর্বরতার উৎপাদন ক্ষমতাকে সম্পূর্ণরূপে সংরক্ষণ করতে চাইছে। তাদের মতে, পতিত মেয়েরা ও নারীরা, তাদের পরিবারকে একটি বড়, অমোচনীয় দাগ দিয়ে কলঙ্কিত করেছে এবং লজ্জাকে শ্বাসরোধ না করা পর্যন্ত এই দাগ কখনই মুছবে না।লজ্জা, আড়, আইব—শব্দটি আমি শুনেছি, ক্ষুব্ধ মুসলমান পুরুষদের চোখে দেখেছি, এটি নারীদের কালো পর্দার ভিতর থেকে বিচ্ছুরিত হতে দেখা যায়। আমি অনুভব করি লজ্জা এমন একটি দানব যা নারীরা শতাব্দীর শুরু থেকে এখন পর্যন্ত যা কিছু অর্জন করেছে, সব খেয়ে ফেলছে। এটি আইনি অধিকার, রাজনীতি, সংস্কৃতি, যৌন সম্পর্ক ও নারীর ভাগ্য বেছে নেবার অধিকার, পোশাকের ক্ষেত্রে পর্দা করা বা না করার স্বাধীনতার অধিকারকে প্রভাবিত করে, যদিও পর্দা কখনোই বেশির ভাগ নারীর পছন্দের ছিল না।নীরবতা হচ্ছে সবচেয়ে বড় লজ্জা, এছাড়াও অত্যাচারের কাছে মাথা নত করা, নিজের ভোট বিক্রি করা, অন্যদের নির্যাতন করা, নাগরিক ও প্রজাদের মাছির চেয়ে বেশি কিছু হিসেবে বিবেচনা না করা, বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বিতর্কের সুযোগ অনুপস্থিত থাকা লজ্জার কথা। আমি এখানে ড. খালেদ শোওয়াইকাতের উদ্ধৃতি দিতে চাই, যিনি বলেছিলেন, “আরব দেশগুলোতে লজ্জা আমাদের শরীরের নিচের অংশে কেন্দ্রীভূত থাকে, যেখানে আমাদের অসুস্থ মস্তিষ্ক বাসা বেঁধেছে।”লজ্জার বিষয় হয় যখন আমরা বই নিবদ্ধ করি, যখন আমরা আমাদের ঐতিহ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বইগুলোর একটি ‘ওয়ান থাউজেন্ড এন্ড ওয়ান নাইট,’ পশ্চিমে যেটি “এরাবিয়ান নাইটস” নামে পরিচিত, তাকে অস্বীকার করি। এটাকে আমরা সেন্সর করি, নিষিদ্ধ করি, এটাকে আমরা কেবল একটি প্রাচীন লোককাহিনী, গল্পগাঁথা বলি, তারচেয়ে বেশি কিছু নয়! আমি যখন থিয়েটারের জন্য এখান থেকে কিছু গল্প রূপান্তর করেছিলাম, দর্শকদের মধ্যে কিছু আরবকেও উপস্থিত থাকতে দেখে আমি বিমোহিত হয়েছিলাম, বিশেষ করে এই কারণে যে নাটকটি একই সঙ্গে আরবি, ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় ছিল। কিন্তু আমার আফসোস ও হতাশার অনুভূতি হয়েছিল কারণ আরব দর্শকদের প্রতিক্রিয়া ভয়ংকরভাবে নেতিবাচক ছিল। তারা বলেছিল, আমাদের আধুনিক সাহিত্য বাদ দিয়ে ‘আলিফ লায়লা ওয়া লায়লা’, ‘এক হাজার ও এক রজনী’ নিয়ে কাজ করা কেন? যেন পশ্চিমাদের সঙ্গে আমরাও একমত যে আমাদের সংস্কৃতি পুরোনো, এখনো আমাদের সংস্কৃতি সুলতান, হারেম, ও দাসদের কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। সেদিন থিয়েটারে এক আরব লোক আমাকে বলেছিল, “আমাদের এখন পশ্চিমে আরব হিসেবে গর্ব করার সুযোগ হারিয়ে গেছে! আমি শুধুই লজ্জা অনুভব করি।” আমার উত্তর ছিল— “লজ্জা যে আপনি এইসব গল্পের মৌলিক বিষয়গুলো ধরতে পারেননি, যা বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত। গল্পগুলো যদি শত শত বছর পার হয়ে এসে এখনো নিঃশেষ হতে অস্বীকার করে, তাহলে তার কারণ এদের সৌন্দর্য, জটিলতা, জীবনের সকল দিক নিয়ে কথা বলার কল্পনা, এবং আকুতি—ভুলে যেও না।” আমি লোকটির আহত আত্মায় লবণ ছিটিয়ে দিতে থাকলাম! বললাম, “কারণ তাদের মধ্যে প্রেম ও যৌন আকাঙ্ক্ষার জন্য প্রচণ্ড ক্ষুধা ছিল, আর সবই ছিল কোনো প্রকার বিধিনিষেধ বা প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই।”লজ্জা কোনো সীমানা বা দেশ মানে না; এটি সব জায়গায় বিদ্যমান— ব্রাজিল বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারতে বা চীন, ইউরোপ বা জাপান বা আফ্রিকা। আমাদের লজ্জা ও তাদের লজ্জার মধ্যে একমাত্র পার্থক্য এটাই যে আমাদের লজ্জা প্রকাশ হতে অনিচ্ছুক; কোনো ধরণের সংলাপ ও পরিবর্তন ও বিকাশের মাধ্যমে এটি উন্মুক্ত হতে অস্বীকার করে। লজ্জিত হবার অনুভূতি আমাদের জীবনে একটি অপ্রকাশিত উপায়েও ছড়িয়ে পড়েছে, এর উৎপত্তি আমাদের ব্যক্তিগত জীবন থেকে হোক অথবা এই সত্যি থেকে যে, আমরা আরবরা একটি ঐতিহাসিক গৌরবময় মুহূর্ত থেকে এতটাই খাড়াভাবে নিচে পড়েছি যে এখন আমরা প্রায় অচল হয়ে গেছি।আমার মনে আছে, আমি যখন আন্দালুসিয়ার গ্রানাডার আল-হামব্রা পরিদর্শন করেছিলাম, তখন আমাদের পূর্বপুরুষদের পরিশীলিত আচরণে আমি আপ্লুত হয়েছিলাম। এই শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম “সিংহের দরবারে বসে আমি কাঁদছি, ধন্যবাদ এলিজাবেথ স্মার্ট” না, আমি এই কারণে কাঁদিনি যে আরবরা এখন আর গ্রানাডাকে নিয়ন্ত্রণ করে না, বরং এই কারণে, আজ আমরা আরবরা আন্দালুসিয়ার আরবদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগই রাখি না, যারা ফেরেশতাদের কলম ও ছেনি ধার করতে পেরেছিল, আর তারা ইসলামী স্থাপত্যকে এমন মধুর সুরেলা অপরূপ মাধুর্যে খোদাই ও অলংকৃত করেছিল... কেন আমরা আমাদের সাংস্কৃতিক যাত্রা সম্পূর্ণ করতে পারিনি, আর কীভাবে আমরা আজকের এই সবচেয়ে খারাপ সময়ে এসে পৌঁছেছি? কী কারণে আমাদের পূর্বসূরীরা তাদের ডেস্কের উপর ঝোঁকে বসে থেকে গণিত ও বিজ্ঞানের বিস্ময়কর ব্যাপারগুলো লিখে রেখেছিলেন ও নক্ষত্রপুঞ্জের সঙ্গে আকাশ অনুসন্ধান করেছিলেন যাতে তারা তাদের গোপন রহস্য আবিষ্কার করতে পারে, আর তারা জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসায় চালিত হয়ে, মৌমাছির পেট থেকেও চিকিৎসা অধ্যয়ন করেছিলেন ও ওষুধ তৈরি করেছিলেন, এটি ছিল ৮ম শতাব্দীর ইরাক। পরবর্তীতে আমি যখন একজন ধর্মীয় শেখকে এই প্রশ্নগুলো করেছিলাম, তিনি তখন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে আঙ্গুল দিয়ে দাড়িতে চিরুনি দিয়েছেন; বলেছেন— “এটা কোনো ব্যাপার না, তাদের জন্য এই দুনিয়া, আমাদের জন্য আছে পরকাল।” এমন একটি পরাজিত উত্তরের জন্য আমি সেদিন ঘৃণা ছাড়া আর কী অনুভব করেছি, সে সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। আমরা আরবরা মাঝে মাঝে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করি, যদিও হায়, যত দ্রুত ও যেভাবে চাই সেভাবে আমরা চেষ্টা করি না। আমাদের সচেতনতা নিজেকে লুকিয়ে রাখে কারণ আমরা হতাশ, আমাদের ভাষণ এখানে সেখানে ছড়িয়ে পড়ে, আমরা আধা নাগরিক, আধা আত্মা, কিন্তু কেন? আমাদের স্বৈরাচারী সরকারগুলোর কারণে, যারা আমাদের শোষণ করেছে এবং এখনো করছে; স্বৈরাচার, কর্তৃত্ববাদী শাসনের কারণে; নারীদের প্রতি কোনো সম্মান না থাকার কারণে; এখানে কারো জন্যেই প্রকৃত মানবাধিকার নেই।কিন্তু একটি আশা জাগানো বক্তব্য দিয়ে আমি আমার কথা শেষ করতে চাই। উইলিয়াম ফকনার লিখেছিলেন: “পড়ো, পড়ো, সবকিছু পড়ো!” তিনি যদি জানতেন ভবিষ্যৎ আমাদের জন্য কী লুকিয়ে রেখেছে, তাহলে তিনি আরো বলতেন: “লেখো, লেখো, সবকিছু লেখো!”হ্যাঁ, লিখুন ও লিখুন, অত্যাচারীরা আপনাদের দিয়ে যা কিছু মুছে ফেলতে চাইবে সব লিখে রাখুন! মৌলবাদীরা যদি নিশ্চিত করে যে আপনার জন্য দোজখে একটি স্থান সুনির্ধারিত হয়েছে তবুও আপনারা লিখুন লিখুন! স্বাধীনতার শত্রুকে একটি নিঃশ্বাসের বায়ুর জন্য ছটফট করাতে আপনারা আরো লিখুন!এখন সময় এসেছে আপনাদের সেই কথাটি জানানোর, প্রথম ও শেষবার আমি কবে লজ্জা পেয়েছিলাম! তখন আমার বয়স হয়ত আট বা দশ বছর হবে, স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে, আমি মূত্রবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলাম না। আমাকে রাস্তার পাশে জমে দাঁড়িয়ে পড়তে দেখে একটি মহিলা বলেছিল: “কী লজ্জা! এই যে মেয়ে, তুমি কী করছ মনে করো?” আকাশের দিকে তাকিয়ে আমি বলেছিলাম; “আপনি দেখতে পাচ্ছেন না বৃষ্টি হচ্ছে!”, “হ্যাঁ, অবশ্যই হচ্ছে, শুধু তোমার মাথার উপরেই।”হানান আল-শাইখ ১৯৪৫ সালের ১২ নভেম্বর লেবাননের বৈরুতে শিয়া পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৬ সালে তিনি মিশরের কায়রোতে আমেরিকান কলেজ ফর গার্লস থেকে স্নাতক হন। লেবাননের মর্যাদাপূর্ণ দৈনিক আন-নাহারে কাজ করেছেন। ১৯৭৫ সালে লেবাননের গৃহযুদ্ধ শুরু হলে তিনি বৈরুত ত্যাগ করে সৌদি আরবে চলে যান।আরব নারীদের অবস্থা নিয়ে লেখালেখি ও সামাজিক সমালোচনার পাশাপাশি তিনি লেবাননের গৃহযুদ্ধ নিয়ে লিখিত লেখকদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একজন। সাংবাদিকতার জীবনে প্রথম পর্যায় থেকেই তিনি ছোট গল্প ও উপন্যাস লিখতে শুরু করেন। বর্তমানে হানান আল-শাইখ সপরিবারে লন্ডনে বসবাস করছেন।