হলিউডের কিংবদন্তি অভিনেতা তথা সানড্যান্ড ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের স্রষ্টা রবার্ট রেডফোর্ড আর নেই। ৮৯ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন।
তার জনসংযোগ কর্মকর্তা সিন্ডি বার্গার এক বিবৃতিতে জানান, স্থানীয় সময় ১৬ সেপ্টেম্বর উটাহ অঙ্গরাজ্যের সানড্যান্সে নিজের বাসভবনে প্রিয়জনদের ঘিরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন রেডফোর্ড। বার্তায় বলা হয়, ‘রবার্ট রেডফোর্ড চলে গেছেন, তাকে ভীষণভাবে মিস করা হবে। পরিবার শোকের এই সময়ে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা কামনা করছি আমরা।’
রেডফোর্ড ছিলেন অস্কারজয়ী অভিনেতা ও নির্মাতা। ‘বুচ ক্যাসিডি অ্যান্ড দ্য সানড্যান্স কিড’ এবং ‘দ্য স্টিং’–এ তার অভিনয় বিশ্বজুড়ে তাকে তারকা খ্যাতি এনে দেয়। ‘আউট অব আফ্রিকা’ ছবির নায়ক রেডফোর্ডকে আরও বেশি জনপ্রিয় করে তোলে। তবে তিনি কেবল অভিনেতাই ছিলেন না, তার হাত ধরেই গড়ে ওঠে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী স্বাধীন চলচ্চিত্র উৎসব সানড্যান্স ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল।
১৯৮০ সালে ‘অর্ডিনারি পিপল’ পরিচালনার জন্য একাডেমি অ্যাওয়ার্ডে সেরা পরিচালকের পুরস্কার জেতেন তিনি। ২০১৮ সালে অভিনয় থেকে আনুষ্ঠানিক অবসরের ঘোষণা দেন রেডফোর্ড।
জীবনের শেষবারের বার্তা
গত ১৮ আগস্ট নিজের জন্মদিনে ইনস্টাগ্রামে ভক্তদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন রেডফোর্ড। নিজের ক্যারিয়ারের বিভিন্ন ছবিসহ পোস্টে লিখেছিলেন, ‘আপনাদের সমর্থনই আমার সব অর্জনকে অর্থবহ করেছে। ছোটবেলা থেকে নানা বাধা অতিক্রম করেছি, মায়ের মৃত্যু, কলেজ থেকে ঝরে যাওয়া, তারপর টিভি ও ব্রডওয়েতে সংগ্রাম, অবশেষে অভিনয়, পরিচালনা ও সানড্যান্সের মতো এক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা—সবকিছুতে আপনাদের ভালবাসা ছিল পাশে।’
তিনি আরও লিখেছিলেন, ‘আমার ছবিগুলো যদি আপনাদের আলোচনার জন্ম দিয়ে থাকে, স্পর্শ করে থাকে বা সান্ত্বনা দিয়ে থাকে, তবে সেটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। সানড্যান্স নতুন চলচ্চিত্রকারদের কণ্ঠ দিয়েছে, আর আমার পরিবেশবাদী কাজ হয়তো কিছু মানুষকে পৃথিবীর প্রতি যত্নশীল হতে শিখিয়েছে। ধন্যবাদ আমার যাত্রার অংশ হয়ে থাকার জন্য।’
সানড্যান্সের প্রভাব
রেডফোর্ডের সবচেয়ে বড় অবদান হিসেবে ধরা হয় সানড্যান্স ফেস্টিভ্যালকে। নব্বইয়ের দশকে এটি স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়। ‘ফোর ওয়েডিংস অ্যান্ড আ ফিউনারেল’, ‘প্রেশাস’, ‘ম্যানচেস্টার বাই দ্য সি’, ‘লিটল মিস সানশাইন’, ‘দ্য ব্লেয়ার উইচ প্রজেক্ট’ এবং ‘গেট আউট’—সবগুলো ছবিই সানড্যান্স থেকে আলোচনায় আসে বিশ্বজুড়ে।
রেডফোর্ড নিজেই বলেছিলেন, ‘আমি চাইনি নিউইয়র্ক বা লস অ্যাঞ্জেলেসে এই উৎসব হোক। তাই বলেছিলাম, চলুন উটাহতে করি, যেখানে যাওয়া কঠিন, অদ্ভুত হবে। নতুন শিল্পীদের জন্য একটা কমিউনিটি গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে সানড্যান্স শুরু হয়েছিল। আজও সেই লক্ষ্য অপরিবর্তিত।’ jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68c97c79f11b2" ) ); প্রতিক্রিয়া
অভিনেত্রী মার্লি ম্যাটলিন ‘এক্স’-এ লিখেছেন: “আমাদের ছবি ‘কোডা’ সবার নজরে আসে সানড্যান্সের জন্যই। আর সানড্যান্স সম্ভব হয়েছিল রবার্ট রেডফোর্ডের জন্য। এক প্রতিভাবান মানুষ চলে গেলেন। শান্তিতে থাকুন।”
‘আউট অব আফ্রিকা’ ছবির সহ-অভিনেতাকে স্মরণ করে অভিনেত্রী মেরিল স্ট্রিপ বলেছেন— ‘একজন সিংহ চলে গেলেন।’ এক বিবৃতিতে, যা তার জনসংযোগ কর্মকর্তা এএফপি সংবাদ সংস্থাকে দিয়েছেন, স্ট্রিপ আরও বলেন, ‘শান্তিতে ঘুমাও আমার প্রিয় বন্ধু।’ স্ট্রিপ ও রেডফোর্ড একসঙ্গে কাজ করেছিলেন ১৯৮৫ সালের ‘আউট অব আফ্রিকা’ ছবিতে, যা পরিচালনা করেছিলেন সিডনি পোলাক। ছবিটি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রসহ একাধিক একাডেমি পুরস্কার জিতেছিল।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সাংবাদিকেরা রবার্ট রেডফোর্ডের মৃত্যুর খবর জানান, ঠিক মেরিন ওয়ানে চড়ে যুক্তরাজ্য সফরে যাওয়ার আগে বলেন, ‘রবার্ট রেডফোর্ডের এমন কিছু বছর ছিল, যখন তার চেয়ে ভালো কেউ ছিল না। এক সময় তিনি ছিলেন সবচেয়ে জনপ্রিয়। আমি তাকে অসাধারণ মনে করি।’ তবে ট্রাম্প রেডফোর্ডের পূর্ববর্তী সমালোচনা নিয়ে কোনও মন্তব্য করেননি। ২০১৯ সালে এনবিসি’র জন্য লেখা এক নিবন্ধে রেডফোর্ড ট্রাম্পকে ‘স্বৈরতান্ত্রিক ধাঁচের’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। সেখানে তিনি লিখেছিলেন: ‘সত্যের প্রতি আমাদের সহনশীলতা ও শ্রদ্ধা, আইনের শাসন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং বাকস্বাধীনতা—সবকিছুই এক ব্যক্তির দ্বারা হুমকির মুখে পড়েছে।’
ব্রিটিশ টেলিভিশন উপস্থাপক পিয়ার্স মর্গান একে অভিহিত করেছেন ‘সময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ সিনেমা তারকাদের একজন’ হিসেবে। তিনি লিখেছেন, ‘‘একজন সত্যিকারের হলিউড লেজেন্ড, যিনি আমার অনেক প্রিয় ছবিতে অভিনয় করেছেন: ‘বুচ ক্যাসিডি অ্যান্ড দ্য সানড্যান্স কিড’, ‘দ্য স্টিং’, ‘দ্য ওয়ে উই ওয়ার’, ‘অল দ্য প্রেসিডেন্টস মেন’ প্রবৃতি। কী অসাধারণ ক্যারিয়ার, কী অভিনেতা, কী দুঃখজনক ক্ষতি।’
রেডফোর্ডের ক্যারিয়ার ও জীবন
১৯৬৯ সালে ‘বুচ ক্যাসিডি অ্যান্ড দ্য সানড্যান্স কিড’ তাকে রাতারাতি তারকা বানায়। এরপর ‘দ্য স্টিং’, ‘দ্য ক্যান্ডিডেট’, ‘অল দ্য প্রেসিডেন্টস মেন’, ‘ইন্ডিসেন্ট প্রোপোজাল’ ও ‘দ্য ওয়ে উই ওয়্যার’ ছবিগুলো তার অভিনয় জীবন সমৃদ্ধ করে।
পরিচালক হিসেবেও সফল ছিলেন রেডফোর্ড। ‘আ রিভার রানস থ্রু ইট’ (১৯৯২), ‘কুইজ শো’ (১৯৯৪) এবং ‘দ্য হর্স হুইসপারার’ (১৯৯৮) তার উল্লেখযোগ্য কাজ।
তিনি পরিবেশ রক্ষায়ও ছিলেন সক্রিয়।
রেডফোর্ড রেখে গেছেন তার স্ত্রী সিবিলে স্যাজার্সকে, যাকে তিনি ২০০৯ সালে বিয়ে করেন। এর আগে লোলা ভ্যান ওয়াগেনেনকে বিয়ে করেছিলেন, যাদের চার সন্তান ছিল। তবে দুই ছেলে—স্কট শৈশবে এবং জেমস ২০২০ সালে ক্যানসারে মারা যান। বর্তমানে তার দুই কন্যা—শিল্পী শওনা ও পরিচালক অ্যামি—বেঁচে আছেন।