চীনের বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল হংকংয়ের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে রবিবার এক হাজারের বেশি মানুষ জড়ো হয়। এ সময় বেইজিং সতর্ক করে বলেছে, আগুনের ঘটনায় চীনবিরোধী কোনও বিক্ষোভ দেখা দিলে জাতীয় নিরাপত্তা আইন প্রয়োগ করা হবে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।
তাই পোর ওয়াং ফুক কোর্টের বহুতল আবাসিক ভবনগুলোতে আগুন লাগার কারণ এখনও তদন্তাধীন। অগ্নিকাণ্ডের আগে দেওয়া অগ্নিসংকেত সংক্রান্ত সতর্কতা উপেক্ষা ও অনিরাপদ নির্মাণকাজের অভিযোগে জনসাধারণের ক্ষোভ বাড়ছে।
রবিবার সন্ধ্যায় পুলিশ জানায়, ক্ষতিগ্রস্ত পাঁচটি ভবন তল্লাশি শেষে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪৬ জনে। সিঁড়িঘর ও ছাদে বেশ কয়েকটি লাশ পাওয়া গেছে। বাসিন্দারা সেখান দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন। এখনও ৪০ জনের বেশি নিখোঁজ রয়েছেন।
দগ্ধ কমপ্লেক্সের পাশের খালের ধারে এক কিলোমিটারের বেশি লম্বা সারিতে সাদা ফুল হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন শোকসন্তপ্তরা। কেউ কেউ ফুলের সঙ্গে নিহতদের উদ্দেশে লেখা চিরকুটও জুড়ে দেন। দ্রুত ছড়িয়ে পড়া আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত সাতটি টাওয়ারে চার দিন পরও ধোঁয়ার গন্ধ ভাসমান।
আগুনে নানির ফ্ল্যাট পুড়ে যাওয়া ২৮ বছর বয়সী জোই ইয়্যুং বলেন, আমি এটা মেনে নিতে পারছি না। আজ বাবা ও পরিবারের সঙ্গে এসেছি ফুল দিতে। কিছু পাওয়ার দাবিতে নয়, অন্তত মৃতদের পরিবারের জন্য বিচার দরকার। যাদের আমরা হারিয়েছি, তাদের জন্য।
নিহতদের মধ্যে সাতজন ইন্দোনেশীয় গৃহকর্মী ও একজন ফিলিপিনো গৃহকর্মী রয়েছেন। বহু অভিবাসী শ্রমিক এখনও নিখোঁজ। রবিবার সকালে শহরের ফিলিপিনো সম্প্রদায়ের এক খোলা প্রার্থনা সভায় শত শত মানুষ অংশ নেয়।
সম্ভাব্য দুর্নীতি ও নির্মাণ তদারকির ঘাটতি নিয়ে স্বাধীন তদন্তের দাবিতে অনলাইন আবেদন শুরু করা মাইলস কওয়ান (২৪)-কে শনিবার পুলিশ আটক করেছে বলে দুই ব্যক্তি দাবি করেছেন। তার গ্রেফতার হওয়ার বিষয়টি এখনও নিশ্চিত নয়। পুলিশ কোনও মন্তব্য করেনি। ওই অনলাইন আবেদনে শনিবার বিকেল পর্যন্ত ১০ হাজারের বেশি স্বাক্ষর পড়েছে। পরবর্তীতে তাই পো-এর এক প্রবাসী বাসিন্দা একই দাবিতে দ্বিতীয় আবেদন প্রকাশ করেন, যাতে রবিবার পর্যন্ত ২৭০০ জনের বেশি স্বাক্ষর জমে। আবেদনে বলা হয়েছে, সরকার হংকংবাসীর কাছে প্রকৃত ও স্পষ্ট জবাবদিহি ঋণী।
চীন সীমান্তের কাছে অবস্থিত সাতটি আবাসিক টাওয়ারে এই অগ্নিকাণ্ড হংকংকে নাড়িয়ে দিয়েছে। কর্তৃপক্ষ ফৌজদারি ও দুর্নীতি তদন্ত শুরু করেছে। জাতীয় নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ বলেছে, ২০১৯ সালের বিক্ষোভের মতো পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দুর্যোগকে অজুহাত করে হংকং অস্থিতিশীল করতে চাওয়া চীনবিরোধীদের কড়া হুঁশিয়ারি দিচ্ছি।
অগ্নিকাণ্ড সংক্রান্ত দুর্নীতি ও অনিরাপদ নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগে এখন পর্যন্ত ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বিপজ্জনক ভবনগুলোর ভেতরে তল্লাশি চালাতে গিয়ে আরও লাশ মিলতে পারে বলে জানিয়েছে পুলিশ। বুধবার বিকেলে আগুন লাগার পর তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে আটটি ৩২তলা ব্লকের মধ্যে সাতটিতে; ব্লকগুলো বাঁশের মাচা, সবুজ জাল ও ফোম ইনসুলেশন দিয়ে মোড়ানো ছিল।
কর্তৃপক্ষ জানায়, চার হাজার ৬০০-র বেশি বাসিন্দার এই কমপ্লেক্সে অগ্নিসংকেতের অ্যালার্ম সঠিকভাবে কাজ করছিল না। ১৯৪৮ সালের পর এটি হংকংয়ের সবচেয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। ওই সময় একটি গুদাম আগুনে ১৭৬ জন নিহত হয়েছিলেন।
শ্রম দফতর জানায়, সংস্কারকাজ সংক্রান্ত অগ্নিঝুঁকি নিয়ে অভিযোগের পর গত বছর ওয়াং ফুক কোর্টের বাসিন্দাদের তুলনামূলক কম অগ্নিঝুঁকি রয়েছে বলে জানানো হয়েছিল। গত সেপ্টেম্বর বাসিন্দারা সবুজ সুরক্ষাজালের দাহ্যতা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছিলেন।
পুলিশ বলেছে, ক্ষতিগ্রস্ত সব ভবনে পূর্ণ তল্লাশি শেষ করতে তিন থেকে চার সপ্তাহ লাগতে পারে।