মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হঠাৎ করেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে নিজের অবস্থান বদলেছেন। মঙ্গলবার (২৩ সেপ্টেম্বর) প্রথমবারের মতো ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল নেটওয়ার্কে লিখেছেন, কিয়েভ তার সীমান্ত পুনরুদ্ধার করতে পারে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এ খবর জানিয়েছে।
ট্রাম্প বলেছেন, ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখল, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রতি ক্রেমলিনের সমর্থন এবং ২০২২ সালের পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর ইউক্রেন যে এক-পঞ্চমাংশ ভূখণ্ড হারিয়েছে, তা পুনরুদ্ধার সম্ভব।
ট্রাম্প সোশ্যাল নেটওয়ার্কে লিখেছেন, “ইউক্রেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় লড়াই করার অবস্থানে রয়েছে এবং ইউক্রেনকে তার আসল রূপে ফেরত জেতার ক্ষমতা রাখে।”
তবে রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকরা তাঁর এই নতুন অবস্থান নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।
কিয়েভভিত্তিক পেন্টা থিংক ট্যাঙ্কের প্রধান ভলোদিমির ফেসেঙ্কোর মতে, ট্রাম্পের বক্তব্য মোটেও কোনও অবস্থান পরিবর্তনের সংকেত নয়।
আল জাজিরাকে তিনি বলেন, “ট্রাম্পের কথাকে ১৯৯১ সালের সীমান্তে ফিরে যাওয়ার সংকেত হিসেবে দেখবেন না।”
ফেসেঙ্কো বলেন, “এগুলো আসলে এক ধরনের বাগ্মিতা, ইউক্রেনের প্রতি সহানুভূতি ও ইতিবাচক আবেগ প্রকাশের উপায়। এগুলো সংকেত, পুতিনের ওপর চাপ সৃষ্টি করার এক ধরনের কৌশল। তবে এখনও কেবল তা কথার পর্যায়ে।”
ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেছেন, ইউক্রেনের ভূখণ্ড ফেরত দেওয়ার দায়িত্ব ওয়াশিংটনের নয় বরং ব্রাসেলস এবং ন্যাটোর।
ফেসেঙ্কো বলেন, “ট্রাম্প ব্যবসায়ীর মতো চিন্তা করেন। তিনি দেখছেন এবং তথ্য পাচ্ছেন যে রাশিয়ার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে।”
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি, বাজেট ঘাটতি ও সুদের হার বৃদ্ধির ফলে এ বছর রাশিয়ার অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ফেসেঙ্কো বলেন, “ট্রাম্প চান না ইউক্রেন যুদ্ধ জিতুক। তিনি চান যুদ্ধ শেষ হোক। তাঁর লক্ষ্য বদলায়নি। তাই তিনি পুতিনকে এসব সংকেত দিচ্ছেন।”
মঙ্গলবার ট্রাম্পের মন্তব্যের জবাবে ক্রেমলিন জানিয়েছে, রাশিয়ার আর কোনও বিকল্প নেই। যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। তারা মার্কিন প্রেসিডেন্টের মন্তব্যকে ‘ভুল’ বলে আখ্যায়িত করেছে।
১৫ আগস্ট ট্রাম্প-পুতিন সম্মেলনের প্রসঙ্গ টেনে ফেসেঙ্কো বলেন, “ট্রাম্পকে ঘিরে এখন টানাটানি চলছে। আপাতত আমরা তাকে আমাদের দিকে কিছুটা টেনে এনেছি। আগস্টে আলাস্কায় পুতিন সেটা করেছিলেন।” যদিও বৈঠকটি রাশিয়ার আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা ভাঙলেও কিয়েভের জন্য ইতিবাচক কোনও ফল আনতে পারেনি।
ইউক্রেনীয় বিশ্লেষকরা বলেন, ইউক্রেনকে সত্যিকারের সহায়তা করতে চাইলে ট্রাম্পকে তাঁর কৌশল পাল্টাতে হবে।
সাবেক উপপ্রধান সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইহর রোমানেঙ্কো আল জাজিরাকে বলেন, “তাঁকে বিনিয়োগ বেশি করতে হবে, কথা কম বলতে হবে, কিন্তু এখন পরিস্থিতি উল্টো।”
ট্রাম্পের অবস্থান পরিবর্তন আসলে তাঁর ব্যক্তিগত মূল্যায়ন নয়।
রোমানেঙ্কো বলেন, “তিনি এমন মূল্যায়ন করতে সক্ষম নন। এটি তাঁর দলের কারও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা,” যার মধ্যে থাকতে পারে পেন্টাগন, গোয়েন্দা সংস্থা বা মার্কিন কংগ্রেসের কিছু সদস্য।
রোমানেঙ্কো আরও বলেন, পশ্চিমা সহায়তা সর্বোচ্চভাবে কাজে লাগাতে হলে ইউক্রেনকে নিজের হোমওয়ার্ক করতে হবে।
রাশিয়ার গ্রীষ্মকালীন আক্রমণ শেষের দিকে। “তারা যা পরিকল্পনা করেছিল তা সফল হয়নি, তবে তাদের এখনো সম্পদ আছে। আমরা তাদের অগ্রসর হতে দেখছি,” রোমানেঙ্কো বলেন।
গত মার্চে পুতিন দাবি করেছিলেন, আসন্ন আক্রমণ ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী ও কিয়েভের প্রতিরোধকে শেষ করে দিতে পারে।
পূর্বে রাশিয়া পুরোপুরি লুহানস্ক দখল করেছে, যা এখনও তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা সবচেয়ে ছোট অঞ্চল।
তারা আগ্রাসীভাবে ডোনেস্ক অঞ্চলের বেশ কয়েকটি প্রধান শহর ও নগরের দিকে এগোচ্ছে। তবে রোমানেঙ্কো বলেন, “এটা দ্রুত হবে না। তাদের বাহিনী আর আগের মতো নেই।”
এই গ্রীষ্মে রাশিয়া প্রায় ৭৭২ বর্গমাইল দখল করেছে, যা শরৎ ও শীতকালীন অভিযানের জন্য পাদপ্রদীপ হিসেবে কাজ করবে।
জার্মানির ব্রেমেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকোলাই মিত্রোখিন, তারা ডোনেস্কের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটির কাছে পৌঁছেছে বা সেগুলো ঘিরে ফেলেছে, কাছাকাছি ডিপ্রোতে প্রবেশ করেছে এবং দক্ষিণের জাপোরিঝিয়ায় অগ্রসর হয়েছে—যা আগামী ছয় মাসের যুদ্ধক্ষেত্রের রূপরেখা।