মার্কিন প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনায় বড় ধরনের ভূখণ্ডগত ও অস্ত্রে ছাড় দেওয়ার আহ্বান জানানোর পর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি শুক্রবার জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। কিয়েভের প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের বাইরে দাঁড়িয়ে দেওয়া ওই বিরল ভাষণে তিনি বলেন, তিনি কখনোই ইউক্রেনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবেন না এবং এই সংকটময় সময়ে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।
জেলেনস্কি বলেন, এটি আমাদের ইতিহাসের অন্যতম কঠিন সময়। এখন ইউক্রেনের ওপর চাপ সবচেয়ে বেশি। আমাদের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত, সম্মান হারানো নাকি বড় মিত্রকে হারানোর ঝুঁকি নেওয়া। ইউক্রেনের মর্যাদা এবং স্বাধীনতা যেন পরিকল্পনায় উপেক্ষিত না হয়, সেজন্য আমি নিরলস লড়াই করব।
ওয়াশিংটন কিয়েভকে যে ২৮ দফার প্রস্তাব দিয়েছে, তাতে ইউক্রেনকে কিছু ভূখণ্ড ছাড়তে হবে, সামরিক সক্ষমতা সীমিত করতে হবে এবং ন্যাটোতে যোগদানের আশা ত্যাগ করতে হবে। রয়টার্সকে দুটি সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এক সপ্তাহের মধ্যে এ কাঠামো গ্রহণের জন্য চাপ দিচ্ছে। প্রস্তাবে সই না করলে গোয়েন্দা তথ্য ও অস্ত্র সহায়তা বন্ধ করার হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে তারা জানায়।
বৃহস্পতিবার কিয়েভে মার্কিন সামরিক প্রতিনিধিদলের সঙ্গে জেলেনস্কির বৈঠকের পর মার্কিন রাষ্ট্রদূত জানান, ওয়াশিংটন দ্রুত সময়সীমা চায় এই পরিকল্পনা ইস্যুতে।
শুক্রবার ব্রিটেন, জার্মানি ও ফ্রান্সের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে ফোনালাপের পর জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গেও কথা বলেন। তিনি বলেন, যুদ্ধের অবসানে যুক্তরাষ্ট্র, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার টিমের প্রচেষ্টাকে আমরা গুরুত্বদেই। এটি এমন একটি পরিকল্পনা হতে হবে, যা নিশ্চিত করবে মর্যাদাপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত শান্তি।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রস্তাবিত শর্তগুলো অগ্রহণযোগ্য মনে হলে ইউক্রেনে রাজনৈতিক–সামাজিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। চ্যাথাম হাউজের টিম অ্যাশ বলেন, এ প্রস্তাবে রাশিয়া সব পায়, ইউক্রেন পায় খুব কম। জেলেনস্কি এটি মেনে নিলে বড় অস্থিতিশীলতা দেখা দেবে।
ইউরোপীয় নেতারা জানান, প্রস্তাব প্রস্তুতের সময় তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্র প্রধান কাইজা কালাস বলেন, আমরা সবাই এ যুদ্ধের শেষ চাই, কিন্তু কীভাবে শেষ হবে, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়ার কোনও দাবির বৈধতা নেই। এটি একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক সময়।
মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করেছিলেন, পরিকল্পনাটি ইউক্রেনের জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের সচিব রুস্তেম উমেরভের সঙ্গে পরামর্শ করেই তৈরি করা হয়েছে। তবে উমেরভ জানান, তিনি কোনও শর্তে সম্মতি দেননি এবং সম্পূর্ণ লজিস্টিক ভূমিকা পালন করেছেন। মূল্যায়ন বা অনুমোদন দেওয়া আমার কর্তৃত্বে পড়ে না।
ক্রেমলিন জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কোনও আনুষ্ঠানিক শান্তি পরিকল্পনা তারা পায়নি। কিয়েভকে দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ।
রয়টার্স পর্যালোচিত পরিকল্পনায় দেখা গেছে, ইউক্রেনকে পূর্বাঞ্চলের কিছু দখলকৃত এলাকা থেকে সরে যেতে হবে। অন্যদিকে, রাশিয়া কিছু সীমিত এলাকা ছাড়বে। ইউক্রেনকে স্থায়ীভাবে ন্যাটোর বাইরে রাখা হবে এবং তার সেনাবাহিনী সর্বোচ্চ ৬ লাখে সীমিত থাকবে। রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা ধীরে ধীরে তুলে নেওয়া হবে এবং মস্কোকে আবার জি-৮ এ আমন্ত্রণ জানানো হবে।
ইউক্রেনের প্রধান দাবি নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিষয়টি খসড়ায় বিস্তারিত ছাড়াই এক লাইনে শক্তিশালী নিরাপত্তা নিশ্চয়তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষমতায় ফিরে দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। রাশিয়ার কিছু অবস্থান সমর্থন করলেও তিনি মস্কোর ওপর ক্ষোভও দেখিয়েছেন। গত মাসে তিনি পুতিনের সঙ্গে নির্ধারিত শীর্ষ বৈঠক বাতিল করেন এবং রাশিয়ার দুই বড় তেল কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। নিষেধাজ্ঞার পূর্ণ কার্যকারিতা শুক্রবার থেকে শুরু হওয়ার কথা।