জাকাত ও ওয়াকফ: ত্রাণ থেকে টেকসই উন্নয়নের ভাবনা

জাকাত ও ওয়াকফ: ত্রাণ থেকে টেকসই উন্নয়নের ভাবনা

জাকাত ও ওয়াকফ ইসলামের দুটি অসাধারণ ব্যবস্থা; যা শুধু দানের মাধ্যম নয়, বরং সমাজ ও অর্থনীতির উন্নয়নের জন্য শক্তিশালী হাতিয়ার। এই দুটি ব্যবস্থা আমাদের সমাজে বৈষম্য কমিয়ে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে পারে এবং তাৎক্ষণিক ত্রাণ প্রদান থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতায়ন পর্যন্ত এই ব্যবস্থা কাজ করতে পারে।

কিন্তু আমরা যখন জাকাত বা ওয়াকফের কথা শুনি, আমাদের মনে প্রথমে কী ভাবনা আসে? হয়তো রমজানে খাদ্যের ঝুড়ি বিতরণ, কারও জরুরি কর্জ পরিশোধ কিংবা ত্রাণের একটি তহবিল। এগুলো নিঃসন্দেহে মহৎ কাজ, যা ক্ষুধার্তের তৃষ্ণা মেটায়, দরিদ্রের মুখে হাসি ফোটায়।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এর পরের দিন কী হবে? পরের মাসে কী হবে? এই তাৎক্ষণিক সাহায্য কি জাকাত ও ওয়াকফের পূর্ণ উদ্দেশ্য পূরণ করে? তাই কীভাবে জাকাত ও ওয়াকফ শুধু ত্রাণ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের হাতিয়ার হতে পারে, যা সমাজকে টেকসই উন্নয়নের পথে নিয়ে যায়, তা নিয়ে ভাবা দরকার।

জাকাত ও ওয়াকফ শুধু দান বা দাতব্য নয়; এগুলো সমাজের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবস্থা। এই দুটি ব্যবস্থা কেবল দরিদ্রকে সাহায্য করার জন্য নয়, বরং দারিদ্র্যের মূল কারণ দূর করে তাদের ক্ষমতায়নের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে।

আমরা প্রায়ই জাকাতকে তাৎক্ষণিক সাহায্যের মাধ্যম হিসেবে দেখি—যেমন খাদ্য বিতরণ বা আর্থিক সহায়তা। কিন্তু এর আসল উদ্দেশ্য অনেক গভীর। জাকাত ও ওয়াকফের মাধ্যমে ইসলাম সমাজে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে দরিদ্ররা শুধু সাহায্য পাবে না, বরং নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখবে।

জাকাত কোনো সাধারণ দান নয়; এটি সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ, যা দরিদ্রদের অধিকার হিসেবে দেওয়া বাধ্যতামূলক। কোরআনে বলা হয়েছে, “তোমাদের সম্পদ ও সন্তানদের মধ্যে পরীক্ষা রয়েছে, আর আল্লাহর কাছে রয়েছে মহাপুরস্কার।” (সুরা তাগাবুন, আয়াত: ১৫)

জাকাতের উদ্দেশ্য সম্পদের পুনর্বণ্টনের মাধ্যমে সমাজে ভারসাম্য আনা। জাকাত শুধু দারিদ্র্য ব্যবস্থাপনার জন্য নয়, বরং দারিদ্র্য নির্মূল করার জন্য।

যেমন, পশুসম্পদের জাকাতের বিধান দেখুন। জাকাত সাধারণত পুরুষ পশু বা ছোট মাদী পশু থেকে নেওয়া হয়, যাতে পশুপালের প্রজনন ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এর মাধ্যমে ইসলাম শেখায় যে জাকাত দাতাকে দরিদ্র থাকার জন্য নয়, বরং তার সম্পদের স্থায়িত্ব বজায় রেখে সমাজে সমৃদ্ধি ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য দেওয়া হচ্ছে।

জাকাতের লক্ষ্য হলো দরিদ্রকে এমনভাবে ক্ষমতায়ন করা, যাতে তারা নিজেরাই জাকাতদাতা হয়ে উঠতে পারে।

ওয়াকফ হলো এমন একটি সম্পদ, যার মূল অংশ সংরক্ষিত থাকে এবং এর সুফল সমাজের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়। আধুনিক ভাষায় যা “সামাজিক বিনিয়োগ”র একটি প্রাচীন রূপ। ইতিহাসে ওয়াকফের মাধ্যমে আল-আজহার ও কায়রাওয়ানের মতো বিশ্ববিদ্যালয়, বিমারিস্তানের মতো হাসপাতাল এবং বহু গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই ওয়াকফ শুধু দাতব্য নয়, বরং সভ্যতা গঠনের হাতিয়ার।

ওয়াকফের মূল দর্শন হলো “মূলধন সংরক্ষণ এবং সুফল বিতরণ”। একটি জমি ওয়াকফ করে এর ফসল বা ভাড়া থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে স্কুল, হাসপাতাল বা দরিদ্রদের জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালানো যায়। এই ব্যবস্থা সমাজে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিশ্চিত করে।

আমরা প্রায়ই জাকাত ও ওয়াকফকে তাৎক্ষণিক ত্রাণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করি। জরুরি পরিস্থিতিতে তা গুরুত্বপূর্ণও বটে। কিন্তু এই ত্রাণই কি সমস্যার মূল সমাধান করে? তাৎক্ষণিক সাহায্য দরিদ্রকে একদিনের জন্য খাদ্য বা আশ্রয় দিতে পারে, কিন্তু তার পরের দিন কী হবে?

এই পদ্ধতি অনেক সময় মানুষকে সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে, যা তাদের আত্মমর্যাদা ও উদ্যোগী মনোভাবকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

ত্রাণের কাজ বলা যায় একটি হাসপাতালের জরুরি বিভাগের মতো; যা জীবন বাঁচায়, কিন্তু সমাজের সামগ্রিক স্বাস্থ্য উন্নত করতে পারে না। দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে পরিকল্পনা গ্রহণ করলে জাকাত ও ওয়াকফকে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতায়নের উপায় হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

জাকাতের অর্থ দিয়ে একজন দরিদ্রকে খাদ্য দেওয়ার পরিবর্তে তাকে পেশাগত প্রশিক্ষণ বা ব্যবসায়ের জন্য সরঞ্জাম দেওয়া যেতে পারে। এভাবে সে নিজেই উপার্জন করতে পারবে এবং সমাজের উৎপাদনশীল সদস্য হয়ে উঠবে।

ত্রাণ এবং ক্ষমতায়নের মধ্যে একটি বড় পার্থক্য হলো মানসিক প্রভাব। ত্রাণ প্রায়শই গ্রহীতার মনে “দারিদ্র্যের নীচত” তৈরি করতে পারে, যা তাকে সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। কিন্তু ক্ষমতায়ন তাকে আত্মমর্যাদা ও উৎপাদনের গর্ব ফিরিয়ে দেয়।

একজন বিধবা যিনি জাকাতের অর্থে সেলাই মেশিন পেয়ে নিজের পোশাক বিক্রি শুরু করেন, তিনি শুধু অর্থই উপার্জন করেন না, বরং নিজের ক্ষমতার প্রতি আত্মবিশ্বাস ফিরে পান। এই আত্মবিশ্বাসই তাকে দারিদ্র্যের চক্র থেকে বের করে আনে।

ক্ষমতায়ন শুধু অর্থনৈতিক দক্ষতা নয়, এটি মানুষের মনকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি উপায়। এটি তাদেরকে নিজেদের জীবনের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দেয় এবং সমাজে তাদের ভূমিকাকে পুনঃসংজ্ঞায়িত করে।

অনেক ফিকহবিদ জাকাতের অর্থ তাৎক্ষণিক ত্রাণের জন্য ব্যবহারের ওপর জোর দেন। তবে ঐতিহাসিক ও আধুনিক উলামাদের মধ্যে সমর্থিত ভিন্ন ফিকহি দৃষ্টিভঙ্গিও রয়েছে।

এই দৃষ্টিভঙ্গি বলে, জাকাতের অর্থ দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতায়নের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে, যেমন শিক্ষা, প্রশিক্ষণ বা ব্যবসায়িক সুযোগ সৃষ্টি। এই দৃষ্টিভঙ্গি জাকাতের আসল উদ্দেশ্য—দারিদ্র্য নির্মূল এবং সমাজের টেকসই উন্নয়ন—এর সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

আমাদের দায়িত্ব হলো কখন কোন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে, সেটা বুঝে সমন্বয় করা। ত্রাণ অবশ্যই চলবে, কিন্তু আমাদের প্রচেষ্টার বড় অংশ ক্ষমতায়নের দিকে নিয়ে যেতে হবে।

আজকের বিশ্বে জাকাত ও ওয়াকফকে আরও গতিশীলভাবে ব্যবহার করা যায়। জাকাতের অর্থে পেশাগত প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ের জন্য ঋণ বা শিক্ষার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। ওয়াকফের মাধ্যমে আধুনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য প্রকল্প চালানো যায়—যেমন ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিকতা নিয়ে গবেষণা বা পরিবেশগত টেকসইতার জন্য উদ্যোগ।

আমাদের সাফল্যের মাপকাঠিও পরিবর্তন করতে হবে। সাফল্য মানে এই নয় যে আমরা এই মাসে কত পরিবারকে সাহায্য করেছি। বরং প্রশ্ন হলো, আমরা কত পরিবারকে দারিদ্র্যের চক্র থেকে বের করে এনেছি।

আমাদের ভূমিকা হওয়া উচিত “ত্রাণদাতা” থেকে “নির্মাতা” হয়ে ওঠা, যিনি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সমাজ গড়ে তুলতে সাহায্য করেন।

জাকাত ও ওয়াকফের মাধ্যমে আমরা এমন একটি সমাজ গড়তে পারি, যেখানে প্রত্যেকে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে সমৃদ্ধ জীবনযাপন করতে পারবে।

Comments

0 total

Be the first to comment.

More from this User

View all posts by admin